×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

শেষের পাতা

‘হানিট্র্যাপে’ পা বাড়িয়ে সর্বশান্ত শত শত মানুষ

Icon

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘হানিট্র্যাপে’ পা বাড়িয়ে  সর্বশান্ত শত শত মানুষ

কামরুজ্জামান খান : তৈরি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম সাভার পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনির বাসা থেকে ধামরাই ঢুলিভিটায় ¯েœাটেক্স কারখানার উদ্দেশে বের হন গত ৯ জুন সকালে। এর একঘণ্টা পর থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ পান স্বজনরা। বিকালের দিকে তিনি তার বোন বেবীকে মোবাইল ফোনে কল করে জানান, বিপদে পড়েছেন, টাকা পাঠাতে হবে। বিকাশে দুই দফায় ৭০ হাজার টাকা পাঠানোর পরও তার খোঁজ মিলছিল না। সন্ধ্যার পর স্বজনরা থানায় যোগাযোগ করেন। এর কিছুক্ষণ পর রবিউল বাসায় ফিরেন। তিনি জানান, মোবাইল ফোনে এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয়ে পর ম্যাসেঞ্জারে চেটিং শুরু করেন। সখ্যতার কয়েকদিন পর তাকে ডিইপিজেডের পাশে শ্রীপুর এলাকার একটি বাসায় ডেকে নেয় ওই তরুণী। সেখানে একটি কক্ষে নিয়ে আপত্তির অবস্থার পরিবেশ তৈরি করে ছবি তেলে ভিডিও করা হয় গোপনে। তারপর দাবি করা হয় লাখ দুই টাকা। বিকাশে দুই দফায় ৭০ টাকার ব্যবস্থা করেন রবিউল। এরপর আরো টাকার জন্য চলে নির্যাতন। শেষ পর্যন্তÍ আরো ৩০ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পান তিনি। ভয় দেখিয়ে তাকে বলে দেয়া হয়েছে ঘটনা জানাজানি করলে বড় বিপদ হবে। এভাবে হানিট্রাপে- পা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন শত শত মানুষ। তরুণী-যুবতীদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন অনেকে। ঝিনাইদহের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে সেলেস্টি নামে এক তরুণীকে দিয়ে ট্র্যাপে ফেলে কলকাতায় নিয়ে নৃশংস কায়দায় খুন করার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘হানিট্র্যাপ’। থানা পুলিশ, ডিবি ও র‌্যাবের কাছে এমন অভিযোগ যায় নিয়মিত।

এ প্রসঙ্গে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, হানিট্র্যাপ অতীতেও ছিল, এটি নতুন কোনো অপরাধ নয়। যুগে যুগে নারী লেলিয়ে দিয়ে এ ধরনের ফাঁদ পাতা হয়েছে নানা স্বার্থে। আবার পথভ্রষ্ট এক শ্রেণির নারী সহিংসতামূলক ও অসহিংসতামূলক উপায়ে এই অপরাধ করে গেছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই অপরাধটি প্রকাশ্যে আসছে বেশি। মূলত প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই এই অপরাধের শিকার হচ্ছেন বেশি; যারা এই চক্রকে টাকা দিয়ে নিজেদের সম্মান রক্ষা করছে। আবার এ ধরনের ফাঁদ পেতে অনেককে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এক প্রশ্নের জবাবে ড. তৌহিদুল হক বলেন, চাহিদা না থাকলে এই অপরাধ বাড়ার কথা নয়। বর্তমানে অনেকের মধ্যেই নৈতিকতা বোধ, সামাজিক ও সংস্কৃতিক মূল্যবোধ কমে যাওয়ায় হানিট্রাপের ফাঁদে

পড়ছে। এই অপরাধ কমাতে পথভ্রষ্ট নারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

