×

পাঠক ফোরাম

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

চঠিি দওি

Icon

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চঠিি দওি
করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও আঙুলের মিহিন সেলাই ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও, এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। কবি মহাদেব সাহা তার কবিতায় চিঠি দেয়ার এ উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। শব্দের বুননে তার কবিতা হৃদয় খুড়ে হাকাকার জাগিয়ে তোলে। আহ কত চিঠিই না লিখতাম আগে। শেষ কবে চিঠি লিখেছি মনেই তো পড়ে না! মুঠোফোনে হাই, হ্যালো। সে কি আর চিঠি হয়? কলম দিয়ে শব্দের পর শব্দের বুননে সব আবেগ ঢেলে দিয়ে যে চিঠি হয়, তার কি কোনো তুলনা চলে! অবশ্য তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কিবোর্ড টিপলেই অক্ষরের পর অক্ষর সেজে যায়। এখন কলম দিয়ে কাগজে চিঠি কজনই বা লিখে! কিন্তু কাগজ-কলমের চিঠির আবেদন সত্যিই কি ফুরিয়ে গেছে? এ কি ফুরিয়ে যাওয়ার মতো কিছু? তখন মুঠোফোন ছিল না। এত্ত এত্ত কুরিয়ার সার্ভিসের দেখা মিলত না। কুশল বিনিময়, দাওয়াত, শোক সংবাদ, সুসংবাদ, দাওয়াত, বন্ধুত্ব, প্রেম-ভালোবাসা, চাকরির খবর ইত্যাদি সব কিছুর মাধ্যম ছিল চিঠি। কখনো সাদা, কখনো রুল টানা কাগজে সুন্দর হস্তাক্ষরে চিঠি নিয়ে আসত ডাকহরকরা বা পোস্টম্যান। দুপুর হলেই প্রবাসীর বধূ এক আকাশ অপেক্ষা নিয়ে পথপানে চেয়ে থাকত। কখন তার প্রাণেশ্বরের চিঠি নিয়ে পোস্টম্যান বাড়ির ভেতরে পা রাখে। রাজ্যের লজ্জাভরা দু’নয়নে চিঠি নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেত সে। কি ভাবী! চিঠিতে ভাইয়া কী লিখেছে পড়ে শোনাও। দেবর-ননদদের এমন কথায় লজ্জায় লাল হয়ে যেত তার চোখ-মুখ। ইস, এও কি পড়ে শোনানোর মতো কিছু! স্বামীর আদর, আল্লাদের নানা রকম কথা বলা যায়? শহরে চাকুরে ছেলের চিঠির অপেক্ষায় বৃদ্ধ মা-বাবা। কখন খোকার চিঠি আসে। অপেক্ষা যেন শেষই হতো না। বুকের ওপর চিঠি চেপে ধরে যেন বৃদ্ধ বাবা তার ছেলের স্পর্শ খুঁজে পেত। একাত্তরে সন্তান হারিয়েছে। সন্তানের শেষ চিঠি আজো বাবা বুক পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। ছেলের শেষ চিঠিতে লেখা ছিল, যুদ্ধ শেষ হলেই বাড়ি ফিরব বাবা। যুদ্ধ শেষ হলো সেই কবে। ছেলেটি আর বাড়ি ফেরেনি। চিঠিতে ছেলেকে খুঁজে ফেরেন তার মা-বাবা। চিঠি মনের ভাব প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। বুক ফোটে তো মুখ ফুটে না। এমন মানুষেরা ছোট্ট চিঠিতেই বুকের জমানো কথাগুলো নিঃসংকোচে ঢেলে দিতে পারেন। পত্রমিতালিতে প্রেম, তারপর বিয়ে। এমন ঘটনা কিছুকাল আগেও অনেক ছিল। ছেলেটি পত্রমিতালি করে যখন মেয়েটিকে দেখতে গেল, তখন তো দফারফা। এত তার খালাম্মার বয়সী! এমন ঘটনাও ঘটত কদাচিৎ। চিঠিতে নানারকম ডাকটিকেট লাগানো থাকত। সেগুলো নেয়ার জন্য বাড়ির বাচ্চাদের