×

খবর

এভারেস্টজয়ী বাবর আলী

এভারেস্ট অভিযানে চ্যালেঞ্জ স্পন্সর জোগাড় করা

Icon

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম অফিস : বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘লোৎসে’ জয়ী ডা. বাবর আলী মনে করেন, এভারেস্ট জয় করার চেয়েও কঠিন বিষয় হলো স্পন্সর জোগার করা। তিনি বলেন, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের অনেক তরুণ এভারেস্ট জয় করতে পারবে।

এভারেস্ট ও লোৎসে জয় করে সদ্য দেশে ফিরেছেন চট্টগ্রামের সন্তান ডা. বাবর আলী। চট্টগ্রামের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এভারেস্ট এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লোৎসে জয় করেন বাবর। বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার একই অভিযানে হিমালয়ের দুটি আট হাজার মিটার উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে তার। এবার ওই দুঃসাহসী অভিযানের গল্পই শোনালেন চট্টগ্রামের হালদা পাড়ের সন্তান বাবর আলী। গতকাল বুধবার নগরের ‘আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রাম’ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সাংবাদ সম্মেলন ও পতাকা-প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি হিমালয় অভিযানের গল্প শোনান। পর্বত আরোহণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পৃষ্ঠপোষকতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এভারেস্ট জয় করার চেয়ে কঠিন এর জন্য তহবিল জোগার করা। পৃষ্ঠপোষক পাওয়া। আমি এবার স্পন্সরের কাছে গেছি। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি মনে করি, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের অনেক তরুণ এভারেস্ট জয় করতে পারবে।’

বাবর জানান, গত ১৯ মে এভারেস্ট এবং ২১ মে চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ লোৎসে আরোহণ করে উড়িয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা। এভারেস্টের শীর্ষে তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো অবস্থান করেন। সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন, এভারেস্ট জয়ের পর নেমে আসার সময় এক আহত পর্বতারোহীর জন্য সৃষ্ট মানবজটে পড়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে ছিলাম। ওই উন্মুক্ত এলাকায় শুরু হয় তুষারঝড়। ঝড়ের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা লড়াই করতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে বড় কোনো দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যাই।’ ক্যাম্প-৪ এবং এর উপরের এলাকায় পর্বতারোহীরা অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করলেও বাবর আলী চেষ্টা করেছেন অভিযানে যতটা সম্ভব কম কৃত্রিম অক্সিজেন নিতে। কারণ তিনি স্বপ্ন দেখেন, আগামীতে অক্সিজেন সহায়তা ছাড়াই পর্বতে আরোহণ করবেন। এভারেস্ট এবং লোৎসে শিখর হতে দেখা নিচের পৃথিবীর দৃশ্য এই জীবদ্দশায় ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় বলে জানান বাবর আলী। শিখর থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে নেমে আসেন বাবর। বেস ক্যাম্প থেকে কাঠমান্ডু ফিরেন মাত্র ৩ দিনে। বাবর আলী বলেন, ১৯২৪ সালে জর্জ মেলোরির মহাকাব্যিক অভিযান ছিল এভারেস্ট। একশ বছর পর আমি এভারেস্ট আরোহণ করতে পেরেছি। এভারেস্ট ও লোৎসে জয়ের মধ্যে লোৎসে অভিযান চ্যালেঞ্জের ছিল জানিয়ে বাবর আলী বলেন, ‘এভারেস্টের উচ্চতা বেশি হলেও লোৎসে আরোহণ তুলনামূলকভাবে কঠিন। এভারেস্ট ও লোৎসের মধ্যে আমি লোৎসেকে এগিয়ে রাখব। এটা এমন নয় যে আমি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লোৎসে দাঁড়িয়েছি, সেজন্য নয়। আমি যেহেতু ক্লাইম্ব করতে পছন্দ করি, আমাকে লোৎসের ক্লাইম্বটা বেশি আনন্দ দিয়েছে। কারণ এটার চ্যালেঞ্জটা বেশি ছিল। লোৎসেতে আমার কুলোয়া (পর্বত আরোহণের একটি পদ্ধতি) ধরে ক্লাইম্ব করার সুযোগ হয়েছে।’

