×

পাঠক ফোরাম

শেখ শামীমা নাসরীন পলি

এই সময়ের গল্প

Icon

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এই সময়ের গল্প

কয়েকটা রাত ধরে সুমন ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। যে গরম পড়েছে! ফ্যানের নিচেও ঘেমে ভিজে যায় শরীর। ছেলেমেয়ে দুটি ছটফট করে। সুমন তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করে। ও ক্লান্ত হয়ে পড়লে নীরা বাতাস করে। এভাবেই পালাবদল করে ওদের রাত শেষ হয়। তাই অফিসে এসে সুমনের খুব ঘুম পায়। ঝিমাতে ঝিমাতে ও কাজ সম্পন্ন করে। বিশেষ করে লাঞ্চের পর আর নিজেকে সামলাতে পারে না। চেয়ারে হেলান দিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিতে চায়, কিন্তু পারে না। পারবেই বা কী করে? অফিসের সব কাজ যেন একা সুমনের। দাঁড়িয়ে, বসে মেয়ে কলিগদের সঙ্গে একেকজন আড্ডা মারবে আর কোনো কাজ দিলে বলবে- সুমন ভাই, প্লিজ! আপনি একটু ম্যানেজ করুন।

সুমন নিজের কাজ করে আবার অন্য ডিপার্টমেন্টের কাজও করে। ওর বাজে একটা অভ্যাস হলো, কাউকে না করতে পারে না। এজন্য সবাই ওকে পেয়ে বসে। ও বলে- কাজের মধ্যে থাকলে বাজে অভ্যাসের দিকে মন যায় না।

অন্য কলিগরা যখন আড্ডা মারে সুমন তখন কাজ করে, না হয় নীরার সঙ্গে কথা বলে।

ওরা শুধু আড্ডাই মারে না, কারো কারো সঙ্গে অন্যরকম সম্পর্ক। যাকে বলে শারীরিক সম্পর্ক। সুমন ভেবে পায় না- ঘরে স্ত্রী-সন্তান/স্বামী-সন্তান থাকতে কী করে অন্য পুরুষ-নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করে? সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করে, কী করে? এদের বিবেকে বাধে না? আসলে বিবেক থাকলে কি আর নিজের সঙ্গীকে কেউ ঠকাতে পারে?

সুমন মাঝে মাঝে ভাবে, সামান্য কিছু টাকার জন্য কিছু মেয়ে নিজেকে এতটা সস্তা/নিচে কীভাবে নামাতে পারে? নিজের আত্ম-সম্মান, মর্যাদা, ইজ্জত বিকিয়ে দিলে সেই মানুষটির আর কীইবা থাকে?

ছোট বেলা থেকে বাবার কাছ থেকে শুনে এসেছে- চরিত্র অমূল্য সম্পদ। এটাকে নষ্ট করো না। টাকা-পয়সা খোয়া গেলে তা আবার ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু মান-সম্মান একবার নষ্ট হয়ে গেলে সেটা আর ফেরত আসে না। সুতরাং তোমরা এমন কোনো কাজ করবে না যাতে মানুষের চোখে ছোট হয়ে যাও। কেউ যেন আঙুল তুলে তোমাদের না দেখায় যে, ওরা ওই নোংরা কাজটা করেছে। মান-ইজ্জত ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্যই এক। সমান।

সুমন সেদিন কয়েকটি শোরুম ঘুরে দেখে। নাহ! সাধ ও সাধ্যের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছে না। পকেট ভর্তি টাকা নিয়েও মানুষ এসি পাচ্ছে না! উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বেশি। এসি কেনার হিড়িক পড়ে গেছে। এত বেশি ভিড় আর চাপ যে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না। আবার নিজের কাছে একটু লজ্জা লজ্জাও লাগছে। এই সময়ে কিস্তিতে এসির কথা শুনে শোরুমের কর্মচারীরা উল্টাপাল্টা মন্তব্য করে বসবে। ওরা এমনভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলে যে, নিজের রাগ কন্ট্রোল করা যায় না। আবার ব্যক্তিত্বেও লাগে।

