×

পাঠকের কলাম

বয়সসীমা পঁয়ত্রিশ নিয়ে সরকার ভাবতে পারে

Icon

আনিসুর রহমান

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। তারুণ্যের দেশ বললেও ভুল হবে না। কারণ গত বছর অনুষ্ঠিত হওয়া ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য বলছে, মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের মধ্যে, যা সংখ্যায় দাঁড়ায় ১০ কোটি ৮৭ লাখের বেশি। যার মধ্যে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সি জনসংখ্যা ৩ কোটি ২ লাখ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্বের সংখ্যা। অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তিরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যার প্রমাণ বড় বড় প্রকল্পগুলোতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা। যুবসমাজকে দক্ষ করতে নানামুখী আলোচনা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হলো চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার সীমাবদ্ধতা। বয়সসীমা শেষ হওয়ার ভয়ে যুবসমাজ দক্ষতা বৃদ্ধির পরিবর্তে চাকরির পেছনে ছুটছে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর। পুলিশের এসআই-সার্জেন্টসহ কিছু পদে ২৭ বছর। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বয়সসীমার এই নীতি মেনে চলছে। ফলে ৩০ বছরের পরে একজন যুবককে বেকারত্বের গøানি নিয়ে চলতে হয়। অথচ এ দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করতে সময় লাগে ২৫ থেকে ২৬ বছর। যেখানে স্নাতকে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থীকে নিজ পাঠ্য ও গবেষণায় মনোনিবেশ করার কথা, সেখানে অসংখ্য শিক্ষার্থী বয়সসীমা শেষ হওয়ার ভয়ে একাডেমিক পড়াশোনায় সময় না দিয়ে একাডেমিকের সঙ্গে সম্পূর্ণ অমিল সরকারি চাকরির পড়াশোনায় ব্যস্ত। এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার আঁতুড়ঘর হওয়ার কথা, সেখানে বিসিএস প্রস্তুতির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কিংবা গবেষণা করতে গিয়ে বয়স ৩০ বছর অতিক্রম করায় তারা বিদেশেই থেকে যাচ্ছেন। জানা যায়, বর্তমান বিশ্বের ১৬২টি দেশের চাকরির নিয়োগে আবেদনের বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ থেকে ৫৯ বছর পর্যন্ত। আমরা সবকিছুতে উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ দিই, তাদের সবকিছু অনুসরণ করি। তাহলে শুধু এই ক্ষেত্রে কেন বিপরীতে অবস্থান? তারা যদি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি কিংবা উন্মুক্ত রেখে উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে তাহলে আমাদের দেশে চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধি করতে সমস্যা কোথায়? ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে ৩০ বছর করা হয়। এরপর ৩৩ বছর পেরিয়ে গেছে, এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ৫৭ বছর থেকে ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে, তবু চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়েনি। শুধু তাই নয়, ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে দাবি-দাওয়া ছাড়াই একতরফাভাবে শুধু অবসরের বয়স ৫৭ থেকে বাড়িয়ে সাধারণদের জন্য ৫৯ বছর আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য ৬০ বছর করা হয়। কিন্তু প্রবেশের বয়সসীমা বাড়েনি। এ দেশের শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও গবেষকরা বয়সসীমা বৃদ্ধি কিংবা উন্মুক্ত করে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি বিষয়টি উপলব্ধি করে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে মেধা ও দক্ষতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। একই দেশের নাগরিক হয়েও শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) আবেদনের বয়সসীমা ৩০ বছর হলেও এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজে ৩৫ বছর, সরকারি নার্সিংয়ে ৩৫ বছর এবং বিজিএসে ৩২ বছর। বড় আক্ষেপের বিষয়, জাতীয় যুব নীতিতে ১৮-৩৫ বছর বয়সিদের যুবক বলে গণ্য হলেও ৩০ বছর বয়সে তাদের চাকরিতে আবেদনের সুযোগই দেয়া হচ্ছে না। করোনা মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সময়মতো ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় তীব্র সেশনজটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। করোনা মহামারির শুরুতে যাদের বয়স ২৭-২৯ বছর ছিল তাদের বয়স এখন ৩০ বা ততোধিক। ফলে তারা ৩০ বছরের পরিবর্তে ২৭ বছর সময় পেয়েছে। যার ফলে অসংখ্য শিক্ষিত যুবক এখন বেকার হয়ে বসে আছে এবং এর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। সবশেষে বলতে চাই, দক্ষ জনশক্তি রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার বাধা দূর করে দক্ষতাকে মূল্যায়ন করা জরুরি। এ দেশের যুবসমাজকে বেকারত্বের হাত থেকে মুক্ত করতে এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা অন্তত ৩৫ বছর করা হোক। আনিসুর রহমান : সাংবাদিক ও লেখক, পটুয়াখালী।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App