×

শেষের পাতা

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগই নেই

Icon

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগই নেই

দেব দুলাল মিত্র : বারবার সময় বেঁধে দিয়েও রাজধানীর সড়ক থেকে লক্কড়ঝক্কড়, রংচটা, ভাঙাচোরা ও ফিটনেসবিহীন বাস তুলে দেয়া যাচ্ছে না। আইন করেও বদলানো যাচ্ছে না চালকদের বেপরোয়া আচরণ, বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র যাত্রীদের ওঠানামা করানো। ‘ওয়েবিল’ এর নামে এখনো যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বিআরটিএ ওয়েবিল সিস্টেম বেআইনি হিসেবে ঘোষণা করার পরও বাস মালিকরা তা বহাল রেখেছেন। এসব কারণে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এদিকে নজর না দিলেও আগামী ১ জুলাই থেকে ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি বিআরটিএ আবারো ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে পুরনো লক্কড়ঝক্কড় বাসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করবে। এই সময়ের মধ্যে তারা বাস মালিকদের এ ধরনের বাস সড়ক থেকে তুলে নিতে বলেছে। আগামী ১ জুলাইয়ের মধ্যে এ ধরনের ত্রæটিপূর্ণ মোটরযানকে ত্রæটিমুক্ত ও দৃষ্টিনন্দন করার জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় বিআরটিএ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল দেশ। ঢাকা মহানগরে চলাচলরত গণপরিবহনের সৌন্দর্যের ওপর নগরের সৌন্দর্য ও দেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশে নির্ভর করে। এর আগে গত ১৯ মে এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে বিআরটিএ। এতে মহাসড়কে লক্কড়ঝক্কড়, রংচটা, গøাস ভাঙা, লাইট ভাঙা, সিট ভাঙা মোটরযান চলাচল বন্ধে অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাস্তবে বিআরটিএকে জোড়ালো অভিযান চালাতে দেখা যায়নি। বছরের পর বছর ফিটনেস না থাকার পরও বাসগুলো আটক ও ডাম্পিংয়ে পাঠাতে বিআরটিএ এবং পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের আগ্রহ ছিল না। এখনো সবার চোখের সামনে দিয়ে ফিটনেসবিহীন বাসগুলো রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের সামনে দিয়েই কালো ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছে এসব বাস। রোড পারমিট বাতিল বা মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি ধ্বংসের প্রমাণ মেলে না। অনেকের কাছেই বিআরটিএর ‘লোক দেখানো’ অভিযান সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ থেকেছে।

পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রাতারাতি শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। আইন না মানার প্রবণতা, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, মনিটরিংয়ের অভাবের কারণে সড়কের সার্বিক শৃঙ্খলা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। আইন ও বিধিমালা হওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক। পরিবহন খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার লোকজন, পুলিশ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির দুষ্ট চক্র গড়ে উঠেছে। সড়কে ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা

ফিরুক, এই চক্রটি তা চায় না। এ কারণে ভালো পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেয়ার পরও সড়কে বিশৃঙ্খলা থেকেই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদলতের অভিযান চালানো হলেও তা লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই আমার মনে হয় না।

তিনি আরো বলেন, সড়ক পরিবহন আইন এখন পর্যন্ত শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা আইন এখনো বাস্তবায়ন না হওয়া খুবই দুঃখজনক। আইন বাস্তবায়ন না করে এখন লক্কড়ঝক্কড়, রংচটা, ভাঙাচোরা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়ক থেকে তুলে নেয়া হলেই সড়কের পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশে পরিবহন ও সড়ক খাতে এখনো কোনো ছোঁয়া লাগেনি। আমি মনে করি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তবায়ন হলে সড়ক আইনের বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করা, সড়কে সুন্দর পরিবেশ প্রতিষ্ঠা, ঝুঁকিমুক্ত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা, সড়কের নৈরাজ্য দূর করা সম্ভব হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার রাস্তায় ও সারাদেশে কী পরিমাণ ফিটনেসবিহীন বাস ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। রাজধানীর সড়কে ৪৩ বছরের পুরনো লক্কড়ঝক্কড়, রংচটা, ভাঙাচোরা ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাস চলাচল করছে। ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হলেও কোনো কোনো গাড়ি বিআরটিএর উদারতায় বারবার ফিটনেস সার্টিফিকেট পেয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি ধরে আনতে হয় না, তারা স্বয়ংক্রিয় মেশিনের থাকা রেজিস্ট্রেশন দেখেই সতর্ক করে এবং মালিকরা তা ডাম্পিং স্টেশনে পাঠিয়ে দেয়। পরিবেশ সচেতনতা আইনের কঠোরতার কারণে উন্নত দেশে পুরনো গাড়ি চালাতে পারে না। জাপান ও কিছু দেশ ৫ বছরের পুরনো কিন্তু সচল গাড়িগুলো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। অথচ বাংলাদেশে সব আইন থাকার পরও যানবাহনের পরিবেশ ও চেহারা একটুও বদলায়নি।

বিআরটিএর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৫৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৬৩টি। ২০১১ সালে ছিল ১৪ লাখ ২৭ হাজার ৩৬৮টি। গত এক যুগে নিবন্ধিত যানবাহন ৪৩ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৫টি বেড়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাস-ট্রাকসহ ৫ থেকে ৬ লাখ ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলাচল করছে। বিআরটিএ থেকে চোরাপথে এসব গাড়ির ফিটনেস সনদ দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অনফিট গাড়ি সড়কে চলাচলের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক অর্থের লেনদেন। এছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে আনফিট গাড়ি চলাচল করছে। পুলিশ, বিআরটিএ ও রাজনৈতিক নেতারা চাঁদার ভাগ পায়। এসব গাড়ি সড়কে না চললে তাদের কারো পকেটে টাকা যায় না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাঁদা আদায় ও ভাগবাটোয়ারা করা হয়। বিআরটিএ কর্তৃক বিভিন্ন সময় এ ধরনের গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা আইওয়াশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, বিআরটিএ বছরের বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে থাকে। যানবাহনের সমস্যা থাকলে জরিমানা করা হয়, মামলা হয়, আবার ডাম্পিংয়ে যানবাহন পাঠানো হয়। সার্টিফিকেট নেয়ার পরও কোনো গাড়ির অবস্থা আনফিট দেখা গেলে ব্যবস্থা নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। সড়কে পুলিশ দায়িত্বে থাকে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App