সুমন কয়েকটা শোরুম ঘুরে বাসার উদ্দেশে রওনা দেয়। অফিস শেষে বাসায় ফেরাও খুব রিস্কি। এত ভিড়ের মধ্যে বাসে ওঠা যায় না। আর যেমন গরম তেমন মানুষের ঘামের গন্ধে প্রাণ যায় যায় অবস্থা! মেট্রো রেলেও সেই ভিড়! পা ফেলার মতো জায়গা থাকে না। যদিও সুমনের বাসায় যেতে মেট্রো রেল পড়ে না। অফিসের কাজে ও দুই দিন মেট্রোতে উঠেছে। নিজের দেশে মেট্রোতে উঠে বিদেশ বিদেশ ফিল হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বললে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার শতভাগ সফল। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প নির্মাণসহ সব রাস্তা-ঘাটের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অনেক বেশি। এদিকে কেউ লাগাম দিতে পারছে না। পেঁয়াজের মৌসুম চলে, তারপরও দাম কমছে না। এখনো পেঁয়াজের কেজি ৭০ টাকা। আলু ৫০/৫৫ টাকা কেজি। গ্রামের মানুষ যে কলমি শাক খায় না, সেই কলমি শাকের আঁটি ১৫ টাকা। দুই আঁটি নিলে বলে-কয়ে ২৫ টাকায় কেনা যায়। অন্যান্য সবজির দামও বেশি।

সবজি বিক্রেতাদেরও দারুণ সব যুক্তি! সেদিন ভ্যানে ছোট্ট এক আঁটি লাল শাকের দাম চাইল ২০ টাকা। সুমন অবাক হয়ে বলল, এক আঁটি লাল শাক ২০ টাকা! এত দাম কেন?

শাকসবজিতে পানি ছিটাতে ছিটাতে তিনি বললেন, যুদ্ধের জন্য সবকিছুর দাম বেড়েছে।

- মামা, শাকসবজি কি ইসরায়েল থেকে আসে?

সবজি বিক্রেতা বিরক্ত হয়ে বলল- এই দামে নিলে নেন, না নিলে কথা বাড়াইয়েন না।

সুমন নির্বিকার হয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে চলে আসে। যিনি এই শাকসবজি কষ্ট করে উৎপাদন করছেন, তিনি তো ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। সব জায়গায় সিন্ডিকেট।

সুমন লুঙ্গি পরে খালি গায়ে নিচে বসে মেয়ের পড়া দেখিয়ে দিচ্ছে। নীরা সুমনের রোমশ বুকের দিকে লক্ষ্য করে। বুকের অনেক পশম সাদা রং ধারণ করেছে। সুমনের সঙ্গে নীরার প্রেমে পড়ার এক নম্বর কারণ ছিল ওর বুকের পশম। সেই অল্প বয়সে কার মুখে যেন শুনছিল, যে পুরুষের বুকে অনেক লোম থাকে সেই পুরুষ বউকে অনেক ভালোবাসে। নীরা সেই ভালোবাসার লোভে কিশোরী বয়সে সুমনের প্রেমে পড়েছিল। ভাইয়ের বন্ধু ছিল সুমন। সাত বছর প্রেম করার পর বাড়ির সবার অমতে সুমনকে বিয়ে করে দারুণ সুখে দুজন সংসার করছে। সংসারে অভাব আছে, কিন্তু কোনো অভিযোগ নেই। সুমন তার ভালোবাসার সবটা দিয়ে নীরাকে আগলে রেখেছে। যে মেয়েটি প্রাচুর্য ছেড়ে সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের এক যুবকের সঙ্গে সারাজীবন থাকবে বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে, তাকে তো ভালোবাসার প্রাচুর্যে ভরাতেই হয়।

নীরা সুমনের বুকের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সুমন বলে- কী দেখো? বুড়ো হয়ে গেছি?

- হু! আমি তোমার সঙ্গে বুড়ি হবো!

সুমন মøান হেসে আক্ষেপ করে বলে- মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে ভালোই হতো! চাকরি ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা পাওয়া যেত! যে বেতনে সংসার চালাতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, সেই একই বেতন পেয়ে একটা মেয়ে কী করে বিলাসী জীবনযাপন করে?

- মেয়ে হলে তোমারও তো ওই লাইনে যেতে হতো। তুমি কি পারতে? পারতে না কখনই। তোমার বাবা-মা তোমাদের সেই শিক্ষায় বড় করেননি। এসব ফালতু কথা না বলে বলো, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহতাআলা আমাদের অনেক ভালো রেখেছেন।

সুমন নীরার দিকে তাকিয়ে ভাবে, পুরুষ মানুষ অসৎ হয় স্ত্রীর জন্য। না, শতভাগ স্ত্রী দায়ী নয়। তবে ৯০ ভাগ স্ত্রীদের জন্য। প্রতিটা পুরুষ যদি নীরার মতো একটা বউ পেত, তবে পুরুষ জীবন ধন্য হতো।

- ইস্কাটন, ঢাকা

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App