×

শেষের পাতা

আটক হতে পারেন আরো কয়েক নেতা

Icon

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আটক হতে পারেন আরো  কয়েক নেতা

কাগজ প্রতিবেদক : ঝিনাইদহের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার কলকাতায় খুনের ঘটনায় আরো কয়েকজন আটক হতে পারেন। তারা ঝিনাইদহ ও যশোর এলাকায় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রিমান্ডে থাকা গ্যাস বাবুর দেয়া তথ্যে ও গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মিলিয়ে আটকের অভিযান চালাবে ডিবি। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুকে ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা হত্যাকাণ্ডে তার যোগসূত্র বা সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হতে পারলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। খুনের মামলা কলকাতায় হলেও ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় নিহতের মেয়ের দায়েরকৃত অপহরণ মামলার সূত্রে তদন্ত করছে ডিবি। তদন্তে অপহরণ ও খুনে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে কলকাতা সিআইডিকে তথ্য দেয়া হচ্ছে। ঢাকায় ধৃতদের হত্যা মামলা তদন্ত ও বিচারের প্রয়োজনে জড়িতদের কলকাতা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে বাবা হত্যার বিচার চেয়েছেন আনোয়ারুল আজীম আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। গতকাল বুধবার বিকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেন, অপরাধীদের বাঁচাতে তদবির হচ্ছে। পরে ডরিন সাংবাদিকদের বলেন, কোনো তদবিরের চাপে বাবা হত্যার বিচার যাতে বন্ধ না হয়, সেই দাবি জানিয়েছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছি, আমার বাবা হত্যাকাণ্ডের শিকার; সেটার যাতে সঠিক বিচার হয়, সঠিক বিচারটা যাতে আমাকে নিশ্চিত করা হয়- সেই দাবি জানিয়েছি। ডরিন বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এরই মধ্যে অনেককে আটক করা হয়েছে। আমি শুনেছি, অপরাধীদের বাঁচাতে অনেক জায়গা থেকে তদবির করা হচ্ছে। তাদের যেন ছেড়ে দেয়া হয়, সেজন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো তদবিরের চাপে পড়ে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার যাতে বন্ধ করার চেষ্টা না করা হয়, চাপের মুখে যাতে সঠিক তদন্ত বন্ধ করা না হয়, সেই দাবি জানিয়েছি। আমি যেন সঠিক বিচার পাই। সেটাই বলেছি। ডরিন আরো বলেন, গিয়াস বাবু নামে যাকে আটক করা হয়েছে, তিনি বাবার প্রতিপক্ষ নন। আমাদের সঙ্গে তার কোনো শত্রæতাও নেই।

আমার মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে। গত মাসের ১৭ তারিখে তার সঙ্গে ভাঙায় দেখা হয়েছে। সেখানে একটা টাকা দেয়ার লেনদেনের কথা উঠেছে, যা আমি খবরে শুনেছি। আমার কথা হলো, এ টাকার যোগানদাতা কে? কেন তারা এটা করিয়েছি? আপনারা দেখেছেন, তাকে আটকের আগে থানায় তিনি জিডি করেছেন- তার তিনটি ফোন হারিয়ে গেছে। একই দিনে একজন মানুষের তিনটি ফোন কীভাবে হারিয়ে যায়, সেটাও আমার প্রশ্ন। এগুলো কী পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে, তিনি তো আমার বাবার শত্রæ নন। এই কাজগুলো কে করাচ্ছে, সেটা আমি বারবার বলেছি। তিনি বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি নিয়ে গেছে। অবশ্যই তাদের কাছে সত্যিকারের কোনো তথ্যপ্রমাণ আছে, সেটা আমি নিজেও জানি। সেই প্রমাণের সাপেক্ষেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আসলে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আইনে যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবে যাতে আমার বাবার হত্যার বিচার করা হয়, আমি সেই দাবি জানিয়েছি। আমি শুনেছি, অনেক তদবির করা হচ্ছে। অনেক বড় বড় জায়গা থেকে ফোন আসছে, তাদের ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য। সঠিক বিচারের আশ্বাস দিয়ে তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যেটা আইনে আসবে, যেটা সত্য- সেটার বিচার হবে। আমি বিশ্বাস করি, অপরাধীদের তিল পরিমাণ ছাড় দেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সে আসছে, তার আবেগের কথা বলে গেছে। তার বাবা নিহত হয়েছেন, সে তার বাবার হত্যার বিচার চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। সেটাই সে বলছে যে কেউ যাতে পার না পেয়ে যায় সে বিষয়টি দেখার জন্য। যেটিই তদন্ত আসবে আমরা সেটিই বিশ্বাস করি। তদন্ত যেভাবে করেছেন তাতে কেউ যাতে পার না পেয়ে যায়- সে বিষয়ে অনুরোধ করে গেছে। এ বিষয়ে কোনো চাপ আছে কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কে চাপ দেবে আমাদের, কোনো চাপ নেই। সঠিক পদ্ধতিতে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে আমরা বলতে পারবো কার উদ্দেশ কি ছিল।

