×

শেষের পাতা

আত্মকলহ থামছেই না আওয়ামী লীগ তৃণমূলে

Icon

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 আত্মকলহ থামছেই না আওয়ামী লীগ তৃণমূলে

মুহাম্মদ রুহুল আমিন : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই অস্থিরতা বিরাজ করছে রাজশাহী জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগে। দলটির নেতারা বিভক্ত। তারা প্রতিনিয়তই জড়াচ্ছেন সংঘাত-সহিংসতায়। গত ২৬ জুন দুগ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণ গেছে বাঘা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলামের। এর আগে ২২ জুন দলের দুগ্রুপের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। পরদিন আশরাফুলের জানাজায় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়েব উদ্দীনকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেন। শাহরিয়ারের এই বক্তব্যের পর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা এখনো চলমান। একটি গ্রুপ শাহরিয়ার আলমের কুশপুত্তলিকা দাহ করে রাজশাহী শহরে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। মুক্তিযোদ্ধারা বক্তব্য প্রত্যাহার করে শাহরিয়ারকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। রাজশাহীর আইনজীবীদের একটি দল তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। এ পরিস্থিতি থামানো না গেলে যে কোনো সময় সেখানে আরো সহিংসতার ঘটনা তৈরি হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

শুধু রাজশাহী আওয়ামী লীগেই নয়, সারাদেশে দলের নেতাকর্মীরা একে অপরে নানাগ্রুপে বিভক্ত হয়ে সহিংসতা, দ্ব›দ্ব ও আত্মকলহে জড়াচ্ছেন। প্রতিনিয়ত ঘটছে আহত ও নিহতের ঘটনা। সেই সঙ্গে ঘটছে মামলা পাল্টা মামলার ঘটনা। গত ২৭ জুন বৃহস্পতিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য আব্দুস সালাম এবং আব্দুল মতিন নামে এক শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করে এক দল দুর্বৃত্ত। এ সময় আরো দুই ব্যক্তি আহত হন। ওইদিন রাতে শিবগঞ্জ উপজেলার রানীহাটি কলেজের সামনে এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, নিহত ও আহতরা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

একইদিন দুপুরে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক সুরুজ মিয়াকে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হন তার দুই ছেলেসহ আরো চারজন। জানা গেছে, এলাকায় ইট-বালু-সিমেন্টসহ ইমারত নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ

ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিতে বাধা দেয়ায় তাকে হত্যা করা হয়।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ- এই তিনটি হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। চাঁদাবাজি, বালুমহালের আধিপত্য ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের বিরোধে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে। এর সবগুলোই হয়েছে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ দ্ব›েদ্বর জেরে। এসব হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বিভাজন।

আওয়ামী লীগের তৃণমূলে এসব ঘটনা এখন প্রতিনিয়তই ঘটছে, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এমন হিংসাত্মক ঘটনা অনেক বেড়েছে। তৃণমূলের এসব কোন্দল থামাতে দফায় দফায় কেন্দ্রীয় নেতারা বৈঠক, হুঁশিয়ারি এমনকি সাংগঠনিকভাবে নানা পদক্ষেপ নেয়ার কঠোর ঘোষণা দিয়ে আসছেন। তাতে দ্ব›দ্ব-কলহ সাময়িক থামলেও তা সামাল দেয়া যাচ্ছে না। নিজেদের মধ্যে বাড়ছে সহিংসতা ও দ্ব›দ্ব।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দ্ব›েদ্ব প্রাণ গেছে ৩৩ জনের। তাদের মধ্যে শুধু আওয়ামী লীগেরই রয়েছেন ২৮ জন। এ তালিকায় সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্যও রয়েছেন। তথ্যমতে, গত ছয় মাসে দেশে মোট রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩৯৩টি। এসব সংঘাতে আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২২৪ জন। যার বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘটেছে।

৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর হয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। জাতীয় সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশ নেয়নি। উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দেয়নি আওয়ামী লীগ। জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতা দলীয় সিদ্ধান্তে উন্মুক্ত থাকায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনী মাঠে মূলত লড়াই হয়েছে নৌকা বনাম দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে। একই পরিস্থিতি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও। ফলে গত ৬ মাসে যেসব রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটেছে; সেগুলোর মধ্যে ২০০টির বেশি হয়েছে আওয়ামী লীগ ও দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। বিশেষ করে উপজেলা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের তৃণমূলে দ্ব›দ্ব-সংঘাত বেড়েই চলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে দ্ব›দ্ব সংঘাত বেড়ে যায়। উপজেলা নির্বাচনে তা আরো প্রকট হয়; এর পেছনে আছে আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। আর এখন মাঠে বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তেমন না থাকায় তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হচ্ছে।

