×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

শেষের পাতা

জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়াবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

Icon

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়াবে  প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

ঝর্ণা মনি : রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সরণির (পুরনো এলিফ্যান্ট রোড) ইস্টার্ন মল্লিকা থেকে একটু সামনেই রাস্তার বিপরীতে সরু গলি। হেঁটে গেলে গলির মাথায় ডান পাশে চোখে পড়বে ৩৫৫ নম্বর বাড়িটি। ‘কণিকা’ নামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের। বাড়ির নামকরণও তিনিই করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে এই বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের এক টুকরো আশ্রয়স্থল। এর মূল্য তাকে দিতে হয়েছিল ছেলে এবং স্বামী হারিয়ে। একাত্তরের ২৯ আগস্ট রাতে এই বাড়ি থেকেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন গেরিলা যোদ্ধা শহীদ শাফী ইমাম রুমী বীর বিক্রম। এই বাড়ি থেকেই শহীদ জননী অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে দেখেছেন নিজের চোখের সামনে থেকে, শত্রæচক্ষুর আড়ালে আশ্রয়ে রেখেছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনকে। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের দিনলিপি তুলে ধরেছেন, ডায়েরির পাতায়, মুক্তিযুদ্ধের দলিল ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে। নব্বই দশকে গঠিত একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। ঘাতকদের বিচারের দাবিতে নেতৃত্ব দেন গণ-আন্দোলনে। তারই নেতৃত্বে পরিচালিত হয় গণ-আদালত। মুক্তিযুদ্ধে এই পরিবারের গৌরবময় অবদান তুলে ধরতে ২০০৭ সালে পারিবারিক উদ্যোগে বাড়িটিকে ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপ দেয়া হয়। দেড় দশক পর গত মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে সেটিকে জাতীয় জাদুঘরের নবম শাখা হিসেবে একীভূত করে নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে আরো নিবিড়ভাবে জানাবে শহীদ জননীর লড়াই আর শহীদ রুমির আত্মত্যাগ।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম জাদুঘরে দরজা দিয়ে প্রবেশের পর ডান পাশে চোখে পড়বে একটা বড় ছবির ফ্রেম, যেখানে দেখানো হয়েছে বিভিন্ন দশকে জাহানারা ইমাম দেখতে কেমন ছিলেন সেসব ছবি। সেখানেই রাখা হয়েছে একটা সোফা সেট, যে সোফাটি মুক্তিযুদ্ধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সাক্ষী হয়ে

আছে। একটু চোখ বোলালেই দেখা যাবে, সেই সময়ে জাহানারা ইমামের সংসারে ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাব, হারমোনিয়াম, ড্রেসিং টেবিল, তার ব্যবহৃত লেখার টেবিল, ডায়েরি, একাত্তরের দিনগুলি বইয়ের পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ, রিডিং ল্যাম্প, গ্রামোফোন প্রভৃতি। শরীফ ইমাম ও জাহানারা ইমাম পরিবারের তিন প্রজন্মের সম্পর্কে জানার জন্য টাঙিয়ে রাখা হয়েছে পারিবারিক পরিচিতি। শহীদ জননী যে বিছানায় ঘুমাতেন, সেই বিছানা তার স্মৃতি বুকে নিয়ে জাদুঘরের শোভা বর্ধন করছে। বিছানার পেছনের দেয়ালে বড় করে তার ছবির ফ্রেম রাখা হয়েছে। তার ব্যবহৃত ক্যাসেট প্লেয়ার ও কিছু ক্যাসেট সাজিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে। তিনি যে দর্পণ ব্যবহার করতেন, লাল রঙের ছোট টেলিভিশন দেখতেন, সেসবও আছে। বুকসেলফে সাজিয়ে রাখা হয়েছে অমূল্য সব বই। কিছু বই তার স্বরচিত, কিছু বই রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য, মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিখিত অনেক বইয়ের সংগ্রহও আছে সেখানে, আরো আছে তার ওপর রচিত বিভিন্ন লেখকের বই এবং পারিবারিক অ্যালবাম।