অপরদিকে গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গতকাল বলেছেন, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। সে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মিন্টু যদি কোনো সদুত্তর দিতে না পারেন তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর কাছে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিচার বিশ্লেষণের পরেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাইদুল করিম মিন্টুকে ডাকা হয়েছে। মিন্টুর কাছে তথ্যগুলো জানতে চাওয়া হচ্ছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে যদি মিন্টু সদুত্তর দিতে পারেন তবে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আর যদি কোনো প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পারেন তবে তদন্তের ধারাবাহিকতায় যা করার তাই করা হবে। মিন্টুকে গ্রেপ্তার না দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। সে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মিন্টু যদি কোনো সদুত্তর দিতে না পারেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা তখনই আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। হারুন বলেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে নিয়ে আসি। যখন কাউকে নিয়ে আসি অবশ্যই কিছু তথ্য-উপাত্ত থাকে। প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করি। জিজ্ঞাসাবাদে গ্যাস বাবু অকপটে স্বীকার করেন- ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়া ঘাতক শিমুল ভূঁইয়ার সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছিলেন। শিমুল ভূঁইয়া গ্যাস বাবুকে এমপি আনার হত্যার পর ছবি দেখিয়েছেন।

১৬ মে যদি হত্যাকাণ্ডের তথ্য ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু ও গ্যাস বাবু জেনে থাকেন তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তারা কেন জানালেন না- এটিও অপরাধ। এমন প্রশ্নের জবাবে হারুন অর রশীদ বলেন, হ্যাঁ এটি সঠিক। কেন তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয় গোপন করলেন, এটিই জানতে চাওয়া হচ্ছে। এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত দুজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। এমন আরো কতজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে হত্যাকাণ্ডের পেছনে? এই প্রশ্নের উত্তরে ডিবিপ্রধান বলেন, গ্যাস বাবু রিমান্ডে রয়েছেন এবং মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এছাড়াও অনেকের সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। সবকিছু ধীরে-সুস্থে এগোচ্ছি। এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, যারা নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এটাও বলে রাখতে চাই, কারো প্ররোচনায় কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিতে কোনো হয়রানি করা হবে না। তদন্তকারী কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে সব মামলার ঘটনা তদন্ত করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করে না।

উল্লেখ্য, গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার গেদে সীমান্ত দিয়ে ভারতে যান সংসদ সদস্য আনার। ওঠেন পশ্চিমবঙ্গে বরাহনগর থানার মণ্ডলপাড়া লেনে গোপাল বিশ্বাস নামে এক বন্ধুর বাড়িতে। পরদিন ডাক্তার দেখানোর কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। এরপর থেকেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আনোয়ারুল আজীম। বাড়ি থেকে বেরোনোর পাঁচ দিন পর ১৮ মে বরাহনগর থানায় আনার নিখোঁজের বিষয়ে একটি জিডি করেন বন্ধু গোপাল বিশ্বাস। এরপরও খোঁজ মেলেনি তার। ২২ মে হঠাৎ খবর ছড়ায় কলকাতার পাশের নিউটাউন এলাকায় সাঞ্জীবা গার্ডেন্স নামে একটি আবাসিক ভবনের বিইউ ৫৬ নম্বর রুমে সংসদ সদস্য আনার খুন হয়েছেন। ঘরের ভেতর পাওয়া যায় রক্তের ছাপ। তবে ঘরে মেলেনি মরদেহ। এ ঘটনায় ২২ মে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন ডরিন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App