×

শেষের পাতা

আঁচলে ঘরের চাবি, চোখে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন

Icon

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 আঁচলে ঘরের চাবি, চোখে  ভাগ্য বদলের স্বপ্ন

ইমরান রহমান, কক্সবাজার থেকে : স্বামী পরিত্যক্তা রুখছানা বেগম। এক মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন ভাড়া বাড়িতে। স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর শ্রমিক হিসেবে বীজবপন, মাটি কাটার মতো কাজ শুরু করেন। যা উপার্জন হয় তা দিয়ে পরিবারের খরচই চলে না। নূন আনতে পান্তা ফুরানো জীবনে কখনো একখণ্ড জমি ও ঘরের মালিক হবেন- কল্পনাতেও আসেনি তা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়ে আনন্দের সীমা নেই তার। নিজের ঘরে ঘুমাবেন- এই স্বপ্নতো যুগ যুগের। তাইতো নিজ ঘরের চাবি পরম যতেœ আঁচলে বেঁধে রেখেছেন। বুকে আগলে রেখেছেন জমির দলিল। নিজ ঘরে প্রবেশের তর যেন সইছে না। সঙ্গে থাকা সন্তানরাও অধীর আগ্রহে মায়ের আঁচলের চাবি ছুঁয়ে দেখছে বারবার। অনুভূতি জানতে চাইলে রুখছানা বেগমের ঝটপট উত্তর- শুনেছি যারা আশ্রয়ণের ঘর পেয়েছে তারা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছে। আমিও প্রশিক্ষণ নিয়ে জীবনকে নতুনভাবে শুরু করব।

শুধু রুখসানা বেগমই নয়, গতকাল ঘরের দলিল বুঝে পাওয়া প্রতিটি উপকারভোগীর চোখে-মুখেই ছিল উচ্ছ¦াস আর ভাগ্য বদলের স্বপ্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘর হস্তান্তরের পর সবাই দৌড়ে নিজ নিজ ঘরের কাছে যান। বহুদিনের লালিত স্বপ্নের ঠিকানা ঘুরে দেখেন। ঘরের কোথায় কী আসবাবপত্র রাখবেন, বাইরে কোথায় কোন গাছ লাগাবেন- সেই পরিকল্পনা করতে থাকেন। ভাসমান জীবনে তিল তিল করে গড়ে তোলা ছোট সংসারের মালপত্রও নিয়ে আসেন অনেকে। আবার অনেকে কিছুদিন আগেই ঘরে উঠে বেশ সাজিয়ে গুছিয়েও ফেলেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার ভিডিও কনফারেন্সে কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার ভাদীতলা পূর্ব দরগাপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে যুক্ত হয়ে উপহারভোগীদের ঘরের দলিল হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন ৫ম পর্যায়ের ২য় ধাপে নির্মিত কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৭৫টি, ঈদগাঁও উপজেলায় ১৪৬টি এবং মহেশখালী উপজেলায় ৪০টিসহ সর্বমোট ২৬১টি ঘর হস্তান্তর করা হয়। এরপরই কক্সবাজারকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় উপকারভোগীদের দুঃখ কষ্ট ও ঘর পাওয়ার অনুভূতি জানতে চান তিনি। উপকারভোগীরাও প্রধানমন্ত্রীকে ‘যোগ্য বাবার যোগ্য কন্যা’ সম্বোধন করে তাদের মনের কথা তুলে ধরেন।

এর আগে ঘর বুঝে নিতে সকাল থেকেই পূর্ব দরগাপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে করা প্যান্ডেলে উপস্থিত হন উপকারভোগীরা। ঘরের দলিল বুঝে পাওয়ার পর উল্লাস করতে করতে স্বপ্নের ঠিকানায় যেতে দেখা যায় তাদের। এ যেন ঈদের আগেই তাদের জন্য আরেক ঈদের আনন্দ বয়ে এনেছে।

পূর্ব দরগাপাড়া আশ্রয়ণে গিয়ে দেখা হয় উপকারভোগী সত্তরোর্ধ্ব আমান উল্লাহর সঙ্গে। লম্বা গড়নের মানুষটির মুখভর্তি দাড়ি। কঠোর পরিশ্রম ও বয়সের ছাপ পুরো শরীরে। তার ঘরের পাশেই পাহাড়। এর সঙ্গে জীবিকা আর জীবনকে

