×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

শেষের পাতা

কট্টর ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসছে বিএনপি

Icon

রুমানা জামান

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কট্টর ভারতবিরোধী অবস্থান  থেকে সরে আসছে বিএনপি

ভারত বিদ্বেষী রাজনীতি আর জোরালো করবে না বিএনপি। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। তাইতো অতীতের রাগ-ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলে ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়তে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। তবে দেশের স্বার্থে দেশটির নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গঠনমূলক প্রতিবাদ চলমান থাকবে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দল পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতায় জোর দিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই ভারতের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কোন্নয়নে গুরুত্বারোপ করছেন দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান। ফলে, এখন থেকে ‘ভারতবিদ্বেষী’ বক্তব্যে রাশ টানতে দলের সিনিয়র নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি ভারত ইস্যুতে বিএনপির নেতাদের কথাবার্তায় শীতল ভাব এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে দেশটির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এসব ‘চুক্তি- সমঝোতাসমূহ’ দেশের স্বার্থবিরোধী অভিহিত করে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়ার কথা জানান। পরক্ষণেই তিনি বলেন, তবে আমাদের কথা পরিষ্কার, আমাদের এই যে বক্তব্য বা আন্দোলন এটা কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে নয়, এটা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে ভারতকে রিচ করতে; তাদের কাছ থেকে দেশের দাবিগুলো আদায় করে নিয়ে আসতে।

সূত্র জানায়, পুনর্গঠিত হওয়ার পর গত রবিবার (২৩ জুন) বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক ‘চেয়ারপারসন্স ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটির’ প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত এই বৈঠক থেকে ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিবেশী চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন নেতারা। বৈঠকে বেশির ভাগ নেতা রাষ্ট্র হিসেবে ভারত বিরোধিতার বদলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পরামর্শ দেন। তারা বলেন, দেশ হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধাচারণ না করে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচনা করতে হবে। কয়েকজন নেতা দাবি করেন- ভারত সরকারের নয়; বরং শেখ হাসিনার সরকারের জোর সমালোচনা করলে ফল আসবে। সবার বক্তব্য শুনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়ে কি করণীয় ঠিক করে ‘বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টপ্রাপ্ত’ নেতাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হবে।

এদিকে জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে দেশে ভারতীয় পণ্য বর্জনের যে প্রচারণা চলছিল তা আস্তে-ধীরে গতি হারিয়েছে। এ ইস্যুতে এতদিনেও অবস্থান স্পষ্ট করেনি বিএনপি। সূত্র জানায়, ভারতবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সায় মেলেনি। ভারত ইস্যুতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বেশ কয়েকজন নেতা আলাদা করে কথা বলেছেন। শীর্ষ নেতাকে তারা বুঝিয়েছেন; এ আন্দোলন জোরদার করে বরং ফলাফল উল্টো হবে।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বরাবরই বলে আসছেন, ভারতবিরোধী কোনো কর্মসূচি বিএনপি আহ্বান করেনি। এটি এখন সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এর সমর্থক দলগুলোর ভেতরে-বাইরে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়- যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর ভূমিকায়। গত ২০ মার্চ নিজের গায়ের ভারতীয় চাদর ছুড়ে ফেলে দিয়ে ‘ভারতবিরোধী’ আন্দোলনের সূচনা করেন তিনি। তবে এখন এ বিষয়ে ‘টু-শব্দ’ করছেন না রিজভী আহমেদ।

ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে বিএনপি সরে এসেছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. আবদুল মঈন খান উল্টো প্রশ্ন রেখে ভোরের কাগজকে বলেন, বিএনপি কখন ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল? আমার তো জানা নেই। হতে পারে অনেকেই এ রকম মনে করেন। তিনি বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ বাংলাদেশের এই পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতেই বিএনপি কাজ করে থাকে।

