×

খবর

বেশি দুর্ঘটনায় বেশি প্রাণহানি

সড়কে বেপরোয়া চলছে নিয়ন্ত্রণহীন মোটরবাইক

Icon

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কে বেপরোয়া চলছে নিয়ন্ত্রণহীন মোটরবাইক

দেব দুলাল মিত্র : সড়ক-মহাসড়কে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের। বেপরোয়া গতিতে সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেঁধে দেয়া হলেও সেদিকে মোটরসাইকেল চালকদের কোনো খেয়ালই নেই। সড়কে মোটরসাইকেল চালকরা সবচেয়ে বেশি আইন অমান্য করছে। ফলে একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা। সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৭ থেকে ৪৯ শতাংশ- মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেক। নিহতের হার ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।

মোটরসাইকেল চালকরা বলছেন, রিকশার পেছনে চলার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করে মোটরসাইকেল কিনিনি। ৩৫০ সিসির মোটরসাইকেল আমদানি করা হচ্ছে, আর গতি নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সরজমিন দেখা গেছে, সিটি করপোরেশন এলাকার সড়ক, জেলা সড়ক ও মহাসড়কে মোটরসাইকেল সবচেয়ে বেপরোয়া যান। মোটরসাইকেল চালকরা লাইন, লেন, ট্রাফিক সিগন্যাল, ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা কিছুই মানছেন না। হাইওয়েতেও বেপরোয়াভাবে চলছে মোটরসাইকেল। সুযোগ পেলেই তারা ফুটপাত দিয়ে চলাচল করায় সাধারণ পথচারীরাও বিড়ম্বনায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও সাধারণ পথচারীদের অভিযোগের শেষ নেই।

মোটরসাইকেল চালকদের বেপরোয়া আচরণের কারণে সম্প্রতি সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সড়কে চলাচলরত সব যানবাহনের গতি নির্ধারণ করেছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় মোটরসাইকেলের গতি ৩০ কিলোমিটার বেঁধে দেয়া হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও মোটরসাইকেল চালকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করে গতিসীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

দেশে এখন মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। এক দিকে সরকার শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে মোটরসাইকেল কারখানা স্থাপনে উৎসাহ দিয়েছে। এতে মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতির (২০১৮) আওতায় সরকারের কর ছাড় সুবিধা পেয়ে ৭টি কারখানা স্থাপিত হয়েছে। অন্যদিকে আবার বিদেশ থেকেও বিপুল পরিমাণ মোটরসাইকেল আমদানি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে মোটরসাইকেলের দামও নাগালের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে তরুণদের হাতে সহজেই মোটরসাইকেল উঠেছে। এছাড়া ২০১৬ সালে ঢাকাসহ বড় শহরে রাইড শেয়ারিং শুরুর অনুমতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাড়াগায়ের বেকার যুবকরাও ব্যাংক ঋণ নিয়ে মোটরসাইকেল কিনে রাস্তায় নেমে পড়েছে। এরপর থেকে ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।

রাজধানী ও জেলা শহরগুলোতে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল চলাচল করলেও গ্রামগঞ্জে অনিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যাই বেশি। ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) এক গবেষণা চালায়। বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের ওপর সড়ক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশ শীর্ষে। প্রতি বছর দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরসাইকেলের বিপরীতে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন ২৮ দশমিক ৪ জন। তাদের প্রায় ৪০ শতাংশেরই বয়স ২৪ থেকে ৩০ বছর। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর এই হার সারা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সড়ক ও পরিবহন নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে গত এপ্রিল মাসেও যথারীতি দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৭ শতাংশ। ৩১৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৫৯ জন- যা ওই মাসের দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, যানবাহনের অতিরিক্ত গতি দুর্ঘটনার মূল কারণ। মোটরসাইকেল এখন সড়কে গতির দানবে পরিণত হয়েছে। ২০০, ২৫০ থেকে ৩৫০ সিসির মোটরবাইক এখন হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে। এসব মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে চালকদের কোনো খেয়াল নেই। গতি নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক আইন মেনে মোটরসাইকেল চালালে কোনো ক্ষতি হতো না। কিন্তু এ ব্যাপারে কারো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এক মোটরসাইকেলে তিনজনকে চলতে দেখা যাচ্ছে, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এপ্রিল মাসের ঈদযাত্রায় বরাবরের মতো দুর্ঘটনার শীর্ষে ছিল মোটরবাইক। এই সময় ১৯৮টি মোটরবাইক দুর্ঘটনায় ১৬৫ জন নিহত ও ২৪০ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার এই হার ওই সময়ের মোট দুর্ঘটনার ৪৯ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং মোট নিহতের সংখ্যার ৪০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এখন দেশে মোটরসাইকেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। দেশের মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেলের কারণে ঘটছে। সড়কে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের মধ্যে প্রথমে রয়েছে মোটরসাইকেল।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জানান, বেপরোয়া ড্রাইভিং ও অতি গতির কারণেই সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের হার দিন দিন বেড়েই চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনার এই হার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে। বেশি গতি সড়কে মৃত্যু ডেকে আনছে। এজন্যই মোটরসাইকেলের গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। সবাই শৃঙ্খলা মানলে গতিসীমা আমরা আবার বাড়িয়ে দেব।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App