সিআইডির সাইবার ইন্টিলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্টের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মুহাম্মদ রেজাউল মাসুদ বলেন, হানিট্র্যাপের অনেক অভিযোগই আমাদের কাছে আসে। অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থাও নিয়ে থাকি। তিনি বলেন, আসলে এটি একটি ওয়ান টু ওয়ান প্রতারণার ফাঁদ। এখানে ভুক্তভোগী আর প্রতারক থাকে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আসলে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তবে কেউ যদি ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন আমাদের সিআইডির সাইবার ইউনিটের কাছে অভিযোগ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিটের (উত্তর) উপকমিশনার মো. তারেক আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র হানিট্র্যাপের ফাঁদ পাতছে। বিশেষ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা যাবে এমন লোকজনকে টার্গেট করা হচ্ছে। প্রতারণার শিকার বেশির ভাগ মানুষ নিজের সম্মানের কথা ভেবে মামলা করতে চান না। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে অবশ্যই মামলা করবেন। আর ফাঁদে পা দেয়া থেকে সচেতন থাকবেন। ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত কোনো নারী সখ্যতা গড়ার চেষ্টা করলে সাড়া দেবেন না।

জানা গেছে, চক্রটি টার্গেট ব্যক্তির ফেসবুকের অনেককে ফ্রেন্ড তালিকায় যুক্ত করে। মিষ্টি কথা ও সুন্দর চেহারার আড়ালে প্রেমের ফাঁদ পেতে সুযোগ বুঝে নগ্ন ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করাই তাদের মূল পেশা। এই অপরাধীদের চক্রে কেউ সাজে পুলিশ, কেউ সাংবাদিক। লোক লজ্জার ভয়ে প্রায়ই ঘটনা এড়িয়ে যান ভুক্তভোগীরা। অনেক ক্ষেত্রে টার্গেট ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেও যুক্ত হন তারা। ওই ব্যক্তির অফিস, বাসা সব ঠিকানা সংগ্রহ করে। পরে দাবি করা টাকা না পেলে এসব ছবি-ভিডিও স্বজনদের কাছে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখায়। তাদের ফাঁদে পড়ে অনেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন; কিন্তু ফাঁদ থেকে মুক্তি মেলেনি। চক্রের সদস্যরা দেশের বাইরে অবস্থান করে হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতারক তরুণীরা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন জনিয়ে নানাভাবে প্রলোভন দেখায়। বন্ধুত্বের এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভিডিও কলে খোলামেলা ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতা ও ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করেন তারা। পরে ফোনের স্ক্রিন রেকর্ডারে রেকর্ড করে টাকা দাবি করেন ওই তরুণীরা। টাকা দাবির বিষয়টিও কৌশলে করছেন। কখনো মা অসুস্থ আবার কখনো নিজেই অসুস্থ- এমন কথা বলে টাকা ধার নেন।

চলতি বছরের মে মাসে কুমিল্লায় ডিবি পুলিশের জালে ধরা পড়েন তাসনুবা আকতার (২৩)। জীবনের রঙিন সময়কে কাজে না লাগিয়ে বেছে নিয়েছেন প্রতারণার পথ। রূপকে কাজে লাগিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণ থেকে বৃদ্ধ সব শ্রেণির লোকের সর্বস্ব লুটে নিয়েছেন তিনি। প্রেমের একপর্যায়ে ভুক্তভোগীকে নির্দষ্টি স্থানে নিয়ে গোপন ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও ধারণ করেন তাসনুবা। পরবর্তী সময়ে এই ভিডিও দিয়ে তার সঙ্গীরা কখনো ডিবি, কখনো সাংবাদিক পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং করে অর্থ আদায় করতেন। তার প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন লাকসাম উপজেলার বড় বিজরা গ্রামের জুয়েল (ছদ্মনাম)। তাসনুবা তার রূপের ঝলক দেখিয়ে দিয়ে জুয়েলের কাছ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পুলিশ তার চক্রের ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন- কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি থানার সুবর্ণপুর এলাকার সৈয়দ আয়াত উল্লাহ, বালুতুপা গ্রামের ইমরান হোসেন, একই এলাকার মো. কবির হোসেন, বরুড়া উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মো. মোজাম্মেল হক, গালিমপুর গ্রামের মো. আব্দুর রহিম, চান্দিনা উপজেলার কেশরা গ্রামের তাসনুবা আক্তার ও লাকসাম উপজেলার বড় বিজরা গ্রামের মো. সাখাওয়াত হোসেন।

