×

শেষের পাতা

বজলুর রহমান স্মৃতিপদক প্রদানকালে প্রধান বিচারপতি

কোর্ট ট্রায়ালের আগে যেন মিডিয়া ট্রায়াল না হয়

Icon

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোর্ট ট্রায়ালের আগে যেন মিডিয়া ট্রায়াল না হয়

কাগজ প্রতিবেদক : কোর্ট ট্রায়ালের আগে যেন মিডিয়া ট্রায়াল না হয়- এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের নিদের্শনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়েদুল হাসান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ঘটনায় আমরা কোর্ট ট্রায়ালের আগেই মিডিয়া ট্রায়ালের সংস্কৃতিতে উদ্বিগ্ন বোধ করছি। এ ব্যাপারে আমি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার প্রতি মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানাই। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাংবাদিকতায় বজলুর রহমান স্মৃতিপদক ২০২৩ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জুরিবোর্ড সদস্য ফরিদুর রেজা সাগর, এ এস এম সামছুল আরেফিন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সরওয়ার আলী ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। সভাপতির বক্তব্য দেন জুরিবোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সংসদ উপনেতা মতিয়া চৌধুরী, সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন প্রমুখ।

প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তিন সাংবাদিকের হাতে বজলুর রহমান স্মৃতিপদক হিসেবে ক্রেস্ট, সনদপত্র ও ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন প্রধান বিচারপতি। প্রিন্ট মিডিয়া ক্যাটাগরিতে দৈনিক ভোরের কাগজের ঝর্ণা মনি ও ডেইলি স্টারের আহমেদ ইশতিয়াক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন চ্যানেল আইয়ের লায়লা নওশিন। প্রধান বিচারপতি ওবায়েদুল হাসান তার বক্তব্যে বলেন, বিচার নাগরিকের সবশেষ আস্থার স্থল। গণমাধ্যমের সঙ্গে আমাদের বিচার বিভাগের সম্পর্ক চিরকালই আন্তরিকতা ও ঘনিষ্ঠতার রঙে রঙিন হয়ে আছে। জনগণের আস্থাই বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর সেই আস্থা প্রতিফলিত হয় গণমাধ্যমের হাত ধরে। বিচার বিভাগ একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্র। ফলে আদালত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা গণমাধ্যমের কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতা প্রত্যাশা করি। একটি অপ্রকাশযোগ্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ বা তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা সমগ্র বিচার ব্যবস্থার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। আবার বিচার ব্যবস্থায় যদি কোনো অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি হয় তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া জরুরি। এতে বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার জায়গাটি নিশ্চিত হয়।

তিনি বলেন, বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে। আদালতের ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন না হয়, আদালতের ওপর মানুষের আস্থা যেন সংকুচিত না হয়, অথবা বিচারাধীন মামলার কার্যক্রমে যেন প্রকাশিত সংবাদ প্রভাব বিস্তার করতে না পারে এমন চিন্তা থেকেই এ পরামর্শ দেয়া হয়।

তিনি বলেন, গণমাধ্যম হচ্ছে সমাজের দর্পণ, সমকালের নির্ভুল প্রতিফলন। গণমাধ্যম আমাদের বোধ ও বুদ্ধি নির্মাণের প্রভাবক, আমাদের আনন্দ-বেদনার দিনলিপি, আমাদের সমাজচিন্তার সূত্রধর। বিখ্যাত ইঙ্গ-আইরিশ দার্শনিক এডমন্ড বার্ক গণমাধ্যমকে ‘ফোর্থ এস্টেট’ বা ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলে অভিহিত করেছেন। অচিন্তনীয় ঝুঁকির বোঝা মাথায় নিয়ে, বিত্ত, সুবিধা এমনকি ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সাংবাদিকরা আমাদের তথ্য সরবরাহ করছেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন উপাংশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছেন, গণতন্ত্রকে সার্থকরূপ দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মুখ্য নির্ণায়ক হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলো যত গণমাধ্যম-বান্ধব হবে, ততটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে গণতন্ত্র, ততটাই বিস্তৃতি পাবে মতপ্রকাশের অধিকার। এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে অনুকরণীয় হয়ে আছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি সাক্ষাৎকারে আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম দেখতে চাইতেন। তিনি গঠনমূলক সমালোচনা সাদরে গ্রহণ করতেন। বঙ্গবন্ধু চাইতেন সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করুক। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সমালোচনা যেমন তিনি গ্রহণ করতেন তেমনি তিনি চাইতেন প্রয়োজনে মালিকের সমালোচনাও যেন সাংবাদিকরা করেন। অর্থাৎ সাংবাদিকরা যেন বিক্রি না হয়ে যান। তারা যেন সরকার ও মালিকের আধিপত্যমুক্ত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরেন তিনি। আগামী দিনেও সাংবাদিকরা যেন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে কণ্ঠ ও কলম হাতে যুদ্ধ করা সাংবাদিকদের রেখে যাওয়া আদর্শ নিজেদের পেশাগত জীবনের পাথেয় হিসেবে নেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রশংসনীয় উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য ঐতিহাসিক অনুষঙ্গকে এ জাদুঘর ধারণ করে আছে, মুক্তিযুদ্ধের অবিনশ্বর চেতনার মাপকাঠিতে সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঈর্ষণীয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নতুন প্রজন্মের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠের যে অসীম তৃষ্ণা এ জাদুঘর ছড়িয়ে দিতে পেরেছে, তাতে করে আমরা আশাবাদী হই, সাহস পাই- পরাজিত শক্তিরা যতই ষড়যন্ত্র করুক, এ মাটির বুক থেকে মুক্তিযুদ্ধকে, বঙ্গবন্ধুকে, শহীদের রক্তবিন্দুকে মুছে ফেলা যাবে না। জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমান সাফল্যের চিহ্ন রেখে যাচ্ছে। এ অর্জন কেবল এই প্রতিষ্ঠানের নয়, এ অর্জন পুরো বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অনন্তকাল আমাদের হাত ধরে থাকবে, পথ দেখিয়ে যাবে।

ডা. সরওয়ার আলী বলেন, নির্ভীক সাংবাদিকরা মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংরক্ষণ ও এর প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এ অঞ্চল সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গৌরবময় ঐতিহ্য বহন করে। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের আমলে তারা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন। দেশকে মহান মুক্তিযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।

বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে- এমন প্রত্যাশা করেন মফিদুল হক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App