বিএনপির মধ্যে ভারতপন্থি বলে পরিচিত নেতাদের বক্তব্য- প্রতিবেশীকে তো বদল করা যাবে না। তা ছাড়া ভারত এখন সুপার পাওয়ার। যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত তাদের সমীহ করে চলে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সঙ্গে বৈরিতা করে লাভ নেই। এসব নেতার দাবি, ভারত যদি বাংলাদেশের স্বার্থ বহির্ভূত কোনো কাজ করে, বিএনপি তার কঠোর সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কিছু অর্জন করা যাবে না। তাদের মতে, সম্পর্কের পালা পরিবর্তন হয় না এমন তো নয়; ভারত আজ বিএনপিকে সমর্থন করছে না। কিন্তু আগামীকাল যে করবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কী?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। বন্ধুত্ব অনিবার্য দরকার। কিন্তু তারা যদি আমাদের যথাযথ মর্যাদা না দেয়, তাহলে তো বিদ্বেষ থাকবেই। ভারতের উদ্দেশ্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বন্ধুত্ব কি আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে করবেন নাকি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের সঙ্গে করবেন? ১৮ কোটি মানুষের সঙ্গে যদি বন্ধুত্ব হয় সেটা হবে প্রকৃত বন্ধুত্ব। সেটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। শুধু একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে কোনো লাভ হবে না।

সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা হয়েছিল আগেও : ২০১৮ সালের জুনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভারত সফর করেন। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওই সফর শেষে ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকার দেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, পেছনে ফিরে তাকানোর পরিবর্তে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আশি ও নব্বইয়ের দশকের রাজনীতি এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হুমায়ুন কবির আরো বলেন, তারেক রহমান চান আমরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হই। এখন উভয় দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয়। দ্য হিন্দুর ওই সাক্ষাৎকারে বিএনপি সরকারের বিগত আমলগুলোতে ভারত ও বাংলাদেশের খারাপ সম্পর্কের নীতিকে ‘ভুল ও বোকামি’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন হুমায়ুন কবির।

ওই সফরের বাইরেও গত ১৫ বছরে নানাভাবে ভারতের মন গলানোর চেষ্টা করে বিএনপি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ জামায়াতে ইসলামী নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর বিএনপির নীরবতা, প্রায় এক যুগ ধরে জামায়াতের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক তৈরি, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ২০-দলীয় জোটের বাইরে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন, হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি গাঁটছড়া না বাঁধা; এ সবই ভারতকে খুশি করার জন্য করা হয়েছে বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে।

২০১৭ সালের ১০ মে বিএনপির ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’ রূপকল্পে অন্য কোনো রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি না করা এবং কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকারও করা হয়েছিল মূলত ভারতকে খুশি করার জন্য। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ধরা পড়া ১০ ট্রাক অস্ত্রই ভারতের সঙ্গে আজ পর্যন্ত বিএনপির শীতল সম্পর্কের মূল কারণ। সমালোচনা আছে, ধরা না পড়লে ওই অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে যেত- যা দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করা হয়।

কংগ্রেস সরকারের আমলে সংঘটিত ওই ঘটনার পর বিএনপি মনে করেছে, দিল্লিতে ক্ষমতার বদল হলে বাংলাদেশ প্রশ্নেও ভারতের মনোভাবে পরিবর্তন আসবে। এ লক্ষ্যে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে অনেক ধরনের রাজনৈতিক ‘বার্তা’ পাঠানো হয়। চেষ্টা করা হয় সম্পর্কোন্নয়নের। দিল্লির ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে দেশে-বিদেশে বেশ কিছু বৈঠকের খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু মোদি ক্ষমতায় আসার পর ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (প্রতিবেশীরা সবার আগে) পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করে বুঝিয়ে দেন কংগ্রেস জমানার বাংলাদেশ নীতিতে তিনি কোনো পরিবর্তন তো আনবেনই না; বরং ঘরের পাশে এই বন্ধুদেশটি তার সরকারের কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও অতিদ্রুত তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়। অনেকের মতে, মোদি-হাসিনার ওই ঘনিষ্ঠতা এখনো বহাল আছে। ফলে বিএনপির বড় অংশই এখন মনে করা শুরু করে, বিএনপিকে ভারত কখনোই আস্থায় নেবে না। সবশেষ নির্বাচনের পর বিএনপিতে এমন মনোভাবই জোরালো হয়েছে। তবে সম্প্রতি এমন ভাবনা থেকে সরে এসে ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়তে তৎপর বিএনপি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App