×

শেষের পাতা

রেওয়াজে সচল ‘কনডেম সেল’

Icon

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রেওয়াজে সচল ‘কনডেম সেল’

ইমরান রহমান : বিচারিক আদালতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হলেই তার জায়গা হয় একটি বিশেষ সেলে। যেটি ‘কনডেম সেল’ নামে পরিচিত। বিচারিক আদালতের রায়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় অনেক আসামির বছরের পর বছর কেটে যায় এই সেলে। ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের ছোট কক্ষে (বেশির ভাগ কারাগারে আয়তন বেশি) শারীরিক ও মানসিক পীড়নে মৃত্যুদণ্ডের আগেই যেন মৃত্যুকষ্ট ভোগ করতে হয় দণ্ডিতের। বেশির ভাগ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের রায়ে সাজা কমে যাওয়ায় দীর্ঘবছর ধরে কনডেম সেলে থাকা নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। তবে সম্প্রতি হাইকোর্টের দেয়া একটি রায়ে- কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগে অর্থাৎ আপিলসহ সর্বোচ্চ আদালতে অনুমোদনের আগে তাকে কনডেম সেলে রাখা যাবে না বলে আদেশ দেয়া হলে বিষয়টি আবারো আলোচনায় আসে। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে রায়টি স্থগিত হলেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বন্দিদের মানবাধিকারের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, কারাবিধিতে উল্লেখ না থাকলেও কেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দীর্ঘবছর কনডেম সেলে রাখা হচ্ছে? যদিও কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কনডেম সেল বলতে কারাগারে কোনো সেল নেই। তবে রেওয়াজ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একটি বিশেষ সেলে রাখা হয়। যেসব সেলে দাগি আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, বিশেষ রাজনৈতিক মামলার আসামি, শীর্ষ জঙ্গি, ছোঁয়াচে রোগী, যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামিদেরও রাখা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কারাগারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়। কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে সারাদেশের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ২৫৬৭ জন (২১ মে এর তথ্য)। আর বিশেষ সেল রয়েছে ২৬৯৪টি। এর মধ্যে পুরুষের জন্য সেল ২৫১২টি। আর নারীর জন্য ১৪৫টি। এসব সেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছাড়াও কারাগার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি- এমন বিশেষ কিছু বন্দিদের রাখা হয়েছে।

৫টি কারাগারের ঊর্ধ্বতন সূত্র ভোরের কাগজকে জানিয়েছে, কারাবিধিতে না থাকলেও ফাঁসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বিশেষ সেলে রাখার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক রাখা। কেননা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে রাখলে তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ঝামেলা হতে পারে। সাধারণ বন্দিরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের কটাক্ষ ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে পারে। এতে উভয়ের মধ্যে মারধরের ঘটনা ঘটতে পারে। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনার পর ওই বন্দি আর তার নিজের জীবনের পরোয়া করবে না- এটাই স্বাভাবিক। ফলে সে ভয়ংকর অপরাধমূলক ঘটনা ঘটিয়ে বসতে পারেন। কেননা, মৃত্যুদণ্ডের আদেশের খবর শুনে সে মানসিকভাবে ট্রমায় পড়ে যাবে। অপরাধ করলে কি আর হবে? মৃত্যুর আদেশ তো চলেই এসেছে- এ ধরনের বোধ কাজ করা শুরু করবে। অনেকে কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করতে থাকবে। এতে কারা নিরাপত্তা আরো জোরদার করতে হবে। জনবল সংকট থাকায় এটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আবার অনেকে আত্মহত্যার মতো পথ বেঁছে নিতে পারে। বিশেষ করে পুরুষ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে রেখে নজরদারি করা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সাধারণ বন্দিরা প্রতিটি সেলে ২৫-৩০ করে থাকেন। অনেকে অতিরিক্ত হতাশা থেকে যে কোনো অবৈধ উপায়ে মাদক নিতে চাইবেন। ফলে মাদকের চাহিদা বাড়ায় কারবারিরা কারাগারকেন্দ্রিক সক্রিয়তা আরো বাড়াবে। এছাড়া শীর্ষ জঙ্গিরা সাধারণ ওয়ার্ডে থাকলে তাদের সংগঠনে সদস্য বাড়ানোর তৎপরতা করবে নিঃসন্দেহে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও একই তৎপরতা চালাবে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানিয়েছে,

কারাগারটিতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ৪টি ভবনে রাখা হয়। সেগুলো হলো- বকুল, সূর্যমুখী, বনফুল ও শাপলা। একই আয়তন ও সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন ভবনগুলোর প্রতিটিই ৪ তলা। প্রত্যেকটিতে ১১২টি করে ৪৪৮টি সেল রয়েছে। কারাগারটিতে বর্তমানে ৯২ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে। যাদের ওই ৪টি ভবনের বিভিন্ন সেলে রাখা হয়েছে। সূত্র বলছে, কনডেম সেল বলতে বর্তমানে কোনো সেল নেই। তবে, কারা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে যে কোনো রুম বা ভবনকে কনডেম সেল হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। যে ৪টি ভবনে ফাঁসির আসামিদের রাখা হচ্ছে- সেখানে অন্য বন্দিদেরও রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ছোঁয়াছে রোগে আক্রান্ত, যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক মামলার বিশেষ আসামি ছাড়াও জেল কোড অমান্যকারী বন্দিদের ওই সেলগুলোতে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কনডেম সেল বলতে যেমনটা বোঝানো হয়- বিষয়টি ঠিক সেরকম না হলেও বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এই সেলের বন্দিদের।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে বিশেষ সেলে রাখা মানেই তিনি একদম অমানবিক জীবন কাটান- বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। সে ভবনের করিডোরে ও নিচ তলায় নেমেও হাঁটাচলা করতে পারে। এই সেলগুলোতে স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়। অসুস্থ হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালের ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। সাধারণ কয়েদিদের কারাবিধি অনুযায়ী যে খাবার দেয়া হ- তাদেরও সেই একই খাবার দেয়া হয়। তবে সাধারণ বন্দিরা পুরো কারাগারে হাটাচলার সুযোগ পান। সামগ্রিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই সুযোগটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের দেয়া হয় না। পাশাপাশি সাধারণ ওয়ার্ডের তুলনায় এই সেলগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি করেন কারারক্ষিরা। তবে, কারাবিধি অনুযায়ী স্বজন ও কাছের মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদেরও।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের (কেরানীগঞ্জ) সিনিয়র জেল সুপার সুভাষ কুমার ঘোষ ভোরের কাগজকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে রাখার নির্দেশনা এলে আমরা সেভাবেই রাখবো। এ বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি অনাপত্তির বিষয় নেই। আমরা যে কোনো নির্দেশ পালন করতে সবসময় প্রস্তুত। কাশিমপুর কারাগার-১ সূত্র জানায়, কারাগারটিতে বিশেষ সেল রয়েছে ১৬০টি। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে ১১৩ জন। কুমিল্লা জেলা কারাগার সূত্র জানায়, সেখানে বিশেষ সেল রয়েছে ৩৮টি। এর মধ্যে ২টি সেলে ১২ জন নারী ও ৩৬টি সেলে ১৩৬ জন পুরুষ বন্দিকে রাখা হয়েছে। কুমিল্লা জেলা কারাগারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের কাগজকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে কম। বিশেষ করে যারা নিশ্চিত থাকে- তার সাজা কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ- তারা বেশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। এজন্য এ ধরনের আসামিদের বিশেষ সেলে রাখাকে নিরাপদ বলে মনে করা হয়। কারা উপমহাপরিদর্শক (সদর দপ্তর) মনির আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, সবারই স্পষ্ট হওয়া উচিত, কারাগারে কনডেম সেল বলতে কিছু নেই। আর কারাবন্দিদের কিভাবে রাখা হবে সেটি আমাদের নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্তও নয়। নিয়ম মেনেই সব বন্দিদের রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে যেকোনো নির্দেশনা এলে আমরা তা মানতে প্রস্তুত রয়েছি।

