×

পাঠক ফোরাম

দোষ ছিল না

Icon

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দোষ ছিল না
বিয়ের আগে ঘটকবাবু এই পরিবার সম্পর্কে যতগুলো ইতিবাচক কিচ্ছা শুনিয়েছেন, বাস্তবতায় তার কোনোটার সঙ্গেই মিল খুঁজে পাচ্ছে না সাবিনা। বিয়ের মাসখানেক পার না হতেই সাবিনা টের পায় এই সংসার নিয়ে শাশুড়ি তার অনেক কলকব্জা নাড়াচ্ছেন নিজের খুশিমতো। কাউকেই তিনি পাত্তা দিচ্ছেন না। সংসারটাকে রাজপ্রাসাদ কল্পনা করে নিজেই যে রাজপ্রাসাদের মহারানী সেজে আছেন। যদিও সাবিনার সঙ্গে নাসিমা বেগম এখনো কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি। করবেনই বা কি করে! নতুন বউ হিসেবে সাবিনা নিজেকে যথেষ্ট মার্জিত স্বভাবের নারী হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছে। তবে সমস্যা হচ্ছে অন্যখানে। তার স্বামী শফিককে নাসিমা বেগম সহ্য করতে পারেন না। সৎমা হিসেবে শফিক যদিও নাসিমা বেগমকে কখনো আলাদা নজরে দেখেনি। কিন্তু সৎ ছেলে শফিকের প্রতি নাসিমা বেগমের হৃদয়ভরা সব কুটচাল। শফিক এত কিছু জানে না। সৎমা হলেও শফিক সবসময়ই দেখে এসেছে নাসিমা বেগম তাকে দুই চোখের মণি করে রেখেছেন। আদর যতেœ কখনো অবহেলা করেননি। কিন্তু এসব কিছু যে চতুর নাসিমা বেগমের কৃত্রিম আচরণ, ঘুণাক্ষরেও সেটির আঁচ করতে পারেনি বোকা শফিক। পারবেই বা কী করে! শফিক কি আর সারাদিন ঘরে বসে থাকে? দীর্ঘদিন টিউশনির পর এবার সে ব্যাংক কর্মকর্তা। তাই দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে কেটেছে। কিন্তু ঘরে এসে সে ঠিক মায়ের আদর যতœ পেয়েছে। তাই সহজে ধরতে পারেনি সৎমা নাসিমা বেগমের অভাবনীয় চালাকি। সৎ ছেলে শফিককে মিথ্যা মমতায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে ধূর্ত নাসিমা বেগম যে তার পেটের ছেলে রনির নামে স্বামীর সব সম্পত্তি কৌশলে লিখে নেবে, এ ব্যাপারে এখনো শফিকের মনে কোনো ধারণার জন্ম হয়নি। সৎমা হলেও নাসিমা বেগমের মধ্যে কোনো নেতিবাচকতা দেখেনি শফিক। তাই নাসিমা বেগমকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনে শফিক নিজেকে উজাড় করে বিলিয়ে দিতে কখনোই বিলম্ব করেনি। গত কয়েক দিন আগে ধুমধামে বিয়ে হল শফিকের। নতুন বউ সাবিনা শাশুড়ির এসব চলচাতুরি ধরে ফেলে অল্প সময়ে। নাসিমা বেগম যখন তার বোনদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন স্বামীর সকল সম্পত্তি কোন কায়দায় রনির নামে লিখিয়ে নেয়া যায়, তখন আড়াল থেকে সাবিনা সব শুনে ফেলে। তারপর বারবার ভেবেছে শাশুড়িকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করবে। কিন্তু নতুন বউ হিসেবে এই কাজটি তার অনুচিত হবে মনে হওয়ায় মুখ বন্ধ রেখেছে। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়- শফিককে এই বাস্তব সত্য জানানো দরকার। রাতেই শফিককে বিস্তারিত সব জানায়। কিন্তু এ ব্যাপারে শফিকের কোনো মাথাব্যথা দেখতে পায়নি সাবিনা। তাই নীরবতায় রাত পার করে দিয়েছে। দিন কাটতে থাকে এভাবেই। বোনদের সঙ্গে শাশুড়ির শলা-পরামর্শগুলো প্রায়ই আড়াল থেকে কানে পৌঁছে যেতে যেতে সাবিনা একপ্রকার আন্দোলিত হয়ে ওঠে। শফিক বাসায় এলে তাকে পিঁপড়ে খেয়ে ফেলার ভয়ে যেন মাথায় তুলে রাখা শাশুড়ির এমন ভালোবাসার মিথ্যে অভিনয় দেখে গা জ্বলে উঠে। শফিকও যে ভীষণ মা ভক্ত। সেই কারণে সাবিনার মনে হয় শফিক তার তুলনায় শাশুড়িকে গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি বেশি। তবুও এমন বোকাসোকা মানুষটির ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পুষে