×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

শেষের পাতা

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

দেশের দ্রুত শিল্পায়নে চীনকে প্রয়োজন

Icon

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের দ্রুত শিল্পায়নে চীনকে প্রয়োজন

কাগজ প্রতিবেদক : সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেছেন, বাংলাদেশের দ্রুত শিল্পায়নের জন্য চীনকে প্রয়োজন। গত এক দশকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক গভীর হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্পায়িত বাংলাদেশের চীনকে দরকার। গোলটেবিল আলোচনায় সূচনা বক্তব্য দিতে গিয়ে শাহরিয়ার মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো স্মরণ করলেও গত দেড় দশকে চীনের অবদানের স্বীকৃতি দেন। এই সংসদ সদস্য বলেন, ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তুলনা করার কোনো কারণ নেই। শাহরিয়ার ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও ত্যাগ স্বীকারের কথা স্মরণ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সা¤প্রতিক ভারত সফরকে ঘিরে অপপ্রচারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর রিজিওনাল স্টাডিজের (বিএফআরএস) আয়োজনে এই আলোচনা সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ। এতে নাহিম রাজ্জাক এমপি, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের (সিএ) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান, বিজিএমইএর পরিচালক শামস মাহমুদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, ওক্যাবের সাধারণ সম্পাদক জুলহাস আলম, অধ্যাপক রুমানা ইসলাম, ডিক্যাব সভাপতি নুরুল ইসলাম হাসিব প্রমুখ বক্তব্য দেন।

শাহরিয়ার আলম বলেন, চীন আমাদের যে ডিউটি ফ্রি সুবিধা দিচ্ছে, তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কারণেই দিচ্ছে। চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় থাকবে। তিনি বলেন, জাপানের সহায়তায় মাতারবাড়ী-মহেশখালী যেমন একটা পাওয়ার হাব হিসেবে গড়ে উঠেছে, তেমনি পায়রা বন্দর আরেকটি হাব হবে। এই ক্ষেত্রে চীন আামাদের একমাত্র বিকল্প হতে পারে। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পূরণ ও আমদানি মূল্য পরিশোধে বাজেট সহায়তার জন্য পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কম সুদের ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। এবারের সফরে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতিবাচক ফল আনার চেষ্টা করা হবে। চীনের সঙ্গে বিআরআই-এর প্রকল্পের অংশ হিসেবে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের যে প্রকল্পগুলো চলছে, সেগুলোর রিপেমেন্ট যখন শুরু হবে, তা দেরি করে দেয়া হলে এই মুহূর্তে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা কমবে। মিয়ানমার ইস্যুতে চীনের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ভোরের কাগজ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, তিস্তা নিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে। সেই সমঝোতা অনুযায়ী ভারত থেকে একটি কারিগরি দল আসবে। আবার চীনও এই প্রকল্পে কাজ করতে ইচ্ছুক। এই প্রকল্পে ফুলস্টপ পড়েনি, ড্যাশ পড়েছে। সব মিলিয়ে আমরা

একটা জায়গায় থমকে আছি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বেশিদিন শত্রæ থাকে না। এই চীন ১৯৭২ সালে জাতিসংঘে সদস্য পদ পেতে বাংলাদেশকে আটবার ভেটো দিয়েছে। সেই চীন এখন আমাদের ভালো বন্ধু। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে হয়ত পায়রা বন্দর উন্নয়নে সহযোগিতা চাইব। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নিজের দেশে ব্যবসার পরিবেশ ভালো না করলে বিদেশি কোনো বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা আসবে না।

