×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

পাঠক ফোরাম

পানওয়ালি

Icon

গোপাল নাথ বাবুল

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পানওয়ালি

পানওয়ালি মরে গেছে। চার দিন পর গত রাতে কোথা থেকে এসে ঘরে ঢুকেই খিল দিয়েছিল। এরপর সকাল ৯টা বাজার পরও দরজা না খোলায় প্রতিবেশী শেফালীর মায়ের সন্দেহ হয়। বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখেন, পানওয়ালি খড়ের চালের বাঁশের হুকের সঙ্গে ঝুলে আছেন। তিনি চিৎকার দেয়ার পর আশপাশ থেকে সবাই এসে লাশ নামিয়ে বিছানায় শুয়ে দিয়ে পুলিশকে খবর দেয়।

কথাটি শুনেই আঁতকে ওঠে সনাতন। এটা শোনার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সুন্দরী নেই, তা ভাবতেই পারছে না। এই যেন ব্যথার ওপর প্রচণ্ড ব্যথা। নিজে আর তাল মেলাতে পারছে না। মাথাটা যেন পৃথিবীর সঙ্গে সমানতালে ঘুরছে। পাশে দাঁড়ানো বন্ধু মোস্তাক মিয়া না ধরলে হয়তো মাটিতে পড়ে যেত। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। কেউ যেন তার হৃদয়টা হাত দিয়ে কচলিয়ে দিয়েছে। হতাশাগ্রস্ত সনাতনকে মৃত্যু তাড়া করে ফিরছে। মূলত গত চার দিন সে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করেছে। নাওয়া-খাওয়া প্রায় বাদ ছিল। চার দিনে সে সম্ভবত চার বেলা ভাত মুখে তোলেনি। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকত। চার দিন পর মনটা একটু শান্ত হলে নিয়তিকে মেনে নিয়ে সবেমাত্র সনাতন বাড়ি থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছে। উদ্দেশ্য, চাঁপাতলার দোকানে বসে নাশতা করবে। তারপর প্যাসেঞ্জার পেলে গন্তব্যে চলে যাবে।

প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা পানওয়ালির দোকান থেকে চা-বিস্কুট ও সুস্বাদু পান খেত। নয়ন ভরে দেখত পানওয়ালিকে। কয়েক ঘণ্টা না দেখলে যেন সনাতনের ভালো লাগত না। দুনিয়াটাই অসাড় লাগত। তাই প্যাসেঞ্জার নিয়ে আসা-যাওয়ার ফাঁকে বসে চা-নাশতা-পান খেত। মূলত সনাতন পান খাওয়া শিখেছে পানওয়ালির কাছে। দোকানে এসে দেখল, থমথমে ভাব, চারদিকে মানুষজনের ফিসফাস। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছে। কারণ জিজ্ঞেস করলেও কেউ কিছু বলছে না। সবার যেন ভাব, সেঁধে গিয়ে ঝামেলায় জড়াবে কে?

কাঁপা কাঁপা পায়ে সনাতন এগিয়ে গেল সামনের দিকে। মেস্ত্রী দার চা দোকানও আজ খোলেনি। নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছে। পুলিশ এলে আবার সাক্ষী দিতে হবে! এই চাঁপাতলায় মাত্র দ্ুিট চা স্টল আছে। একটা মেস্ত্রী দা’র, অপরটি পানওয়ালির। চা স্টলের সঙ্গে পানের দোকান। চিৎকার করে ‘আবার চলুক মিঠা পান’ বলে পানের শো-ক্যাশে একটা সজোরে থাপ্পড় দিয়ে কাস্টমারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত পানওয়ালি। তার হাতে বানানো মহেশখালীর মিষ্টি পানের খুব কদর। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে পানখোররা আসত তার জাদুর হাতের পান ও চা খাওয়ার জন্য। পানওয়ালির আসল নাম সুন্দরী। তবে সুন্দরী নামটা এখন মানুষ ভুলে গেছে। ওই নামে কেউ আর ডাকত না।

এই দোকানটা ছিল তার পালক বাবা সূর্যকান্তের। তার মায়ের নাম ছিল কমলা রানী। ছোটবেলায় মা-বাবা দু’জনই কমলাকে এতিম করে স্বর্গে চলে যায়। তারপর থেকেই পাড়ার ধীরেন্দ্র বাবুর ঘরের ফাই-ফরমাশ কেটে তার দিন কাটত। ভালো নাচত। পুরনো দিনের হিন্দি গান ‘ও লাল মেরী’ বা ‘হাওয়া মে ওড়তা যায়ে’ কিংবা ‘কাজরা মোহাব্বতওয়ালা’র সঙ্গে কমলা যখন বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে কোমর দুলিয়ে চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচত, তখন দর্শকরা তাকে চিৎকার করে হিন্দি সিনেমার নায়িকা ‘মধুবালা’ বলে ডাকত।

