ড. গোলাম মোয়াজ্জেম
আগামী দুই বছর দেশের অর্থনীতিতে তিন ঝুঁকি
প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক : আগামী দুই বছরে দেশের অর্থনীতিতে তিন ধরনের ঝুঁকি থাকবে। এগুলো হলো- মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য। এ তিন দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ করহারসহ ১৭ ধরনের বাধায় বিপর্যস্ত দেশের ব্যবসাবাণিজ্য। ব্যবসা পরিচালনায় ঘুষ লেনদেন আরো বেড়েছে। ৫৭ শতাংশের বেশি ব্যবসায়ী মনে করেন, কর সংক্রান্ত সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়। আগের বছর এ অভিযোগ ছিল ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবসায়ীর। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বৈশ্বিক ব্যবসায় প্রতিযোগিতা সূচকে নাজুক অবস্থায় পড়া বাংলাদেশকে টেনে তুলতে ‘রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশন’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।
গতকাল রবিবার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কার : অন্তর্বর্তী সরকারের এজেন্ডা’ শীর্ষক সংলাপে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন।
সংলাপে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল মিন্টু, এফআইসিসিআই সভাপতি জাভেদ আখতার, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, ডিসিসিআই সভাপতি আশরাফ আহমেদ ও বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে অপেক্ষা আর মাত্র ২ বছর। তবে শেখ হাসিনা সরকার বৈশ্বিক ব্যবসায় প্রতিযোগিতা সূচকে বাংলাদেশকে যে নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে তাতে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যবসাবাণিজ্যে। এমন দাবি করে দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, করনীতির জটিলতা, সরকারের অস্থিতিশীলতাসহ ১৭টি বড় বড় বাধা চিহ্নিত করেছে সিপিডি। সংস্থাটি জরিপের তথ্য তুলে ধরে জানায়, আগামী ২ বছর দেশকে সবচেয়ে বেশি ভোগাবে মূল্যস্ফীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বায়ু-পানি-মাটিদূষণ, আর্থিক মন্দা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, জ্বালানি সংকটসহ ৩২টি সমস্যা।
প্রবন্ধ তৈরিতে দেশের সেবা, কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও নন-ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের এক দশকের বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত নেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার মানদণ্ডে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা ও ভারতের চেয়ে পিছিয়ে। অর্থনীতির তুলনায় ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ১৭টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, নীতির অস্থিতিশীলতা, দুর্বল শ্রমশক্তি, উচ্চ করহার, উদ্ভাবনের জন্য অপর্যাপ্ত ক্ষমতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঝুঁকিপূর্ণ জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমনীতির সীমাবদ্ধতা।
তবে দুর্নীতিকে মূল সমস্যা জানিয়ে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা মনে করি, দুর্নীতি সর্বদাই প্রধান সমস্যা। যদিও অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর সমস্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। বছরের পর বছর অদক্ষ আমলাতন্ত্র একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। মুদ্রাস্ফীতি সব সময় বড় চিন্তার কারণ। অন্যদিকে নীতির অস্থিতিশীলতা একটি মাঝারি স্তরের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
সংলাপে আরো বলা হয়, সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, দুর্নীতি, প্রবৃদ্ধির হিসাবে গরমিলের কারণে অর্থনীতিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতির বড় অনিশ্চয়তা এখন উৎপাদন খাতে। নানা রকম উদ্যোগের পরও সবচেয়ে বড় রপ্তানি শিল্প পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যবস্থা এখনো ভঙ্গুর রয়ে গেছে। বিভিন্ন খাতের সমস্যা ও সংস্থার প্রসঙ্গে বলা হয়, এনবিআর বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, যার মধ্যে রয়েছে পরিচালনা, সাংগঠনিক এবং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। এসব সীমাবদ্ধতার ফলে ট্যাক্স জালিয়াতি কমানোর চেষ্টা চলছে। বর্তমান ভ্যাট ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং মূল ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াগুলো প্রধানত ম্যানুয়াল। এখানে স্বচ্ছতার জন্য আধুনিকীকরণের প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে। এছাড়া শিক্ষায় মাথাপিছু ব্যয় কম। এখানে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত বিষয়গুলো প্রাথমিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা ও সব শিক্ষার্থীর জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কর্মক্ষমতা পর্যালোচনার প্রস্তাব করা হয়।
আলোচনায় উঠে আসে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার শঙ্কাও। দুর্নীতি ও ঘুষ চক্র থেকে মুক্তি পেতে এনবিআরের প্রতিটি বিভাগের জন্য বিশেষ পলিসি নিয়ে কাজ করার তাগিদ দেন ব্যবসায়ীরা। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি জাভেদ আখতার বলেন, মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁঁকি মোকাবিলা করতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। বাণিজ্য বাড়াতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
আর বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দুর্নীতি ও ঘুষচক্র থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে হবে। ডিজিটাল করাসহ এনবিআরের শুল্ক, ভ্যাটসহ সব বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক পলিসি নিতে পারলে দুর্নীতি অর্ধেক কমে আসবে।
এছাড়া ব্যাংকিং খাত সংস্কারে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেন বক্তারা। আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে সব সমস্যার মূল হিসেবে দাবি করে রাজনীতির সংস্কারের তাগিদ দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংস্কার চাওয়া ভুল।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের লক্ষ্য থেকে সরকার সরে আসছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যা ৫ অথবা ১০টি হবে।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রয়োজনে বিজনেস রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশন গঠন করা হবে। সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত স্বার্থের কোনো দ্ব›দ্ব নেই। আমরা সরকারের কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছি। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’