আলোচনার শুরুতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ডা. মাহফুজ কবির বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসহ (এফটিএ) আলোচনার জন্য নতুন পথ খোলা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, একটি ধারণা নোট অনুসারে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যেতে শুরু করে। ২০১০ এবং ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর দুই দেশের মধ্যে বর্তমান উষ্ণ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করেছে। ওই সফরে দুই দেশ প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ২১টি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় প্রকল্পে সহযোগিতা করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে উঠেছে। এ পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে ২১টি সেতু, ১১টি মহাসড়ক নির্মাণে সহায়তা করেছে। রাস্তা এবং ২৭টি শক্তি ও বিদ্যুত প্রকল্প, উন্নয়ন এবং পরিকল্পনা পর্যায়ে আরো অসংখ্য প্রকল্প রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যও বেড়ে চলেছে। চীন ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যের উপর শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর করেছে। পরে তা বাড়িয়ে ৯৮ শতাংশ করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে চীন বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ছিল। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৭৭ মিলিয়ন এবং আমদানির পরিমাণ ছিল ২২.৯ বিলিয়ন। প্রবন্ধে এও বলা হয়, সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ জিয়ানচাও তার সা¤প্রতিক ঢাকা সফরকালে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন চীন সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদের অনেক প্রত্যাশা আছে, এবং আমি নিশ্চিত যে আমাদের দুই সরকার এবং সরকারি সংস্থা আগামী সময়ে আমাদের দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার জন্য একটি সাধারণ পরিকল্পনা তৈরি করবে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সম্পর্কের ইতিহাস এবং বন্ধুত্ব নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর ও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বক্তারা বলেন, এককেন্দ্রিক থেকে বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে চলে গেছে বিশ্ব। আমাদের তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। চীন বাংলাদেশে কিছু সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এক্ষেত্রে আরো ব্যাপকভিত্তিক চিন্তা করতে হবে। দ্রুতগতির রেল সংযোগের মধ্যে দিয়ে চীন বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আমরাও যদি সেভাবে দ্রুতগতির রেল চালু করতে পারি তাহলে এক ঘণ্টায় ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরে পৌঁছানো যাবে। এক্ষেত্রে আমরা চীনের সহযোগিতা চাইতে পারি। স্বাস্থ্যসেবায় চীনের অর্জন অভূতপূর্ব। বিশেষ করে তাদের ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসা। এতে তারা রোল মডেল। চীন চাইলে বাংলাদেশে ১০টি পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ১০টি হাসপাতাল স্থাপন করতে পারে। একইভাবে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও তারা ভিন্নতা এনেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের এই উদ্ভাবনী পন্থা ব্যবহার করে দেশে ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারে চীন। চীন বাংলাদেশিদের জন্য ভিসার সংখ্যা এবং মেয়াদ বাড়াতে পারে। এখনকার ভূ-রাজনীতি সংঘাতের নয় বরং সহযোগিতামূলক। পশ্চিমারা এখন এই নীতিতে চলছে। আমাদেরও তা অনুসরণ করা উচিত। ভারত ও চীনের মধ্যেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুসম্পর্ক আছে। ভারতের প্রচুর শিক্ষার্থী চীনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে সেখানে যায়। বেশির ভাগই বিজ্ঞানবিষয়ক।

অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বহুমাত্রিক সম্পর্কের বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের চীনের সমর্থন দরকার। যেসব প্রকল্প চীন বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করছে তাতে ভারতও উপকৃত হচ্ছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। কৃষি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আমরা চীনের সহযোগিতা চাইতে পারি। এসব ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে আছে। সর্বোপরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে জোর দিতে হবে। ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু ভারসাম্য বজায় রেখে চলা নয় বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পানির সমস্যার সমাধান সহজে হবে না। আমার কৃষি খাতে উন্নতি করতে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। বাংলাদেশের যেমন চীনকে প্রয়োজন তেমনি চীনেরও বাংলাদেশকে প্রয়োজন। এই ধারণা মাথায় নিয়ে আমাদের এগুতে হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, টাইগার নিউ এনার্জির সিইও নিকোল মাও, জারা মাহবুব এমপি, বিজিএমইএর পরিচালক শামস মাহমুদ, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক বিদ্যা অমৃত খান, বিএফআরএস চেয়ারম্যান এএসএম শামসুল আরেফিন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. তাহসিন এইচ আলী, ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সংসদ সদস্য এসএম শাহজাদা, মো. মহিউদ্দিন বাচ্চু, আশেখ উল্লাহ রফিক, মোহাম্মদ হারুনর রশিদ, আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান হেলাল, মোহাম্মাদ নাজিবুল ইসলাম, বিকাশের বাণিজ্যিক প্রজেক্টের উপদেষ্টা মো. আব্দুল আজিজ খান, বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যক্ষ ড. কামরুল হাসান খান, আওয়ামী লীগ নেতা ইশাল আলী খান পান্না, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মো. ইমদাদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা তানিয়া সুলতানা হ্যাপী, জয়ন্ত আচার্য, ফাহাদ ইউসুফ হোসেন প্রমিত, মোহাম্মদ জিহাদুল ইসলাম, তুষার কান্তি উপাধ্যায় প্রমুখ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App