কমলার প্রথম স্বামী ছিল চন্দ্রমোহন। দু’জনের খুবই সুখের সংসার ছিল। কিন্তু তাদের কপালে এত সুখ সইল না। বিয়ের ৬ মাসের মাথায় ম্যালেরিয়া জ¦রে আক্রান্ত হয়ে পরলোকে পাড়ি জমাল চন্দ্রমোহন। কমলা চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল। কী করবে এখন সে! কীভাবে এই ভরা যৌবন নিয়ে জীবন কাটাবে? চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে গেল। তবে কয়েক দিন ধরে কমলা লক্ষ্য করল, বড়বাবুদের কামলা মন্টু তাকে খেয়াল করছে। ঘাট থেকে তার দিকে একপলকে চেয়ে থাকে। তাগড়া জোয়ান ছেলে। কৃষিকাজের সিজনে নেত্রকোনা থেকে আসে মন্টুরা। কাঁচিসহ কৃষিকাজের বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে কামলার হাটে দাঁড়ায়। সেখান থেকে কৃষকরা দরদাম করে দৈনিক হিসেবে তাদের নিয়োগ করে। একদিন দুপুর বেলা ¯œান করার জন্য ঘাটে এলে মানুষজন না থাকার সুযোগে মন্টু কমলাকে বলল, আপনি খুব সুন্দর। যেমনি আপনার শরীরের গঠন, তেমনি আপনার রং। লোভ হয়।

মন্টু নিলর্জ্জের মতো বললেও কথাগুলো কমলার মনে রং ছড়ায়। ফিক করে হাসি দিয়ে দ্রুত পানিতে নেমে ডুব দিয়ে কমলা ভেজা কাপড়ে বাড়িতে চলে গেল। মন্টু হলো বিয়ে পাগলা মানুষ। যেখানে কামলা দিতে যায়, সেখানেই ছলে-বলে-কৌশলে একটা বিয়ে করে। এরপর সন্ধ্যায় কমলার সঙ্গে মন্টুর আবার ঘাটে দেখা। দু’জনের মধ্যে কিছুক্ষণ কথা হয়। কমলার ভরা যৌবন আষাঢ়ের নদীর উথাল-পাথাল ঢেউয়ের মতো মন্টুর ওপর আছড়ে পড়ে। তার কিছুদিন পর লোকজনের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল কমলার পেটে মন্টুর সন্তান। দৃশ্যমান পেট কী আর ঢেকে রাখা যায়? বিচার-সালিশ হলো। বিচার সভায় মন্টু কথা দিল, সে কমলাকে বিয়ে করবে। বিয়ের খরচ দেবে বড়বাবু। কিন্তু বিয়ের আগের দিন মন্টু পালিয়ে গেল।

আশার আলো জে¦লেও আবার কমলা বড় বিপদে পড়ে গেল। কমলা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। পেটে তার চার মাসের সন্তান। পাড়া-প্রতিবেশীর একেকটি কথা যেন তীরের ফলার মতো তার শরীরকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। এত অপমান-লাঞ্ছনা তার আর সহ্য হচ্ছে না। কমলা সিদ্ধান্ত নিল, এবার সে গলায় দড়ি দেবে।

পাশের বাড়ির বান্টুনির মার চিৎকার শুনে সবাই এগিয়ে এসে কমলার হাত থেকে দড়ি কেড়ে নিল। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে চা দোকানদার সূর্যকান্ত এগিয়ে এলো। কোনো রাখঢাক না রেখে বলল, কমলাকে সে বিয়ে করবে। কেউ কেউ খুশি হলো। বলল, একজন অসহায় ও নিরাশ্রয় মেয়ের আশ্রয় হলো। আবার কেউ কেউ ভেংচি কেটে বলল, সূর্যকান্ত আর মেয়ে পেল না! কেউ কেউ বলল, সূর্যকান্ত বড় ভাগ্যবান! বিনা কষ্টে স্ত্রীর সঙ্গে বোনাস হিসেবে একটা সন্তানও পেল।

বিয়ের কিছুদিন পর কমলার একটা ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে হলো। নাম রাখা হলো সুন্দরী। সুন্দরী এখন সূর্যকান্তের মেয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সুন্দরী তার মাকে হারায়। এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে কমলা রানী ইহকাল ত্যাগ করে। সূর্যকান্ত মেয়েকে নিয়ে দোকানে বসে। মেয়ে দিন দিন ডাগর হয়ে উঠছে। সনাতনের প্রেমও গাঢ় থেকে গাঢ় হচ্ছে। তাই প্রতিদিন অন্তত কয়েকবার সুন্দরীকে দেখা চাই। মন না চাইলেও চা পান করে, চিবিয়ে চিবিয়ে পান খায়। সুন্দরীর দু’নয়নে প্রেমের ঢেউ। তাই সনাতন এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সুন্দরীর দিকে। সুযোগ পেলে দু’জনের মধ্যে পিরিতির বাক্য বিনিময় হয়। দু’জনই আরো কাছাকাছি আসতে চায়। পান ও চা-পানি দেয়া-নেয়ার ছলে দু’জনই দু’জনকে স্পর্শ করে সুখ পায়।