বাবর আলী বলেন, লোকে বলে হিমালয় কেন যায়? এভারেস্টে যাওয়া যে শুধু মাত্র অ্যাথলেটিক পারফরমেন্স তা নয়, যদি দেখার চোখ থাকে অনেক কিছু দেখার আছে। আড়াই হাজার মিটার উচ্চতায় যে লম্বা গাছ আছে, সে একই জুনিপার গাছ চার হাজার মিটারে গিয়ে ঝোপ হয়ে যাচ্ছে। যাতে গাছটি তাপমাত্রা কম হারায়, তাই সে নিজের আয়তন ছোট রাখছে। কিন্তু শেকড়টা অনেক বড়। হিমালয়ে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, কেউ যদি গেøাবাল ওয়ার্মিং সম্পর্কে বুঝতে চায়, তার জন্য সবচেয়ে সেরা জায়গা হিমালয়। আমি যাওয়ার সময় যেসব এলাকা বরফে ঢাকা দেখেছি, আসার সময় দেখলাম সেখানে বরফ গলে অনেকগুলো লেকের সৃষ্টি হয়েছে। তুষারপাত কমে যাওয়ায় অনেকগুলো গ্রাম হিমালয়ের আরও উপরে উঠে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ তাদের সবকিছু তুষারপাতের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে সিকিমের বন্যার কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। মূলত হিমালয়ের পাদদেশে থাকা গøাসিয়াল লেক উপচে পরে এই বন্য হয়েছিল। এ সবই গেøাবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সুস্থ শরীরে ফিরে এসেছি এটা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। এ সময় ওজন কমেছে চার কেজি। এভারেস্টে অনেক মরদেহ দেখেছি। কিন্তু আমি মনোবল হারাইনি। অনেকেরই ইক্যুইপমেন্ট নতুন, তারা মারা গেছেন বেশিদিন হয়নি। এভারেস্ট সামিট করার ক্ষেত্রে আবহাওয়া বড় ফ্যাক্টর। বাংলাদেশের একজন আবহাওয়াবিদ আমাকে দারুণ সহযোগিতা করেছেন। সফলতার পিছনে এই পর্বতারোহী কৃতিত্ব দেন নিজের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমকে। এছাড়া তিনি কৃতজ্ঞতা জানান নিজের ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’, সব পৃষ্ঠপোষক সংগঠন এবং ক্রাউড ফান্ডিংয়ে অংশ নেয়া শুভাকাক্সক্ষীদের। শিগগির চাকরিতে যোগ দেবেন জানিয়ে বলেন, চিকিৎসাবিদ্যা ছাড়া কোনো আর্ট জানি না। তাই চাকরি নিতে হবে। সঞ্চয় দিয়ে পর্বতারোহণের নেশা পূরণ করতাম।

এই অভিযানের প্রধান সমন্বয়ক ফরহান জামান অভিযানের পিছনের গল্প সাংবাদিকদের তুলে ধরে বলেন, ‘পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা পেলে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে বাংলাদেশের পর্বতারোহীরা আরও অনেক দুর্দান্ত কীর্তি বয়ে আনতে পারবে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সভাপতি দেবাশীষ বল, প্রধান উপদেষ্টা শিহাব উদ্দিন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এন ফয়সাল। গত মঙ্গলবার রাতে দেশে ফিরেই আজ সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে ডা. বাবর আলীকে বহনকারী বিমান। এরপরই শোভাযাত্রা সহকারে তাকে হাটহাজারীর নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এভারেস্ট ও লোৎসে পর্বতশৃঙ্গে আরোহণের জন্য বাংলাদেশ থেকে বাবর আলী নেপালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন গত ১ এপ্রিল। ১৯ মে ভোরে ২৯ হাজার ৩১ ফুট উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষে ওড়ান বাংলাদেশের পতাকা। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণের দুইদিন পর লোৎসে পর্বতের শীর্ষে (৮ হাজার ৫১৬ মিটার) ওঠেন ৩৩ বছর বয়সি বাবর আলী।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App