×

খবর

সারাজীবন একই সুতোয় বাঁধা দুই বন্ধু, অন্তিমযাত্রাও হলো একসঙ্গে

Icon

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রীতম দাশ, চট্টগ্রাম অফিস : ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে চলাফেরা দুই বন্ধু মো. শাহেদ ও মো. ইকবালের। গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার মির্জাখীল কুতুবপাড়া থেকে দুই বন্ধুই চলে আসেন শহরে। শাহেদ চাকরি নেন রিয়াজউদ্দিন বাজারের আজওয়ার টেলিকমে। ইকবালের চাকরি শহরের অন্য জায়গায়। একসঙ্গে আড্ডা ছাড়া দুই বন্ধুর সময়ই কাটত না। শুক্রবার মার্কেট বন্ধ হওয়ার বৃহস্পতিবার রাতেই দুই বন্ধুর দেখা হয়। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রিয়াজউদ্দিন বাজারে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে লাগা আগুনের ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে দুই বন্ধুর মৃত্যুও হলো একসঙ্গে। সারাজীবন একই সুতোয় বাঁধা ছিল শাহেদ ও ইকবাল- এই দুই বন্ধুর জীবন। অন্তিম যাত্রাও হলো একই সঙ্গে।

দুই বন্ধু শাহেদ ও ইকবালের নিথর দেহ রাখা ছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশেই লাশঘরে পাশাপাশি দুটি আসনে। আগুনে শাহেদ ও ইকবালের মৃত্যুর খবরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন স্বজনরা। তারা জানান, শাহেদ ও ইকবাল-দুই বন্ধুই কাছাকাছি বয়সের। শাহেদ ১৮ বছরের, আর ইকবালের বয়স ১৭। সাতকানিয়ার মির্জাখীল এলাকার বাসিন্দা এই দুই বন্ধু ছোটকাল থেকেই বেড়ে ওঠেন একসঙ্গে। পরে চট্টগ্রাম শহরে এসে দুটি দোকানে চাকরি নেন দুই বন্ধু। পুরো সপ্তাহ নিজ নিজ কর্মস্থলে দুজন ব্যস্ত থাকলেও কখন একসঙ্গে হবেন সেজন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন তারা। তাই তো বৃহস্পতিবার রাত এলেই শাহেদের বাসায় ছুঁটে আসতেন ইকবাল। গল্প-আড্ডা-মোবাইল ফোনে গেমস খেলতে খেলতেই কখন যে দুই বন্ধুর রাত শেষ হয়ে যেত নিজেরাই জানতেন না। বন্ধু শাহেদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর শুক্রবার বিদায় নিয়ে ইকবাল ফিরতেন নিজের বাসায়। এবার আর তারা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারেননি। তারই আগে জীবন থেকেই চিরবিদায় নিলেন দুজন।

সাতকানিয়ার বাংলাবাজার মির্জাখীলের কুতুবপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন শাহেদ ও ইকবাল। ছেলেকে হারিয়ে কথা বলার অবস্থায় নেই শাহেদের শোকস্তদ্ধ বাবা বেঠা মিয়া। তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন পুরোটা সময়। ভাগ্নে শাহেদের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মামা মোহাম্মদ সোলায়মান। তিনি বলেন, ছোটকালে কোলেপিঠে করে ওকে বড় করেছি। তাকে আবার পিঠে নিয়ে কবরস্থানে নিতে হবে ভাবিনি কোনোদিন। ভাগ্নে শাহেদের বন্ধু ইকবালের জন্যও আহাজারি করতে করতে সোলায়মান বলেন, শাহেদ আর ইকবাল ছোটবেলা থেকেই বন্ধু। এক বিছানায় ঘুমানো, এক প্লেটে খাবার খাওয়ার মতো বন্ধু ছিল দুজন। ইকবাল আমার ভাগ্নের বাসায় এসেছিল বেড়াতে। বেড়াতে এসে তাকেও মর্মান্তিকভাবে মারা যেতে হলো। কাকে আর দোষ দেব।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রিয়াজউদ্দিন বাজারে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে মোহাম্মদীয়া মার্কেট। এ সময় কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে শাহেদ ফোন করেন দোকানের মালিক সাজ্জাদ মিয়াকে। তখন সময় রাত পৌনে ২টা। ফোন পেয়েই দোকান মালিক শাহেদকে নির্দেশনা দেন সে যেন সিঁড়ি বেয়ে ছাদের উপরে চলে যায়। কিন্তু ধোঁয়ায় চোখ-মুখ বন্ধ হয়ে যায় শাহেদের। সবদিকে অন্ধকার। পরে আবারও ফোন দেন শাহেদ। তখন সাজ্জাদ পরামর্শ দেন, চোখে-মুখে কাপড় মুড়িয়ে হলেও যেন ছাদে দৌড়ে চলে যায়। কিন্তু নিরুপায় শাহেদ। নিজেকে বাঁচাতে হামাগুড়ি দিয়ে খুঁজে নেন টয়লেট। সেখান থেকে মালিককে ফোন দিয়ে জানান, ‘আমি টয়লেটে। আমার জন্য দোয়া করবেন’। কালেমা পড়তে পড়তে মোবাইল ফোনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন শাহেদ।

নিহত শাহেদের ভাই আল আমিন বলেন, আমার ভাইটা (মো. শাহেদ) ৫ তলার একটা দোকানে কাজ করত। সে আগুন দেখে নিচে আসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ধোঁয়ার কারণে নামতে পারেনি। বাঁচার জন্য একটা টয়লেটে ঢুকে। শেষ পর্যন্ত সেখানেই দম বন্ধ হয়ে সে মারা গেছে।

মো. শাহেদ রিয়াজউদ্দিন বাজারের রেজওয়ান কমপ্লেক্সের আজওয়ার টেলিকম নামের একটি মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকানে চাকরি করতেন। আগুনে বেশকিছু দোকান পুড়ে ছাই হলেও অক্ষত আছে শাহেদ যে দোকানে চাকরি করতেন সেটি। আজওয়ার টেলিকম নামের সেই দোকানের মালিক সাজ্জাদ মিয়া বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) একসঙ্গে দোকানে বসে দুজন ক্রেতা সামলালাম। রাতে ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি গেলাম। শেষ রাতে এসে দেখি শাহেদ নাই হয়ে গেল। আরো খারাপ লাগছে ওর সঙ্গে সময় কাটাতে এসে মারা যাওয়া বন্ধু ইকবালের জন্য। তিনি বলেন, শাহেদ ও ইকবাল ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক বন্ধুর জন্য আরেক বন্ধুর টান কতটা সেটা আমি অনুভব করতাম। ব্যবসার ফাঁকে সুযোগ পেলেই ইকবালের সঙ্গে ফোনে কথা বলত শাহেদ। আমি বৃহস্পতিবার বাড়িতে গেলে বাসা ফাঁকা থাকত। তাই ইকবালকে নিয়ে আসত শাহেদ। আগুন লাগার সময় দুই বন্ধু বাসাতেই ছিল। মৃত্যুও হলো একসঙ্গে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App