×

শেষের পাতা

ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লব-মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি

রাহুমুক্ত হলো যাত্রামোহন সেনের ঐতিহাসিক বাড়ি

Icon

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাহুমুক্ত হলো যাত্রামোহন  সেনের ঐতিহাসিক বাড়ি

চট্টগ্রাম অফিস : যে জাল দলিলপত্র দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করে চট্টগ্রাম নগরীর রহমতগঞ্জে অবস্থিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত যাত্রামোহন সেনগুপ্তের বাড়িটি দখলে নিয়েছিল জালিয়াতচক্র তা বাতিল করেছেন চট্টগ্রামের একটি আদালত। চট্টগ্রামের প্রথম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. খায়রুল আমিন গত সোমবার ওই আদেশ দিলেও বিষয়টি জানা যায় গতকাল মঙ্গলবার ১১ জুন।

অথচ আদালতের একটি আদেশের কথা বলে তিন বছর আগে ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি যাত্রামোহন সেনগুপ্তের বাড়ি ভেঙে জমিটি দখল করতে চেয়েছিলেন এম ফরিদ চৌধুরী নামে এক ব্যবসায়ী। সেই আদেশ বাতিল করেছে চট্টগ্রামের একটি আদালত। তখন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্তসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ইতিহাস সংরক্ষণবাদীরা আন্দোলন করে সেই দখল ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি সেদিন জীবনের কোনো তোয়াক্কা না করে বুলডোজারের সামনে বসে পড়ে ঐতিহাসিক এই বাড়িটির ভাঙন ঠেকিয়েছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।

মাঠে-ময়দানে এবং আদালতে আইনী লড়াই শেষে অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষী যাত্রামোহন সেনদের বাড়িটি রক্ষার পক্ষে যে রায় পাওয়া গেছে তাতে অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রানা দাশগুপ্ত গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভোরের কাগজকে বলেন, ‘এই রায়ের ফলে ঐতিহাসিক এই বাড়িটি রাহুমুক্ত হলো। সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে অবিলম্বে এটিকে বিপ্লবী ও মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।’ তবে এর প্রাচীন ঐতিহাসিক অবকাঠামো যতটুকু অবশিষ্ট আছে তা যেন সংরক্ষণ করা হয়- এমন দাবিও তোলেন এই প্রবীণ আইনজীবী।

এই সম্পত্তির জাল দলিলপত্র তৈরি করে তার মাধ্যমে আদালতকে বিভ্রান্ত করে জমির মালিকানার জন্য আদালতের ডিক্রি নেয়া ও সেই মূলে হঠাৎ করে এই অমূল্য ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভেঙে বেদখল করার প্রক্রিয়াসহ সে সময় চট্টগ্রামবাসীর আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, ‘জাল নথিপত্র তৈরি করে ব্যবসায়ী এম ফরিদ চৌধুরী সেই রায় হাসিল করেছিলেন। ২০২১

সালে জমির দখল নিতে এলে ডিক্রি লাভ ও তার ভিত্তিতে জারি মামলায় আদেশ পাওয়ার বিষয়টি সরকারপক্ষ প্রথম জানতে পারে। এরপর সরকার পক্ষে মিস কেস করা হয়। যার ভিত্তিতে আদেশ হয়েছে।’ এই মামলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষের আইনজীবী রুবেল পাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই জমি অর্পিত সম্পত্তি। কিন্তু সরকারকে অবগত না করে দলিল বানিয়ে একতরফাভাবে ডিক্রি নেয়া হয়েছিল। সেই ডিক্রিটি এখন বাতিল হলো।’

২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি দুপুরে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ এলাকায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত যাত্রামোহন সেনগুপ্তের বাড়িটির দখল নিতে যান ব্যবসায়ী ফরিদ চৌধুরীর লোকজন। ফরিদ চৌধুরীর দুই ছেলে, স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মী, ৪৫ জন পুলিশ সদস্য এবং চট্টগ্রাম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের নাজির আমিনুল হক আকন্দ ‘দখল পরোয়ানা’ সহ কাগজপত্র নিয়ে সেদিন উপস্থিত ছিলেন। সেদিন বুলডোজার দিয়ে ভবনের সামনের অংশ ভেঙে ফেলা হয়। খবর পেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে প্রতিরোধের মুখে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসে ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি সিলগালা করে। সেদিন রানা দাশগুপ্ত দাবি করেছিলেন ‘অপকৌশলে’ ওই জমি নিয়ে আদালতের আদেশ আনা হয়েছে। তিনি বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য সরকারে কাছে দাবি জানিয়েছিলেন। এরপর জেলা প্রশাসকের পক্ষে আইনজীবী ফখরুদ্দীন জাবেদ ২০২১ সালে চট্টগ্রামের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন।

অনেক ইতিহাসের স্বাক্ষী এই বাড়ি : বিভিন্ন ঐতিহাসিক কাগজপত্র ঘেঁটে ও চট্টগ্রামের প্রবীণ নাগরিকদের কাছ থেকে জানা যায়, ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা যাত্রামোহন সেনগুপ্ত এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। চট্টগ্রামের এই আইনজীবীর ছেলে হলেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। ব্যারিস্টার যতীন্দ্রমোহনও ছিলেন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের নেতা। তিনি কলকাতার মেয়র হয়েছিলেন। স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তাকে নিয়ে কিছু দিন ভবনটিতে ছিলেন তিনি।

আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের আন্দোলন, মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎ বসু, মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময় এই বাড়িতে এসেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীরাও এই বাড়ির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সূর্য সেন, অনন্ত সিংহ, অম্বিকা চক্রবর্তীর হয়ে মামলা লড়েছিলেন যতীন্দ্রমোহন। সেজন্য তিনি ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলে পড়েন। ১৯৩৩ সালে কারাগারে মৃত্যু হয় তার।

নেলী সেনগুপ্তা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত রহমতগঞ্জের বাড়িটিতে ছিলেন। পরে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। ফিরে দেখেন বাড়িটি বেদখল হয়ে গেছে। ১৯ গন্ডা এক কড়া পরিমাণ জমিটি পরে শত্রæ সম্পত্তি ঘোষিত হয়। এর মধ্যে ১১ গন্ডা ২ কড়া জমি ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে ‘বাংলা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন শামসুদ্দিন মো. ইছহাক নামের এক ব্যক্তি। ১৯৭৫ এর পর নাম বদলে সেই ভবনে ‘শিশুবাগ স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

আইনজীবীরা বলছেন, ওই সম্পত্তি অর্পিত সম্পতি প্রত্যর্পণ আইনের অধীনে ‘ক’ তফসিলের সম্পত্তি। ফলে ওই জমি কারো পক্ষেই বিক্রি করা সম্ভব নয়। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বাড়িটি ভাঙায় নিষেধাজ্ঞা দেয় চট্টগ্রামের একটি আদালত। আন্দোলনের মুখে ওই বছরের ২৩ জানুয়ারি বাড়িটি ‘দখলদার মুক্ত’ করে এর নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রামের ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি সাংবাদিক আলীউর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, এই বাড়িটির একটি প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহ্য যেমন রয়েছে তেমনি এটি এ অঞ্চেলের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে আছে। তাই এটিকে অবশ্যই পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের পাশাপাশি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App