গেঁথেছেন একসূত্রে। দেশে প্রতি বছর কতই না উৎসব আসে। কিন্তু সেই উৎসবের ছিটেফোঁটাও লাগতো না তার খুপরি ঘরে। ঈদ এলে ঘরের সামনে বসে গ্রামভরা মানুষের উচ্ছ¡াস দেখতেন। জীবনযুদ্ধে হাঁপিয়ে ওঠা এই বৃদ্ধের দিন কাটতো সুনসান নীরবতায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়ে সবই যেন বদলে গেছে তার। নিজের মতো করে ঘর সাজিয়েছেন। সামনের ফাঁকা জায়গায় চাষ করছেন বিভিন্ন সবজি। পালছেন হাস-মুরগিও। গতকাল ঘরের দলিল পেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে আমান উল্লাহর পুরো পরিবার।

আশ্রয়ণের ঘর পেয়ে আবেগে আপ্লæত হয়ে পড়েন স্বামী পরিত্যক্তা হোসনে আরা বেগম। তিনি ভাদীতলা পূর্ব দরগাপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে যায়। দুই মেয়েকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটতো আমার। বাসাবাড়িতে কাজ করতাম। মরে যেতে ইচ্ছা করত। সন্তানের মুখের দিক তাকিয়ে আর পারিনি। কেউ কোনো সাহায্য করেনি। আপনিই সাহায্য করেছেন, পাকা ঘর দিয়েছেন। দুই মেয়ে নিয়ে আপনার দেয়া ঘরে থাকি। আপনার জন্য, আপনার ছেলেমেয়ের জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করি। আপনার হাতে দেশ থাকলে আমরা সুরক্ষিত থাকব।’

এ সময় প্রধানমন্ত্রী হোসনে আরার কাছে তার বড় মেয়ের বয়স কত এবং ভাতা পান কিনা জানতে চান। উত্তরে ভাতা পাওয়ার কথা জানান হোসনে আরা। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩০ হাজার টাকার ক্ষুদ্র ঋণ পাবেন।

একই আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে সুবিধাভোগী জেলে রবিউল আলম বলেন, ‘সাগরে যখন ঝড় হয়, তখন মাছ ধরতে পারি না। একবেলা খেতাম, আরেক বেলা না খেয়ে থাকতাম। এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সরকারি ত্রাণের চালও পাই।’ তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে আমার মতো গরিব অনেকে ঘর পেয়েছেন। তখন সন্তানরা বলত- বাবা, সবাই ঘর পায়, আমরা পাব না? আজ (গতকাল) আপনার উপহারের ঘর আমিও পেয়েছি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখন ভালো আছি। সন্তানদের পড়ালেখা করাতে পারি।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী রবিউলকে বলেন, সন্তানদের লেখাপড়া শেখান। এদের লেখাপড়া যাতে বন্ধ না হয়।

বক্তব্যের পর কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের আয়োজনে নৃত্য পরিবেশন করেন একদল স্থানীয় নৃত্যশিল্পী। শিল্পীরা গানে গানে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের অপরূপ সৌন্দর্যের নানান দিক তুলে ধরেন। এতে মুগ্ধ হন প্রধানমন্ত্রী, ইচ্ছা পোষণ করেন মহেশখালীর পান খেতে আসার।

ভূমিহীন-গৃহহীনমুক্ত ঘোষণার বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহম্মদ শাহীন ইমরান ভোরের কাগজকে বলেন, ১৯৯৭ সালে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেন্টমার্টিন পরিদর্শনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন তিনি সেখানে ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়ণের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই আশ্রয়ণ পূর্ণতা পেয়েছে আজ (গতকাল)। পুরো কক্সবাজার জেলায় ৪ হাজার ৯২৫টি ঘর উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা করা হলো। নতুন করে যদি কেউ গৃহহীন হন, তাকেও পরবর্তী সময়ে ঘর দেয়া হবে। ডিসি আরো বলেন, কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলায় নির্মাণ হওয়া বিভিন্ন আশ্রয়ণের দেড় হাজারেও বেশি উপকারভোগীকে হাঁস-মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, মাছচাষ, সবজিচাষ, অর্গানিক সবজি উৎপাদন, সেলাই ও ব্লক বাটিক প্রশিক্ষণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও হস্তশিল্প বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। অনেকে এই প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদল করেছেন। তাদের দেখে নতুন যারা ঘর পেল তারাও নিজেদের ভাগ্য বদলে উৎসাহিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App