×

শেষের পাতা

দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বিএনপি

কাউন্সিলে ভয়, প্রেস রিলিজে কমিটি গঠন

Icon

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 কাউন্সিলে ভয়, প্রেস রিলিজে কমিটি গঠন

কাগজ প্রতিবেদক : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে দলকে ঢেলে সাজাতে জাতীয় কাউন্সিলের দাবি তোলেন বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী। নির্বাচনের পরে দলীয় ফোরামেও জোর দাবি ওঠে কাউন্সিলের। তবে এ ব্যাপারে বরাবরই বিপরীত মেরুতে ছিলেন লন্ডনে অবস্থানরত দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কারণ বিএনপির তৃণমূলে সমালোচনা রয়েছে- শীর্ষ নেতৃত্বের সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনার অভাবে আন্দোলনে বারবার হোঁচট খাচ্ছে দল। তাই এই মুহূর্তে নেতৃত্ব হারানোর ভয়েই তারেক রহমানের দলীয় কাউন্সিল করার ব্যাপারে মত নেই বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে। এর মধ্যেই তিনি দলের কমিটি ভাঙাগড়ার কাজে হাত দিয়েছেন। আকস্মিক কেন এমন সিদ্ধান্ত? নেতৃত্বের টানাপড়েন, নাকি আন্দোলনের ব্যর্থতা? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য হিসাবনিকাশ- শুরু হয়েছে এর চুলচেরা বিশ্লেষণ।

বিএনপির ঢাকাসহ ৪টি মহানগর এবং যুবদল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে। ঘোষণা এসেছে ছাত্রদলের আংশিক কমিটির। বিদেশবিষয়ক কমিটি ভেঙে দিয়ে ‘চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটি এবং স্পেশাল অ্যাসিসট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটি’ নামে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। রদবদল আনা হয়েছে নির্বাহী কমিটির ৩৯টি পদে। দলটির গুরুত্বপূর্ণ এসব ইউনিটের কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা আসে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে। এ নিয়ে সারাদেশে দলের মধ্যে শুরু হয় আলোচনা। কেউ কেউ এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। তৃণমূল পর্যায়ে অনেক নেতাকর্মী এতে খুশি। তবে বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের কেউ কেউ ক্ষুব্ধ। অনেকে আবার এরই মধ্যে নেতৃত্বে আসতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে কমিটি ভাঙাগড়া নিয়ে বিএনপিতে বইছে ‘ঝড়’।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, শিগগিরই বিএনপির অন্যান্য কমিটি ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করা হবে। তবে হঠাৎ করে একসঙ্গে এতগুলো কমিটি ভেঙে দেয়ার বিষয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা কিছুই জানতেন না। এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। সূত্রের দাবি- কাউন্সিল এড়াতেই একক সিদ্ধান্তে তারেক রহমান দল পুর্নগঠন শুরু করেছেন। এসব কমিটির পুনর্গঠনের পেছনে মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেনও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছে ২০১৬ সালের মার্চে। ৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাউন্সিল না হওয়ায় এই কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ৩ বছর পরপর কাউন্সিল করার বিধান দলটির গঠনতন্ত্রে রয়েছে। এখন কাউন্সিল না করে প্রেস রিলিজ (সংবাদ বিজ্ঞপ্তি) দিয়ে কমিটিতে রদবদল আনা হলো।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান যে কাউকেই দলের মধ্যে তার পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারেন কিংবা কাউকে নিয়োগ দিতে পারেন। দলের নেতাদের বড় অংশেরই ধারণা, গঠনতন্ত্রের এই বিধান বলেই নির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে পরিবর্তন এনে ‘আপাত পুনর্গঠন’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন তারেক রহমান।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোরের কাগজকে বলেন, কমিটি বাতিল বা পরিবর্তন আনা দলের নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অংশ। তিনি বলেন, এটা খুব স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যেসব জায়গায় কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে সেখানে নতুন কমিটি আসছে, আরো আসবে। এ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আন্দোলনে ব্যর্থতার নিরিখে নতুন করে দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বড় আকারে এই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা জানান, একটি বৃহত্তর আন্দোলনে বিপর্যয়ের পর দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর বিগত আন্দোলনে বিভিন্ন মহানগর বিএনপিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যে আন্দোলনে ছাত্রদল ও যুবদলের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল। এ দুই সংগঠনকে বিএনপি আন্দোলনের ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে আশা করলেও তা পূরণ হয়নি।

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন যায় লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে। তার আগ্রহে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সেটির ভিত্তিতেই তিনি কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তবে এ লক্ষ্যে তারেক রহমান কিছুদিন ধরে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার আগে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে পৃথক ভার্চুয়াল সভা করেন। সেখানে নেতাদের নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে তাকে সহযোগিতার অনুরোধ জানান।

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। এজন্য বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ড জেনে-বুঝেই কমিটি পুনর্গঠনের কাজে হাত দিয়েছেন।

যুবদলের বিদায়ি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোনায়েম বলেন, ব্যর্থতার জন্য কমিটি বিলুপ্ত করার হয়েছে মনে করি না। দলকে গতিশীল করার জন্য এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর বিএনপি তো আন্দোলনে ব্যর্থ হয়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রের এত নির্যাতনের মধ্যেও বিএনপি মাঠে ছিল। মানুষ যে ভোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এটি তো বিএনপির আন্দোলনেরই সাফল্য।

বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, লন্ডনে থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভার্চুয়ালি উপস্থিতিতে দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় একাধিকবার সব স্তরে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব আসে। এ সময় দলের মহাসচিব নিজেও স্থায়ী কমিটির সভায় সম্মেলন করা এবং দলের সব স্তরে পরিবর্তনের পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে ও পরে আমাদের বহু নেতাকর্মী আটক হয়েছিলেন। যাদের অনেকেই গত কয়েক মাসে মুক্তি পেয়েছেন। নেতাদের জেলে রেখে কমিটি বাতিলের দিকে যাওয়া হয়নি। এখন যেহেতু নেতারা অনেকেই জামিনে বেরিয়ে এসেছেন তাই শীর্ষ নেতৃত্ব হয়তো কমিটি বিলুপ্ত করার জন্য এটাকেই ভালো সময় মনে করেছে। এই নেতার দাবি- তারেক রহমানের নির্দেশনা পেয়েই মহাসচিবকে অবহিত করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়েছে দলের দপ্তর বিভাগ থেকে। তবে দপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ এসব নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

সদ্যবিলুপ্ত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম কমিটি বিলুপ্তিকে ‘দল পুনর্গঠনের চলমান প্রক্রিয়া’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিএনপিতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া সব পদই পরিবর্তনশীল। আমাকে দলের স্বার্থে, আন্দোলনের স্বার্থে যখন যেখানে কাজে লাগাবে, আমি সেখানেই কাজ করব।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App