×

খবর

অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপড়েনে নেতানিয়াহু

Icon

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ ডেস্ক : অস্ত্র সরবরাহ সংক্রান্ত একটি মন্তব্যকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সঙ্গে নতুন টানাপড়েনে জড়িয়ে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গত ৭৭ বছর ধরে যে মাত্রার কূটনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ দুই দেশ, তাতে এই টানাপড়েনকে বিরল বলছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। এদিকে ইসরায়েলের বিরোধিতার মুখেও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে আর্মেনিয়া। গতকাল শুক্রবার আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে একথা জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের টানাপড়েনের শুরু চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর একটি বক্তব্যকে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একটি ভিডিওচিত্রে নেতানিয়াহুকে বলতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রশাসন তার দেশের জন্য পাঠানো অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আটকে রেখেছে।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র জন কিরবি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গে সংবাদিকদের বলেন, তার এমন কথাবার্তা আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক এবং বিরক্তিকর। হামাস এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অন্য শত্রæদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য (ইসরায়েলকে) আমরা যে পরিমাণ সামিরক ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছি এবং এখনো করছি, অন্য কোনো দেশ এমনটা করেনি। আগের দিন বুধবার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারিন জেন পিয়েরে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, হ্যাঁ, অস্ত্র-গোলাবারুদের একটি বিশেষ চালানে স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে, কিন্তু ওই চালানটি ব্যতীত অন্য কোনো চালানে তো বাধা দেয়া হয়নি। আমরা সত্যিই বুঝতে পারছি না, তিনি আসলে কী বলতে চাইছেন।

প্রসঙ্গত, গত মে মাসের শুরুর দিকে গাজা উপত্যকার রাফায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলীয় এই শহরটিতে লাখ লাখ বেসামরিক ফিলিস্তিনি আশ্রয় নেয়ার কারণে ইসরায়েলি বাহিনীর এই অভিযানে ঘোরতর আপত্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের। তার সেই আপত্তি উপেক্ষা করেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) রাফায় অভিযানের নির্দেশ দেন নেতানিয়াহু।

এদিকে নেতানিয়াহু এই নির্দেশ দেয়ার পর ইসরায়েলের জন্য বরাদ্দ একটি মার্কিন সামরিক চালানে স্থগিতাদেশ দেন জো বাইডেন। এটি ছিল ২ হাজার পাউন্ডের বোমার চালান। রাফায় অভিযানের সময় ব্যবহারের জন্য এসব বোমা ওয়াশিংটনের কাছে চেয়েছিল ইসরায়েল।

তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে ক্যাথেরিন জেন পিয়েরে ও জন কিরবির সমালোচনায় দমে যাননি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার কিরবির বক্তব্যের কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগত আক্রমণ মেনে নিতে রাজি আছি, কিন্তু তারপরও চাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে গোলাবারুদের চালান অব্যাহত থাকুক। কারণ ইসরায়েলের অস্তিত্বরক্ষার জন্য এই গোলাবারুদ জরুরি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল। সেই প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। গত ৭৭ বছর ধরে ইসরায়েলকে নিয়মিত আর্থিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের সীমান্ত ও ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালায় গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সেই হামলায় নিহত হন প্রায় ১২০০ জন। এর পাশাপাশি প্রায় আড়াইশ জনকে ধরে নিয়ে গাজায় জিম্মি করা হয়। এই হামলার জবাবে ওইদিন থেকেই গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী, যা এখনো চলছে। ইসরায়েলি বাহিনীর গত ৮ মাসের অভিযানে এ পর্যন্ত গাজায় নিহত হয়েছেন ৩৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি। নিহতদের শতকরা ৫৬ ভাগই নারী ও শিশু।

এই অভিযানের শুরু থেকেই ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের কর্মকর্তারা গত ৮ মাসে বার বার গাজায় বেসামরিক হত্যা কমানোর জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে প্রতিবারই কোনো না কোনো অজুহাতে সেই আহ্বান এড়িয়ে গেছেন নেতানিয়াহু। এই নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদও হয়েছে। সেই বাদানুবাদই এখন রূপ নিয়েছে টানাপড়েনে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল আর্মেনিয়া : ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে আর্মেনিয়া। ইসরায়েলের বিরোধিতার মুখেও আর্মেনিয়া সর্বসাম্প্রতিক দেশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল।

আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার লড়াইয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান সংবলিত জাতিসংঘ প্রস্তাবনাকে সমর্থন করে আর্মেনিয়া। একই সঙ্গে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকেও সমর্থন করে দেশটি। এই স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে আর্মেনিয়া ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তাদের বৈধতাকে সমর্থন দিল। স্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল রাজধানী তেল আবিবে নিযুক্ত আর্মেনীয় রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এক বিবৃতিতে আর্মেনিয়ার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং একে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি বড় অর্জন বলে অভিহিত করেছেন।

এর আগে গত ২৮ মে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় ইউরোপের তিন দেশ- স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড। স¤প্রতি কয়েক মাসে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং ইইউ সদস্যদেশ মাল্টা ও স্লোভেনিয়াও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে।

হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর পরামর্শ ব্লিঙ্কেনের : লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে ইসরায়েলকে পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তিনি এ পরামর্শ দেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জাচি হানেগবি ও কৌশলগত বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রী রন ডারমারের সঙ্গে এ বৈঠক করেন ব্লিঙ্কেন। চলমান গাজা যুদ্ধের মধ্যে ইরানপন্থি হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাত যেন আর না বাড়ে, তা ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে তুলে ধরেন। ইসরায়েল লেবাননে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে জবাবে ‘সর্বাত্মক’ হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হিজবুল্লাহপ্রধান হাসান নাসরাল্লাহ। গত বুধবার টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে বলেন, লেবাননে ইসরায়েল হামলা চালালে কোনো নিয়মনীতি মানবে না হিজবুল্লাহ। কোনো ধরনের সংযমও দেখাবে না তারা।

হিজবুল্লাহপ্রধানের এ হুমকির পরই ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্লিঙ্কেনের বৈঠকটি হলো। এর আগে গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের সেনাবাহিনী ঘোষণা দিয়েছিল, তারা লেবাননে সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১ বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার : ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভকালে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেপ্তার হওয়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর নামে করা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ম্যানহাটান ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় ৩১ শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ তুলে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল অবৈধভাবে দখলে নিয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধের অভিযোগ আনা হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দানা বাঁধে। এরপর ধীরে ধীরে তা পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। ওই মাসের শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যামিল্টন হল দখল করেন বিক্ষোভকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের হল ও ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেয়। এরপরও বিক্ষোভকারীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ না করায় হ্যামিল্টন হলের ভেতর পুলিশকে অভিযান চালানোর অনুমতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

গত ৩০ এপ্রিল পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৪৬ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে। গত বৃহস্পতিবার তাদের ৩১ জনের বিরুদ্ধে আনা সব ধরনের অভিযোগ তুলে নেয়া হয়। গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের কেউই আগে কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে জানিয়েছে ম্যানহাটান ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানানো হয়েছে। যদিও এসব শিক্ষার্থীর সবাইকেই নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অব্যাহতি ও বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App