ভাবনায় ছেদ পড়ে যখন সনাতনের পিঠে কেউ হাত রাখে। চমকে ওঠে সনাতন। পেছন ফিরে দেখে তার পরম বন্ধু মোস্তাক। ডেকে নিয়ে যায় দোকানের পিছনে। মোস্তাক সনাতনকে বোঝায়, বন্ধু, তুই এই সম্পর্ক থেকে ফিরে আয়। পানওয়ালির ওপর নজর পড়েছে মাস্তান মেম্বারের ছেলে জামিলের। অবাক হয়ে সনাতন বলে, জামিল! সেতো বিবাহিত। তার দুই টা মেয়েও আছে। সে কেন সুন্দরীর দিকে নজর দেবে?

এটা তার স্বভাব। নজর যখন একবার দিয়েছে, তখন সে পানওয়ালিকে তোর হতে দেবে না। আমরা রিকশা চালিয়ে খাই। আমাদের এত প্রেম মানায় না সনাতন।

মোস্তাকের কথায় সনাতনের হৃদয়ে তুফান শুরু হয়। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। এর মধ্যে একদিন সুন্দরীর বাবা সূর্যকান্তও পৃথিবী ত্যাগ করে। এখন সুন্দরী একাই দোকান চালায়। তার হাতের ছোঁয়ায় রসময় হয়ে ওঠা পান খেতে অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে। ‘আবার চলুক মিঠা পান’ বলে চিৎকার দিয়ে কাস্টমার ডাকে। সুন্দরী নামে এখন কেউ ডাকে না তাকে। সবাই পানওয়ালি নামেই ডাকে।

একদিন সনাতনকে একা পেয়ে জামিল জিজ্ঞেস করে, কিরে ফকিরনির বাচ্চা, তুই পানওয়ালির সঙ্গে পিরিত করস নাকি? সনাতন চুপ করে থাকে। কোনো উত্তর না পেয়ে এবার জামিল বলে, এই ফকিরনির বাচ্চা, ভালো করে শুনে রাখ। পানওয়ালির দিকে চোখ দিবি, দুই চোখ তুলে নেব বুঝলি? সনাতন দ্রুত পা চালিয়ে স্থান ত্যাগ করে।

একদিন ভোরে মোস্তাক পানওয়ালির হাতে লেখা একটি চিঠি সনাতনের হাতে দিয়ে বলে, পানওয়ালি কাল রাতে জামিলের সঙ্গে ভাগছে। বিশ্বাস করতে পারছে না সনাতন। কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।

‘সনাতন, প্রথমে আমার ভালোবাসা নিও। আমি চললাম জামিলের সঙ্গে। তোমার প্রাণ বাঁচাতে জামিলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া ছাড়া আমার অন্য কোনো উপায় ছিল না। আমি জামিলের কথা না শুনলে সে তোমার জান খতম করে দিত। বর্তমানে আমার পেটে ওর তিন মাসের সন্তান। তুমি ভালো থেকো, সতর্ক থেকো। পরজনমে দেখা হবে। ভগবান সহায়।

ইতি, তোমার সুন্দরী।’

জামিল তার কইলজা ধরে টান দিয়েছে। এই মুহূর্তে তার কিছুই ভালো লাগছে না। পৃথিবীটা তার কাছে বিষময় হয়ে উঠেছে। সুন্দরীর চলে যাওয়াটা সাপের ছোবলের মতো সনাতনের বুকে লেগেছে। বিষাক্ত সাপের দংশনে যেমন শরীরের রক্ত দলা পাকাতে থাকে, তেমনি দুঃসহ যন্ত্রণা তার মৃত্যুকে গ্রাস করতে থাকে। শীতের এই ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেও সনাতন ঘামতে থাকে। চোখের সামনে যেন নেমে আসছিল গাঢ় কালো যবনিকা। ঘর থেকে আর বের হলো না। নিজে থেকেই বন্দি হয়ে থাকল চার দিন। আর বন্দিদশা থেকে বের হয়েই শুনতে হলো সুন্দরীর মৃত্যু সংবাদ। এই সংবাদ থেকে প্রাপ্ত ব্যথাটা মৃত্যু পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে হবে। সুন্দরী, তুমি আমার কাছে কেন চলে এলে না! আমাকে কেন বিশ্বাস করতে পারলে না! মনের অজান্তে এমন কথা ভাবতেই পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করল সনাতনকে।

গোপাল নাথ বাবুল : দোহাজারী, চট্টগ্রাম

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App