প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে গত ২ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসে আশুলিয়ার জামগড়ায় রিয়া মনি নামে নারীর ব্লাকমেইলের শিকার হন যুবক সানাউল মাহমুদ। ঘরে আটকে রেখে অসামাজিক কাজের আখ্যা দিয়ে হাতিয়ে নেয়া হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। অভিযোগ পেয়ে এই চক্রের ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভুক্তভোগী সানাউল মাহমুদ বলেন, দশ দিন আগে ফেসবুকে একটি মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাইপাইলে ভাইয়ের কাছে গেলে তারপর তার সঙ্গে দেখা করি। দেখা হওয়ার পর তার বাসায় নিয়ে যায় আমাকে। বাসায় আটকে রেখে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে নগদ ৩৫ হাজার ৬০০ টাকা ও বিকাশ থেকে ২৯ হাজার ৩৫০ টাকা হাতিয়ে নেয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে পোশাক শ্রমিক এক তরুণকে একই কায়দায় আটকে রেখে টাকা হাতিয়ে নেয় অপর একটি চক্র। ভুক্তভোগীর স্বজন মো. জুলহাস বলেন, তারা অনেক ধরনের প্রতারণা করে। যেমন পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দেয়। নেশা যোগ্য জিনিস পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা বলে পুলিশকে জানাই- এ ধরনের প্রতারণা করে তারা।

বিত্তবানদের টার্গেট করে নারীদের দিয়ে অপহরণ ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মুক্তিপণ আদায় : গত ৮ মার্চ ঢাকায় অপহরণের ১০ দিন পর ভুক্তভোগীকে উদ্ধার এবং ৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর দুর্ধর্ষ চক্রের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত ৬ জুন রাজশাহী মহানগরীতে নারী দিয়ে ফাঁদ পেতে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে ৪ নারীসহ ১২ প্রতারককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শাহমখদুম থানার পবা নতুনপাড়া বনলতা আবাসিক এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- পপি আক্তার (৩৪), মো. সালাউদ্দিন (৪০), মো. কাউসার (২৫), মো. রহমত আলী (২১), মো. কাউসার (২৩), মো. রাতুল (২০), মো. আশিক হাসান (২৩), মো. মানিক (৩৯), মো. শাকিল আহম্মেদ (২৪), মোসা. সম্পা আক্তার (২০), মোসা. সুমি খাতুন (২৬) ও মোসা. প্রিয়াংকা খাতুন (২১)।

বরিশাল নগরীর বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী রতেœশ্বর মাঝি (৬৫) এমন ফাঁদে পা দিয়ে খুইয়েছেন ৭৮ লাখ টাকা। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হলে গত ৬ জুলাই শনিবার একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর বরিশালের কাশিপুর এলাকা থেকে প্রযুক্তির সহায়তায় ফারজানা রেজা নেলী নামে এক নারীকে আটক করা হয়। চালচলনে বোঝার উপায় নেই ওই নারীর প্রতারণার কৌশলচিত্র। ফারজানা রেজা নেলীর বিরুদ্ধে বরিশাল মেট্রোপলিটনের বিভিন্ন থানায় প্রতারণার দুটি মামলাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ফাঁদ পেতে টাকা আদায় করা তার নেশা। হানিট্রাপের ঘটনা এখন ঘটছে হরহামেশা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এমন অভিযোগ আসে প্রায়ই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App