রাখে না মনে। কিন্তু শাশুড়ির এমন চালবাজির কথা শফিককে জানাতেই হবে। - আমার কিন্তু এসব কথা বিশ্বাস হচ্ছে না সাবিনা। মা আমাকে খুব ভালোবাসে। - সব তার অভিনয়। তোমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তার আগে চলো আমরা এ সংসার ছেড়ে আলাদা হয়ে যাই। - জীবনেও না। এখন সব বুঝতে পেরেছি। - কী বুঝতে পেরেছো? - তুমিই তো দেখছি সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাচ্ছো। তুমি চাও না মা আমাদের সঙ্গে থাকুক। কিন্তু তোমার সেই কুমতলবের স্বপ্ন কখনোই পূর্ণ হবে না। - কিসের কুমতলব! তুমি আমাকে অপমান করছো। সৎমাকে যে দরদ দেখাচ্ছো, সে সৎমা একদিন তোমাকে পথে বসিয়ে দেবে। মনে রেখো, সব সম্পত্তি সে তার পেটের সন্তান রনির নামে লিখে নেবে। শফিকের মাথা গরম হয়ে গেল সাবিনার কথায়। রাগ সহ্য করতে না পেরে সে কষে এক চড় মারে সাবিনাকে। নতুন বউ হিসেবে সাবিনার জন্য এটি ছিল জঘন্য অপমান। সে অপমান সহ্য করতে না পেরে পরদিন সকালে বাপের বাড়ি চলে যায়। নাজমুল হুদা এবং মনোয়ারা বেগম মেয়ের কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে হতভাগ। শফিক তাদের মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে, এর একটা বিহিত করতেই হবে। নতুন বউয়ের গায়ে যে ছেলে হাত দিতে পারে, সেই ছেলের হাতে মেয়েকে পুনরায় তুলে দেয়া কোনোভাবে সম্ভব না। বিয়ের ঠিক এগার মাসের মাথায় শফিক আর সাবিনার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। বিচ্ছেদের দিন সাবিনা অঘোরে কাঁদলেও শফিকের বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনি। সাবিনাকে নিয়ে সংসার করলে তাকে আলাদা বাড়িতে উঠতে হবে, এই কল্পনা শফিককে সাবিনার ব্যাপারে একটুও করুণা করেনি। ২. দিন চলে যেতে থাকে। বিচ্ছেদের দেড় বছর পর একদিন শফিক সকালে দাঁত ব্রাশ করতে করতে শোনে মা তার বড় খালার সঙ্গে ফোনে ফিসফিস করে বলছে, ‘বুবু, অনেক কষ্টে সকল সম্পত্তি আমার রনির নামে লিখিয়ে নিয়েছি। শফিক এক কানাকড়িও পাবে না। এবার সতীনের ছেলেটাকে এই সংসার থেকে তাড়াবার আখেরি যুদ্ধে নামতে হবে আমাকে। আচ্ছা বুবু এখন রাখি। শফিক আবার কোনো ফাঁকে যদি সব শুনে ফেলে, তা হলে তো সর্বনাশ।’ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না শফিক। এ কী শুনল! তার মানে মা সম্পর্কে সাবিনা তার কানে যা যা দিয়েছে, সব সত্যি? মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল শফিকের। সাবিনার সঙ্গে সে অনেক বড় অন্যায় করেছে শুধু এই বহুরূপী মায়ের কারণে। নিজের সংসারটাকে নিজের হাতেই ভেঙে দিয়েছে এই নারীর কারণে। না, মায়ের এত বড় অন্যায়ের একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। তার আগে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে সাবিনার কাছে, যার কোনো দোষ ছিল না। সাবিনাদের বাড়িতে এসে শফিক দেখে সারা বাড়িতে উৎসব লেগে আছে। একটা ছেলেকে সাবিনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারে আজ সাবিনার বিয়ে। জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় রচনা করতে আজ আরেক পুরুষের হতে যাচ্ছে সে। অনেক চেষ্টায় চোখের পানি আড়াল করে সাবিনাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে শফিক, কঠিন বাস্তবতা যার জীবন নদীর দুই পাড় ভেঙে দিয়েছে। এক নারীর কৃত্রিম স্নেহকে আশীর্বাদ ভেবে অন্য নারীর প্রকৃত ভালোবাসাকে নিজ হাতে ঘায়েল করেছে সে। জোবায়ের রাজু : আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App