×

শেষের পাতা

বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা

Icon

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা

মরিয়ম সেঁজুতি : নানামুখী সংকটের মধ্যে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ ও বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে গতি নেই। চাহিদা অনুপাতে চলতি মূলধন না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান। বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এতে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবাণিজ্য। তারল্য সংকট চলছে দেশের পুঁজিবাজারেও। অর্থনীতির এমন পরিস্থিতির মধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের যে বাজেট পেশ করেছেন, তাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাত আরো নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের গড় ছিল ২৪ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। ব্যবসায়ীদের মতে, টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা এখনো একটি চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে বড় বিনিয়োগ করা মানে বিরাট ঝুঁকি বলে মনে করছেন তারা। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিভিন্ন কারণে ব্যবসার খরচ বেড়েছে, তবে ব্যবসা সেভাবে বাড়েনি। পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ¦ালানির সংকটে উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। মূলধন ঘাটতির কারণে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন বিনিয়োগ অধিকাংশ ব্যবসায়ীর অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচক নিয়েই বর্তমানে দুশ্চিন্তা রয়েছে। তার মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ অন্যতম। অনেকদিন ধরেই সরকারি বিনিয়োগ দ্রুত হারে বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ সে তুলনায় বাড়ছে না। অর্থনীতির এ সংকটময় সময়ে বিনিয়োগ দ্রুতগতিতে বাড়ানো না গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে, বাড়বে বেকারের সংখ্যা।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, সরকার ইদানীং ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ করছে। যদি আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে করে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। এছাড়া কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে সরকার যে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বেসরকারি বিনিয়োগে সরাসরি বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এদিকে আমাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডিপোজিটের হার খুবই কম। এর মধ্য থেকে সরকার যদি বেশি মাত্রায় ঋণ নেয়; তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট তারল্য ব্যাংকগুলোর থাকে না। সে কারণে এবার বাজেটে প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা বলা হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের যে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বলা হচ্ছে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দেশে কয়েক বছর ধরেই আমানতের চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি। প্রত্যাশা অনুসারে, আমানত না পাওয়ায় দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকই তারল্য সংকটে ভুগছে। প্রায়

তিন বছর ধরে চলা এ সংকট এখন আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। বেশির ভাগ ব্যাংক দৈনন্দিন লেনদেন মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ধার নিয়ে চলছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। এর সার্বিক প্রভাব গিয়ে পড়বে জাতীয় আয়ে। কর্মসংস্থানে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। সরকার ব্যাংক খাত থেকে যদি ঋণ নেয় তাহলে এ খাতের কী হবে? এ খাত ঋণ না পেলে বিনিয়োগ কমে যাবে এবং কর্মসংস্থানও কমে যাবে। আবার এ খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত না করতে পারলে ব্যবসাবাণিজ্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্য কমে গেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর আদায় করবে কোথা থেকে? এর অর্থ দেশের মূল্যস্ফীতিও কমবে না। আবার কর্মসংস্থানও বাড়বে না। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বর্তমানে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার এবং জ্বালানি। বাজেটে এসব বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। আবার ঘাটতি বাজেটের পুরোটাই আসবে ব্যাংক ও বৈদেশিক উৎস থেকে। দেশে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আস্থাহীনতাসহ বিভিন্ন কারণে আমানতকারীদের অনেকেই ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। আবার ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার অনেক বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটিই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা ছিল। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা বেড়েছে। এ অবস্থায় সরকার যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নিয়ে তা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে থাকে। বিশেষ করে উন্নয়নমূলক কাজ, কর্মকর্তাদের বেতন ও বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়। ফলে ঋণপ্রবাহ ও প্রবৃদ্ধি কমে যায়। বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত আয়, ব্যয় এবং ব্যাংকের আয় এবং অবশেষে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যাবে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি বিঘিœত হবে। তৈরি হবে বেকারত্ব।

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি আবদুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, মজুরি বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে ব্যবসার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সরকারের বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়েও হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ব্যবসা পরিবেশের উন্নতি কিংবা খরচ কমানোর বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমরা দেখছি না। বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই নতুন বিনিয়োগবান্ধব নয়, বরং বর্তমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বেশ কষ্টের।

বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে দেশে ৩৪৮ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছিল। আর গত বছর এসেছে ৩০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত বছর এফডিআই কম এসেছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ বা ৪৮ কোটি ডলার। মোট এফডিআইয়ের মধ্যে মূলধন বা নতুন বিনিয়োগ, পুনঃবিনিয়োগও কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে ১০২ কোটি ডলারের নতুন বিনিয়োগ এসেছিল, গত বছর তা কমে ৭১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর পুনঃবিনিয়োগ ২০২২ সালে ছিল ২৫১ কোটি ডলারের, গত বছর তা কমে হয়েছে ২২১ কোটি ডলার।

জানতে চাইলে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, দুই বছর ধরে ডলারের দাম অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। আমদানিতে রয়েছে বিধিনিষেধ। এই দুই কারণে বিদেশিরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি। অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশে দুর্বলতা রয়েছে। বন্দর থেকে পণ্য খালাসে সময় ও অর্থ বেশি লাগে। সরকারের নীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে, বিশেষ করে কর ও কাস্টমসে। সব মিলিয়ে এফডিআই আনতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।

শিল্পে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে। নতুন নিয়োগের বিষয়ে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ব্যাংকে তারল্য সংকট চলছে। এর মধ্যে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হবে। রপ্তানি আয় কমে আসবে। ফলে দেশ আবার আমদানিনির্ভর হয়ে যাবে। প্রভাব পড়বে ডলারের ওপরে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও নেগেটিভ প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নতুন নিয়োগ তো কল্পনার বাইরে। যদিও প্রতিদিনই চাকরি খুঁজতে কারখানার বাইরে অনেকে আসছে।

অন্যদিকে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অধিকাংশ কারখানায়ই ক্রয়াদেশ কম। তাই নতুন নিয়োগ সেভাবে নেই বরং কোথাও কোথাও কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে।

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থনীতিতে সংস্কার না করলে বিনিয়োগ হবে না। বিদেশিরা এ দেশ থেকে চলে যাবে। ব্যাংক খাত, রাজস্ব খাত, স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে। নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে, না হলে এখনকার মতো অর্থ দেশে না এসে বিদেশে চলে যাওয়া অব্যাহত থাকবে। এতে সংকট আরো বাড়বে। এতে করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। নি¤œমধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App