×

শেষের পাতা

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প

‘সুখের সূর্যে’ আলোকিত রত্না ও মমতাজদের স্বপ্নের ঠিকানা

আজ কক্সবাজারকে ভূমিহীন-গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা করবেন প্রধানমন্ত্রী

Icon

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘সুখের সূর্যে’ আলোকিত রত্না ও মমতাজদের স্বপ্নের ঠিকানা

ইমরান রহমান, কক্সবাজার থেকে : দুই যুগ আগে স্বামী বাবুল ধর বিচ্ছেদ ঘটিয়ে আরেকটি বিয়ে করেন। সেই থেকে ৩ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় রতœা ধরের জীবন সংগ্রাম। অন্যের বাড়িতে বুয়ার কাজ করে অনেক কষ্টে সন্তানদের বড় করতে থাকেন। যে সন্তানদের ঘিরে এত ত্যাগ ও সংগ্রাম, তাদের মধ্যে বড় দুই ছেলে একসময় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। মেয়েরও বিয়ে হয়ে যায়। এরপর ছোট ছেলেকে নিয়ে চলতে থাকে তার সংগ্রাম। কিন্তু যা আয় করেন, ঘর ভাড়া দেয়ার পর মাস চালিয়ে নেয়া দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। দুঃখে ভরা রতœার জীবনে নিজের একখণ্ড জমি কেনা এবং সেখানে ঘর নির্মাণ করা সোনার হরিণের মতোই হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে জমিসহ ঘর উপহার পেয়ে রতœার ভাসমান জীবনের অবসান ঘটে। জীবন সংগ্রামও মোড় নেয় অন্যদিকে।

রঙিন টিন আর দেয়ালে ঘেরা আঙ্গিনায় নিজেকে সাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করেন। বুয়ার কাজ ছেড়ে শুরু করেন ছাগল পালন ও সবজি চাষ। এর ফাঁকে মাটি কাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ছেলেও কাজ করতে থাকে বিভিন্ন দোকানে। একপর্যায়ে কিছু টাকা জমিয়ে ও ঋণ নিয়ে ছেলেকে ঘড়ির দোকান দিয়ে দিয়েছেন। নিজেও অব্যাহত রেখেছেন ছাগল পালন ও সবজি চাষ। অভাব কেটে যাওয়ায় ঘরে এলইডি টেলিভিশন, ফ্রিজ, রাইসকুকারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র করেছেন। সব মিলিয়ে সুখের সূর্য ধরা দিয়েছে রতœা ধরের জীবনে। যে আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠেছে তার ঘর। এখন ছেলেকে বিয়ে দিতে পাত্রী খুঁজছেন তিনি। মমতাজ বেগমেরও একই রকম জীবন সংগ্রাম ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। ভাড়া বাসায় জীবন কাটানোর সময় কষ্টের শেষ ছিল না। অভাবের তাড়নায় পরিবারের আয়ের একমাত্র অবলম্বন স্বামী নূরু মোহাম্মদের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। আশ্রয়ণের ঘর উপহার পাওয়ার পর প্রশিক্ষণ পেয়েছেন সেলাই কাজের। এখন সেলাইয়ের কাজ করার পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে ঘুরে থ্রি-পিস বিক্রি করেন। স্বামীকে আবারো কিনে দিয়েছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীর মাসিক আয় ১৮-২০ হাজার টাকা। দুই সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করাই এখন একমাত্র লক্ষ্য তাদের। সেজন্য ছেলে ও মেয়েকে স্কুলেও ভর্তি করিয়েছেন।

শুধু রতœা ধর ও মমতাজ বেগম নয়, এভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অনেক গল্প শোনা যায় কক্সবাজারের উখিয়ার আদর্শগ্রাম টিএনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে। সরজমিন দেখা গেছে, হাস-মুরগি-গরু-ছাগল পালন, সবজি চাষ ছাড়াও বিভিন্নভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করছেন এখানকার বাসিন্দারা। অনেকে ইতোমধ্যে আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন, অনেকে স্বাবলম্বী হওয়ার স্রোতের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন। সবারই জীবনে একটিই লক্ষ্য, ভাসমান জীবনের দুর্বিষহ অতীত মুছে ফেলে নতুন করে জীবনকে

সাজানো। আর এর পেছনে স্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁইকে আশির্বাদ হিসেবে দেখছেন সবাই।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলার ৯টি উপজেলায় ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯২৫। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ এবং ৫ম পর্যায় (১ম ধাপ) পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৬৬৪টি পরিবারকে ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলার ৬টি উপজেলাকে (চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া) ভূমিহীন-গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি ৫ম পর্যায়ের ২য় ধাপে কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৭৫টি, ঈদগাঁও উপজেলায় ১৪৬টি এবং মহেশখালী উপজেলায় ৪০টিসহ সর্বমোট ২৬১টি ঘরের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যা উপকারভোগীদের মাঝে হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী। আর এর মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত হবে কক্সবাজার জেলা।

টিএনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, দুই বছর আগে ঘর বুঝে পাওয়া বাসিন্দারা নিজ আঙ্গিনা সাজিয়েছেন বিভিন্ন ফুল ও ফলের গাছ লাগিয়ে। ঘরের বারান্দায় পালন করছেন হাঁস-মুরগি। এক কোণে গবাদিপশুও পালছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে সবজিও চাষ করছেন। ঘরের চালাকে ব্যবহার করে লাউ ফলাচ্ছেন। আশ্রয়ণটি টিলার উপরে হওয়ায় অনেকে টিলার ঢালে কৃষিকাজ করছেন।

৩ নম্বর ঘরে থাকেন শ্রেয়া দত্ত। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ভাড়া বাসায় অপমান অপদস্থ হয়েছি অনেক। কারো গাছের দিকেও তাকাতে পারতাম না। এখন আমি মনমতো গাছ লাগিয়েছি। বাসা ভাড়ার টাকা জমিয়ে প্রতিবন্ধী মেয়ের চিকিৎসা করাব। উপহারভোগী সুখা বড়–য়া বলেন, স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার পর দুই ছেলেকে নিয়ে অসহায় জীবন পার করেছি। এই ঘর পাওয়ার পর আমার ভাগ্য বদলে গেছে। কিছুটা পড়ালেখা জানা থাকায় কৃষি কাজের প্রশিক্ষণ শেষে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে জমি লিজ নিয়ে আলু, বরবটি, কাঁচা মরিচসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করছি। এখানকার মানুষই আমার কাছ থেকে এসব কিনে নেন। জৈব সারের বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ভালো ফলাফল করতে থাকায় একটি এনজিওতে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরিও পেয়েছি। এখন জীবনে অভাব বলতে কিছু নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে সম্প্রীতির জায়গাটাও বেশ দৃঢ়। সব ধর্মের লোক মিলেমিশে আমরা বসবাস করছি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তানভীর হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, টিএনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৮৮টি ঘর রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি ঘরে হিন্দু ধর্মের ও ২টিতে বৌদ্ধ ধর্মের লোক রয়েছে। সবাই সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করছেন। তিনি আরো বলেন, উখিয়াতে ৪২টি আশ্রয়ণে ৬৬৩টি পরিবার ঘর পেয়েছেন। সব ঘরে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সবার আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সেলাই মেশিন বিতরণ, পশুপালন, বুটিকের কাজ ও সবজি চাষের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ছেলেদের মোবাইল সার্ভিসিংয়ের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যাতে উপার্জন করে খেতে পারে। ঋণ দেয়ার জন্য ক্ষুদ্র সমবায় সমিতি করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম এখানকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

ইউএনও জানান, আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের সন্তানরা যাতে সহজে স্কুলে যেতে পারে সেজন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাচ্চাদের জন্য দোলনাসহ বিভিন্ন উপকরণ দেয়া হয়েছে। এই আশ্রয়ণের পাশেই শেখ রাসেল স্টেডিয়াম করা হবে। সেখানে খেলাধুলার সুযোগ পাবে শিশু-কিশোররা। একটি মসজিদ ও একটি মন্দির তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাতে একটি ক্লাবও করা হয়েছে।

একই চিত্র ঈদগাঁওয়ের পূর্ব দরগাপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেও। এখানেও একটি এনজিওর মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন ক্লাব ঘর করা হয়েছে। রয়েছে অত্যাধুনিক মসজিদও। পার্কের আদলে করা হচ্ছে শিশুদের খেলার জায়গা। এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা নুরুল আফসার ভোরের কাগজকে বলেন, তার বাবা সুরত আলম বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কারণে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তার বাবা ও তাদের নামে ৩২টি মিথ্যা মামলা দেয়া হয়। ওই মামলা চালাতে নিঃস্ব হয়ে যান। ভিটেমাটি বিক্রি করে বিপাকে পড়েন ৬ ভাই ও ৬ বোনের বিশাল পরিবার। অন্যের জায়গায় থাকতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেতে শুরু করেন। পেয়েছেন বীরনিবাসও। পরে ৬ ভাই আলোচনা করে সেই বাড়ি ছোট ভাইকে দিয়েছেন। এরপর সরকার তাকেও মাথা গোজার ঠাঁই হিসেবে এখানে ঘর দিয়েছে। এখন পরিবার নিয়ে অনেক সুখে-শান্তিতে আছেন। কৃষিকাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে টিলার ঢালে ফসল উৎপাদন করছেন তিনি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহম্মদ শাহীন ইমরান ভোরের কাগজকে বলেন, উপকারভোগীদের জন্য নির্মিত প্রতিটি ঘরের সঙ্গে পরিবার প্রতি ২ শতাংশ খাসজমি বিনামূল্যে বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সে হিসেবে কক্সবাজারে ১০০ কোটি টাকা মূল্যের ৯৮.৫০ একর খাসজমি দখলমুক্ত করে এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৬০৪ জন উপকারভোগীকে হাঁস-মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, মাছ চাষ, সবজি চাষ, অর্গানিক সবজি উৎপাদন, সেলাই ও ব্লক বাটিক প্রশিক্ষণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, হস্তশিল্প-বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্মিত গৃহে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ ও সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে মালিকানা দেয়া হয়েছে। এটির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, গ্রামেই শহরের সুযোগ-সুবিধা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে মানবসম্পদ ও পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে পুনর্বাসিত মানুষের জীবন-মানোন্নয়নেও অবদান রাখছে সরকার।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App