×

পাঠকের কলাম

কর্মঘণ্টা নষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়

Icon

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, চরম যানজটের কারণে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৯০ লাখের অধিক কর্মঘণ্টা। এই সর্বনাশা যানজটের কারণে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১৫২ কোটি ৫৬ লাখের অধিক টাকা। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রতি বছর সব মিলিয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে প্রতি বছর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে ১৪০ কোটি টাকা। কর্মঘণ্টার নষ্টের পেছনে রয়েছে যানজট, যা দেশবাসীর জন্য বড় শঙ্কার কারণ।

নানামুখী সমস্যার কারণে মানুষের স্রোত আর অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি রাজধানীতে যানজটের সৃষ্টি করছে। রাজধানীবাসীর কাছে যানজট একটি মূর্তমান আতঙ্ক। প্রতিদিনের অসহ্য যানজটের কারণে স্থবির হয়ে পড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা। হুমকিতে পড়ে বেঁচে থাকার চিন্তা। তেমনিভাবে চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা কিংবা অবরোধ, হরতালের দিনে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি সড়কে দেখা যায় তীব্র যানজট। জীবনাচরণ হয়ে পড়ে স্থবির, মানুষ হয়ে ওঠে নাকাল। পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব মতে, ঢাকা শহরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৬০টি। তার মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৪টি। যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার ৭৮২টি। এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকা শহরে চলাচল করা ৫০ শতাংশ ব্যক্তিগত যানবাহন। আর এই ৫০ শতাংশ গাড়ি বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। কিন্তু বাকি ৫০ শতাংশ গাড়ি বহন করে ৮৮ শতাংশ যাত্রী।

যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো ব্যক্তিগত যানবাহন বৃদ্ধি। যার ফলে বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাপে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশেষ করে বন্যাকবলিত এলাকা, নদীভাঙন ও দুর্ভিক্ষ অঞ্চলের গরিব ও অসহায় মানুষের একমাত্র কর্মসংস্থানের জায়গা হিসেবে পছন্দ রাজধানী ঢাকা। সড়ক ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল, যেখানে-সেখানে ইচ্ছামতো গাড়ি পার্কিং, অবৈধ ফুটপাত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রভৃতি যানজট বাড়িয়ে তুলছে।

চট্টগ্রামের যানজট পরিস্থিতি ইদানীং আবারো খারাপ হয়েছে। আগ্রাবাদ এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ের কারণে যানজট বৃদ্ধি পেলেও শহরে অন্যান্য স্থানে ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার কারণেই যানজট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বলাবাহুল্য মাত্র। যানজটের কারণে ১০ মিনিটের দূরত্ব পার হতে এক ঘণ্টা লেগে যায়। পরিকল্পনা মাফিক সময়কে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফলে সময়ের কাজ সময়ে করা যায় না, মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।

শহরের প্রবেশ মুখ বলে খ্যাত সিটিগেট থেকে এ কে খান মোড় ও অলংকার মোড়ে সার্বক্ষণিক যানজট লেগে থাকে। ফেনী থেকে কুমিরা আসতে যতক্ষণ সময় লাগে তার চেয়ে বেশি সময় লাগে সিটিগেট থেকে জিইসি মোড় আসতে। এদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশ মুখ বলে খ্যাত কর্ণফুলী ব্রিজের যানজট ইতোমধ্যে দেশব্যাপী খ্যাতিও পেয়েছে। বহদ্দারহাট, কোতোয়ালি হতে গাড়িগুলো গিয়ে ব্রিজের গোলচত্বর গিয়ে আটকে যায়। কর্ণফুলী ব্রিজের গোলচত্বরে যেন দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী গাড়িগুলো ইচ্ছামতো যানজট সৃষ্টি করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত মাঠ। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী যাত্রীবাহী বাস রাস্তায় এলোপাতাড়ি দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকতে থাকে। ট্রাফিক পুলিশ সাহেবরা অদূরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেন।

এছাড়া আরো কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে এই যানজটের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের পটভূমিতে যানজটের নিম্নলিখিত কারণগুলো শনাক্ত করা যায় : ১. সংকীর্ণ ও অনুন্নত রাস্তাঘাট, ২. জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, ৩. বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের একই সঙ্গে চলাচল, ৪. ত্রæটিপূর্ণ ট্রাফিক ব্যবস্থা, ৫. চালকদের অদক্ষতা ও হীন মানসিকতা। এই সমস্যার সমাধানকল্পে কয়েকটি প্রস্তাব যা বাস্তবায়ন হলে যানজটের সমস্যা থেকে ঢাকাবাসী মুক্তি পেতে পারেন-

(১) যেসব শহরে আগে যানজট ছিল এখন নিয়ন্ত্রিত যানজট; সেসব দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের আমাদের এ দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে যানজট নিরসনে পরামর্শ নেয়া। (২) সরকার যানজট সমস্যা নিরসনে দেশি ও বিদেশি সদস্যের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এই কমিশন যানজটের প্রকৃত কারণ নির্ণয়সহ সমাধানের পরামর্শ দিতে ও প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের পরামর্শ দেবে। (৩) রাজধানী শহরতলী কাঁচপুরের যানজট নিরসনে যাদের ভূমিকা রয়েছে তাদের ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে কাজে লাগানো যেতে পারে। (৪) রাজধানী ঢাকার প্রাইভেট কারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাধিক্য যানজটের একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচ্য হয়। (৫) অবৈধ দখলদারদের নিকট থেকে ফুটপাত ও অন্যান্য রাস্তা দখলমুক্ত করতে হবে। (৬) রেল ক্রসিংগুলোতে ওভারব্রিজ তৈরি করলে যানজট অনেকাংশে নিরসন হবে। (৭) গাড়ির চালককে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করা ও গাড়ি ঘোরানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা দরকার। (৮) রাজধানীতে সৎ, পরিশ্রমী এবং সাহসী ট্রাফিক পুলিশ অফিসার নিয়োগ দিতে হবে। (৯) সরকার যানজট নিরসনের বিষয়ে অধিক মনোযোগী হবে।

ঢাকার রাস্তায় যানবাহন বৃদ্ধির সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে যানজট। নগরীতে সাধারণ মানুষের জন্য একমাত্র ভরসা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। প্রতিটি বাসে প্রায় ৫০-৬০ জন মানুষের ধারণক্ষমতা রয়েছে। চলমান মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে রাজধানীর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর যোগাযোগ স্থাপিত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে ধীরগতি ও দ্রুতগতিসম্পন্ন যানের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, ও তা নিয়ে কাজ করতে হবে।

যানজট সমস্যার সমাধান করতে পারলেই রক্ষা পাবে জনগণ। সময়ের সঠিক ব্যবহার হবে। দেশ ও জাতিকে উন্নয়ন করার জন্য যানজট সমূলে উৎপাটন করা প্রয়োজন। এর ফলে আর নষ্ট হবে না রাজধানীতে বসবাসরত মানুষের কর্মঘণ্টা। উপরন্তু তা দেশের সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান সহায়ক হয়ে উঠবে।

হরিা তালুকদার : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App