একাত্তরের ঘাতক দালালবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছবি এবং আরো অনেক পারিবারিক ছবি রয়েছে জাদুঘরে। একটা ময়না পাখির ছবিও চোখে পড়বে, যেটি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন চলাকালীন চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি তাকে উপহার দিয়েছিলেন। পাখিটি ছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। জয় বাংলা, গোলাম আজমের ফাঁসি চাইসহ আরো অনেক শব্দ বলতে পারত পাখিটি। ২০০৭-১১ সাল পর্যন্ত মমি আকারে তা জাদুঘরে রেখে দেয়া হয়েছিল। পরে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জাহানারা ইমামের কবরের পাশে পাখিটিকে সমাধিস্থ করা হয়। ‘কণিকা’ নামের এ বাড়িতে শহীদ বদি, জুয়েল, আজাদ, হাবিবুল আলমসহ আরো অনেকেই যাওয়া-আসা করতেন। জাহানারা ইমাম সর্বতোভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। জাদুঘরটিতে মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মৃতিসহ বহুমাত্রিক পাঁচ হাজার স্মৃতি সামগ্রী রয়েছে। এর মধ্যে আছে শহীদ জননীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত নিদর্শন।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে একীভূত হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ভোরের কাগজকে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ঘাতক দালাল নির্মূলের যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা কিছুটা হলেও সফল হয়েছে, বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা দায়মুক্ত ও পাপমুক্ত হয়েছি।

জাহানারা ইমাম মশাল হাতে একটি জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। জানতেন এই পথ সহজ নয়, কিন্তু তিনি দমে যাওয়ার নন, সব সয়ে বেড়িয়েছেন জীবন জুড়ে চলার পথের প্রতিটি বাঁকে। জাহানারা ইমাম হয়ে উঠেছেন এক অনুপ্রেরণার নাম। তরুণ প্রজন্মকে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘরের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজাহার খান। তিনি বলেন, এই জাদুঘর থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এবং শহিদ রুমীর বীরত্ব ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারবে।

এদিকে ১৯১৩ সালে ৩৭৯টি নিদর্শন নিয়ে যাত্রা শুরু করা ঢাকা জাদুঘরের (স্বাধীনতার পর জাতীয় জাদুঘর) নবম শাখা হিসেবে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম জাদুঘর একীভূত প্রসঙ্গে জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রæপদী শিল্পকলা বিভাগের কীপার মোহাম্মদ মনিরুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, জাহানারা ইমাম জাতীয় ব্যক্তিত্ব। দেশমাতৃকার জন্য তার অনন্য অবদান। ১৭ বছর আগে তার বাড়িটিতে খুব ছোট পরিসরে একটি জাদুঘর চালু করেছিলেন তার ছেলে সাইফ ইমাম জামী। ধীরে ধীরে সেখানে নিদর্শনসংখ্যা বেড়েছে। এখন প্রায় পাঁচ হাজার নিদর্শন রয়েছে। সেটি এত দিন তাদের পারিবারিক সম্পত্তি ছিল। এখন তার নিজেরও বয়স বেড়েছে। ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ এবং সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য তা জাতীয় জাদুঘরের কাছে হস্তান্তর করার জন্য অনুরোধ করেন। এ ব্যাপারে জাদুঘর একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে। অধ্যাপক মাহফুজা খানম, সদস্য সচিব হিসেবে জাদুঘরের পক্ষে আমি এবং সদস্য হিসেবে চারুকলার অধ্যাপক নিসার হোসেন, ইতিহাসবিদ সোনিয়া নিশাত আমিন ছিলেন। আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ট্রাস্টি বোর্ডের কাছে প্রতিবেদন জমা দেই। এরপর প্রতিবেদন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাস হয়। পরে সাইফ ইমাম জামী দানমূল্যে জায়গাটি জাদুঘরকে দেন। ৩ মে আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরের কাছে হস্তান্তর হয়। মনিরুল হক বলেন, আপাতত আগের মতোই সপ্তাহের প্রতি শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকবে। দুই দিন খোলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একটি নিদর্শন হাজার স্মৃতির বর্ণনা। আর এখানে ৫ হাজার স্মৃতি নির্দশন রয়েছে। যা দশর্নার্থীকে মনের অজান্তেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে নিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের না বলা গল্প শোনাবে। প্রজন্মের পর প্রজন্মে চেতনার আলো ছড়িয়ে দেবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App