গত ১২ জুন চাঁদপুর শহরের পুরানবাজারে আওয়ামী লীগের দুগ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে নিহত হন আল আমিন নামে এক আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে। এ ঘটনায় আহত হন ৩০ জন। ২৬ জুন রাজধানীর কদমতলী এলাকায় যুবলীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪ জন। ওইদিনই মুন্সীগঞ্জে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে পাঁচজন গুলিবিদ্ধসহ আটজন আহত হয়েছেন। ২৭ জুন ঝিনাইদহের শৈলকুপায় আওয়ামী লীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে আটজন আহত হয়েছেন। ২৪ জুন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় আওয়ামী লীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৯ জন। ২৩ জুন রাজবাড়ীর পাংশায় আওয়ামী লীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষ হয়। ২২ জুন নেত্রকোনা কলমাকান্দা উপজেলায় দলটির দুগ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয়েছে ৩০ জন। ৭ জুন চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে করা মিছিলে উপজেলা আওয়ামী লীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। ১৩ মে কলকাতায় বাংলাদেশের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগে চলছে গৃহদাহ।

আওয়ামী লীগ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃণমূলে আওয়ামী লীগে এখন ব্যাপক গ্রুপিং-লবিং চলছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তা আরো তীব্র হয়েছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পদধারী ৬২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি হয়েছেন। এমপি হয়েই এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে তারা আরো তৎপর হয়েছেন। তাদের অনুসারীরা এখন এলাকায় শক্ত অবস্থান গড়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে নৌকা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হারলেও পরাজিতরা নিজ দলীয় অবস্থান ধরে রেখে স্বতন্ত্র এমপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন। বলা যায়, এখন প্রতিটি এলাকায়ই এমপি অনুসারী ও তাদের একটি বিরোধী গ্রুপ আছে। উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী চেয়ারম্যান ও তাদের পরাজিত গ্রুপ আর জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা আলাদা গ্রুপ নিয়ে এখন নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় রয়েছেন। আর এই গ্রুপিংয়ের পেছনে রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের চাঁদবাজি, দখলবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের বিষয়।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ভোরের কাগজকে বলেন, নিজেদের মধ্যে দ্ব›দ্ব-সংঘাত বা সহিংসতা আওয়ামী লীগ কখনোই ভালোভাবে নেয় না, প্রশ্রয়ও দেয় না। করোনাপরবর্তী সময়ে মানুষের জীবনমানে সামাজিক জীবনে অসহনশীলতা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তারই পারিপার্শ্বিকতার ফলে যে পরিবর্তন হয়েছে, তার প্রভাবে মানুষ প্রভাবিত হচ্ছে। তার প্রভাব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যেও পড়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে খুবই কঠোর। আমরা তী² নজরদারি করছি। নির্বাচনপরবর্তী কিছু সমস্যা হচ্ছে; সেগুলো আমরা নজর রাখছি। ভবিষ্যতে যেন আর না বাড়ে সেদিকে নজর দেব। এ বিষয়ে আমাদের দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে যেসব ঘটনা ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে, আইন অনুযায়ী সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যেখানে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া দরকার, আমরা সেখানে সেই পদক্ষেপ নেব। অতীতেও নিয়েছি। আওয়ামী লীগ কোনো অপরাধীকে কখনোই ছাড় দেয়নি। তৃণমূলে নানা গ্রুপিংয়ের বিষয়ে এই নেতা বলেন, আমি পুরোপুরি গ্রুপিং বলব না। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নেতার বিভিন্ন ধরনের অনুসারী থাকে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে তারা যখন ভোট দিতে যায়, তখন তারা দলের সিদ্ধান্তের প্রতিই সম্মান দেখায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রুপিংয়ের পর্যায়ে যায়। আমরা সেগুলো সাংগঠনিকভাবে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, জাতীয় নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি না আসায় এই দুই নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে হয়েছে মূলত নিজ দলের প্রার্থীদের সঙ্গেই। ফলে তৃণমূলে নানা গ্রুপ-উপগ্রুপ তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ বেড়ে গেছে। আমরা সেগুলো সামলানোর চেষ্টা করছি। জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি গণভবনে সারাদেশের নেতাকর্মী ও দলীয় জনপ্রতিনিধিদের ডেকে শক্ত বার্তা দিয়েছেন। আমরাও বৈঠক করছি। কিছু কিছু জায়গায় কেন্দ্রীয় নেতাদের মদত রয়েছে। ফলে কিছু সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। এ নিয়ে দলের মধ্যে কিছুটা উদ্বিগ্নতাও আছে। দলীয় প্রধানকে আমরা সব জানিয়েছি। দলের কার্যনির্বাহী সংসদের পরবর্তী সভায় এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সেখান থেকে নিশ্চয়ই দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শক্ত কোনো নির্দেশনা দেবেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App