কাড়াকাড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো ব্যাপার। বিদেশ থেকে আসা চিঠির খামের গায়ে থাকত বড় বড় ডাকটিকেট। তার কদরই ছিল আলাদা। মানুষটি নেই। চলে গেছে না ফেরার দেশে। তার চিঠি আছে। সযতেœ রেখে দিয়েছেন স্বজনরা। চিঠির মধ্যেই যেন মানুষটি বেঁচে আছেন। চিঠি মানে আবেগ, খোঁজখবর আদান প্রদানই নয়; এর যে সাহিত্যমূল্যও আছে। চিঠির আদলে লেখা রবিঠাকুরের গল্প স্ত্রীর পত্র, কাজী নজরুল ইসলামের বাঁধনহারার মতো পত্রোপন্যাস যেন এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। তৃপ্ত করে মন-প্রাণ। নেলসন ম্যান্ডেলা আর আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশের জন্য কারাবরণের সময়ে লেখা চিঠিগুলো যেন একেকটি প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিঠি লিখতেন প্রিয় সহধর্মিণী মৃণালিনী দেবীকে। সুকান্তের প্রতিবাদী চেতনাভরা চিঠির সংকলন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের চরম অর্থনৈতিক সংকটকালে বিদ্যাসাগরকে লেখা চিঠিগুলো আমাদের আজো দারুণভাবে নাড়া দেয়। প্রেম নিবেদনে চিঠির জুড়ি নেই। বিখ্যাত সাহিত্যিকরা চিঠির পরতে পরতে প্রেম ছড়িয়ে দিয়েছেন। প্রেমিকার সে কি দুর্দান্ত বর্ণনা। একরাশ মুগ্ধতা এনে দেয়। সে রকমই কিছু চিঠির কথা জানা যাক। জন কিটস প্রতিবেশী ফ্যানি ব্রাউনিকে চিঠি লিখেছিলেন। তার কবিতার মতোই দ্যুতিময় সে চিঠি। আর তার ভেতর থেকেও উঠে আসে এমন নিমগ্ন কথা- ভালোবাসা আমাকে স্বার্থপর করেছে। তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব¡ নেই। আমি প্রায় সবকিছুই ভুলে যাই, কিন্তু তোমাকে আবার দেখার কথা ভুলতে পারি না। হেমিংওয়ে তার প্রেমিকাকে দেয়া এক চিঠিতে লিখেছিলেন- হাত বাড়িয়ে তোমাকে পেলে প্রতিবার কী যে অনুভূতি হয়, আমি বলে বোঝাতে পারব না। মনে হয়, আমি আমার ঘরেই আছি। খুব বেশি কিছু ঘটনা নয়। কিন্তু আমরা সব সময় আনন্দে থেকেছি। বিটোফেন লিখেছিলেন বহু চিঠি, যার মধ্যে ছিল এ রকম রোমান্টিক কথা- ভালোবাসা সবকিছু দাবি করে। সে দাবি মেনেই তোমার জন্য আমি এবং আমার জন্য তুমি। নেপোলিয়নের মতো দুর্র্ধর্ষ যোদ্ধাও যখন রোমান্টিক, তখন তিনি লিখেছেন- অনুকরণীয় জোসেফাইনের জাদু যেন জ্বলতেই থাকে, আর তার শিখা জেগে থাকে আমার হৃদয়ে। মায়াহরিণী এলিজাবেথ টেলরের সৌন্দর্যের উপাসনা করে রিচার্ড বার্টন লিখেছেন- তুমি অবশ্য জানবে না, তুমি চিরকাল কী আশ্চর্যরকম সুন্দর। এও জানবে না, কী চমৎকার বিপজ্জনক রমণীয়তা তোমার অর্জিত, যা তুমি যোগ করেছ তোমার লাবণ্যে। প্রিয় মানুষদের লেখা হোক এমন এক চিঠি। যেখানে থাকবে না বলা কথা, মনের মধ্যে জমানো আবেগের সুন্দর প্রকাশ। বাবাকে আজো যে কথাটি বলা হয়নি, বলবো বলবো বলে মাকে বলা হয়নি যে কথা, প্রিয়তমাকে জানানো হয়নি ভালোলাগার কথা। আরো কত কি? সবকিছু উঠে আসুক চিঠিতে। - বনানী, ঢাকা

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App