জানা গেছে, বর্তমানে বিচারিক আদালত থেকে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে পাঠানো ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি চলছে। এসব মামলার আসামি ৬ থেকে ৭ বছর ধরে কনডেম সেলে বন্দি রয়েছেন। এছাড়া রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় করা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের বিচারসহ ব্যতিক্রম দুয়েকটি মামলার বিচার ঝুলে আছে আরো দীর্ঘ সময় ধরে। বর্তমানে উচ্চ আদালতে এ ধরনের প্রায় এক হাজার ডেথ রেফারেন্স মামলা বিচারাধীন। কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টে বিচারাধীন এসব মামলায় আসামি ১২ শতাধিক। এছাড়া ১৩ শতাধিক আসামির আপিল বিচারাধীন আপিল বিভাগে। আপিল বিভাগে বিচারাধীন এসব আসামির বেশির ভাগই এক যুগের বেশি সময় কনডেম সেলে বন্দি রয়েছেন। তারপরও কবে তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হবে তার নিশ্চয়তা নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২ সালে সেপ্টেম্বরে চলা অবকাশে দেড় মাসে ২৯টি ডেথ রেফারেন্স মামলার রায় হয়। এসব মামলায় ৭৭ আসামির মধ্যে ৫০ জনেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দেয়া হয়নি। শতকরা হিসাবে এটি দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর আগে ওই বছরের ২০ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলা অবকাশে হাইকোর্টের ১১টি বিশেষ বেঞ্চে ৩০টি ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হয়। এসব মামলায় ৬৭ আসামির মধ্যে ৫৮ জনের মৃত্যুদণ্ড টেকেনি হাইকোর্টে। শতকরা হিসাবে এটি দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ৫৬ ভাগ। হাইকোর্টে যাদের ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে তাদের আবার বড় একটি অংশের সাজা কমে যায় অথবা খালাস পান আপিল বিভাগের রায়ে। আইনজীবীদের মতে, বিচারিক আদালতে ফাঁসির আদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে চূড়ান্ত ধাপে ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ আসামির। বাকি আসামিরা হয় খালাস পান, তা না হলে সাজা কমে যায়। কিন্তু চূড়ান্ত রায়ের আগেই কনডেম সেলে কাটাতে হয় বছরের পর বছর। বিষয়টি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন।

উল্লেখ্য, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন কয়েদির ২০২১ সালে সেপ্টেম্বরে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে আসামিদের কনডেম সেলে বন্দি রাখা কেন বেআইনি ঘোষণা হবে না’- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। সেই রুলের ওপর শুনানি শেষে গত ১৩ মে হাইকোর্ট রায় দেন, মৃত্যুদণ্ড পাওয়াদের অন্য বন্দির মতো একই দৃষ্টিতে দেখতে হবে। সর্বোচ্চ সাজা চূড়ান্ত হওয়ার আগে কাউকে এই সেলে রাখা যাবে না। আদালত আরো বলেন, কনডেম সেলে কোনো আসামিকে রাখা দুইবার সাজার শামিল। আদালত কারা কর্তৃপক্ষকে দুই বছরের সময় দিয়ে বলেন, এই সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আসামিদের ফাঁসির সেল থেকে সাধারণ সেলে রাখতে হবে। হাইকোর্টের দেয়া এ রায় আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত করে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত। এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করতে বলা হয়েছে। গত ১৫ মে আপিল বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের চেম্বার জজ আদালত এই আদেশ দেন। যদিও হাইকোর্ট রায়টি দেয়ার পর এটিকে যুগান্তকারী উল্লেখ করে মানবাধিকার কর্মীরা মত দেন, এই রায় প্রগতি ও ব্রিটিশ আমলের আইন এবং ধারণা থেকে উত্তরণের একটি ধাপ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App