×

শেষের পাতা

এমপি আনার হত্যা

সেপটিক ট্যাংকে পাওয়া মাংসের টুকরো মানুষের

Icon

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপটিক ট্যাংকে পাওয়া মাংসের টুকরো মানুষের

কাগজ প্রতিবেদক : কলকাতায় খুন হওয়া ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার তদন্তকালে সঞ্জীবা গার্ডেন্সের সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার মাংসের টুকরোগুলো মানুষের বলে জানা গেছে। টুকরো মাংসের ফরেনসিক পরীক্ষার পর তা মানুষের বলে ল্যাব সংশ্লিষ্টরা কলকাতা সিআইডি তদন্ত টিমকে জানিয়েছে। তবে সেটি এমপি আনারেরই কিনা- তা এখনো নিশ্চিত নয়। ডিএনএ পরীক্ষার পরই সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বলেছেন, আনারের মরদেহ শনাক্ত হলে অনেক কিছুই প্রকাশ করা সম্ভব হবে। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার একটি খাল থেকে হাড় উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন সত্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। সেই কাছাকাছিটা কতদূর- এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা তো এখনো বলছি সত্যের কাছাকাছি এসে গিয়েছি। ডেডবডিটা সুনিশ্চিত হলেই আপনাদের কাছে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারব। তিনি বলেন, যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের নিজের মুখে আমরা যা শুনেছি, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে তারা যা বলেছে, তারা মরদেহকে অনেক খণ্ড-বিখণ্ড করেছে। সেগুলো কোথায় রেখেছে প্রথমে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী এবং ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীও সেখানে গিয়েছিল। যেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো ডিএনএ টেস্ট ছাড়া বোঝা যাবে না, সুনিশ্চিত হতে পারব না এগুলো আমাদের সংসদ সদস্যের দেহাংশ কিনা। ডিএনএ টেস্টের পরই বলতে পারব এ মাংস খণ্ড তার কিনা।

ঝিনাইদহে বাবু নামের একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী বলেন, তদন্তটা শেষ হোক; অনেকেই হয়তো গ্রেপ্তার হতে পারেন। তদন্তের আগে মনে হয় এগুলো বলা ঠিক হবে না। আনার হত্যার মূল আসামি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই। আবার খুনের ঘটনা কলকাতায়। সেক্ষেত্রে আসামিদের বিচার ভারতে নাকি বাংলাদেশে হবে- এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান খান বলেন, দুটি মামলা হয়েছে। যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানে একটি মামলা হয়েছে, সেটা হতেই হবে। সংসদ সদস্যের কন্যা ঢাকায় একটি মামলা করেছেন। কাজেই এ ঘটনাগুলোতে দুই দেশই সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু ভারতে ঘটনাটি ঘটেছে ফলে আসামিকে ফেরত আনা বা বন্দি করার দায়িত্ব সেদেশেরই। আমি যতটা জানি ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে। সেক্ষেত্রে সে সুবিধাটা ভারত সরকার মনে হয় পাবে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার কি

দুদেশেই হবে- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে যে অংশটুকু সেই অংশটুকুর বিচার অবশ্যই হবে। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে যে দেশে সে দেশের আইন অনুযায়ী সেখানে বিচার হবে।

এদিকে এমপি আনার খুনের তদন্তে ঢাকার ডিবি নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছে। এ ঘটনায় আলোচিতরা ছাড়াও খুনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত আরো কয়েকজনের নাম পেয়েছে ডিবির টিম। এর মধ্যে রিমান্ডে থাকা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা গ্যাস বাবুর তিনটি মোবাইল ফোন সূত্রে মিলেছে তদন্তে সহায়ক তথ্য। এতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরো কয়েকজনের ব্যাপারে তথ্য মিলেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।

সূত্র বলছে, ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সঞ্জীবা গার্ডেন্সের সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার মাংসের টুকরোগুলো মানুষের। উদ্ধার মাংস ও হাড়গোড় এমপি আনারের কিনা তা জানতে এখন ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। সেক্ষেত্রে এমপি আনারের মেয়ে অথবা তার ভাইয়ের রক্তের নমুনা নেয়া হতে পারে। সে কারণে বাংলাদেশে অবস্থানরত এমপি আনারের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কলকাতা সিআইডি।

অন্যদিকে রিমাণ্ডে থাকায় গ্যাস বাবু ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে ওই অঞ্চলে কার কার সঙ্গে আনারের বিরোধ ছিল তার তথ্য দিয়েছেন। নীরব বিরোধের কারণও জানিয়েছেন তিনি। খুনের পরিকল্পনায় আখতারুজ্জামান শাহীনের সঙ্গে আরো কয়েকজনের নাম জানিয়েছেন তিনি। এমনকি খুনের পরিকল্পনা করে এ বিষয়ে শাহিন তার বড় ভাই কোটচাঁদপুর পৌর মেয়র শহীদুজ্জামান সেলিমকে ইঙ্গিত দিয়েছিল বলেও জানা গেছে। নিহতের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন ঘটনার পরই মেয়র সেলিমকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত মে মাসে কলকাতায় গিয়ে খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ারুল আজীম আনার। অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তির সূত্র ধরে জানা যায়, হত্যার পর টুকরো টুকরো করা হয় এমপি আনারের নিথর দেহ। এরপর মাংসের টুকরো ফেলা হয় সঞ্জীবা গার্ডেন্সের কমোডের ভেতর এবং পার্শ্ববর্তী বাগজোলা খালে ফেলা হয় হাড়গুলো। টানা অভিযান চালিয়ে গত রবিবার কলকাতার কৃষ্ণমাটি সেতুসংলগ্ন এলাকার বাগজোলা খাল থেকে কিছু হাড় উদ্ধার করেছে সিআইডি। সঙ্গে ছিল পুলিশ ও নৌবাহিনীর ডিএমজি টিম। উদ্ধার হাড়গুলো মানুষের নাকি অন্য কোনো প্রাণীর, তা জানতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। মানুষের হলে সেগুলো এমপি আনারের কিনা তা নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হতে পারে।

এমপি আনার হত্যা মামলার তদন্তে কলকাতায় গিয়ে সঞ্জীবা গার্ডেন্সের সেপটিক ট্যাংক ভাঙতে অনুরোধ জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান হারুন অর রশীদ। সেই অনুসারে সেপটিক ট্যাংক ভেঙে গত ২৮ মে বেশ খানিকটা মাংসের টুকরো উদ্ধার করে সিআইডি। পচে যাওয়া মাংসের টুকরোগুলো মানুষের কিনা তা জানতে পাঠানো হয় ফরেনসিক পরীক্ষায়। তখন হারুন অর রশীদ বলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইডিকে অনুরোধ করে কমোড, সেপটিক ট্যাংক ও স্যুয়ারেজ লাইন পরীক্ষা করা হয়। এরপরেই সেপটিক ট্যাংক থেকে কয়েক টুকরো মাংস পাওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার হওয়া মাংস এমপি আনারের মনে করা হলেও এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হতে ফরেনসিক এবং ডিএনএ টেস্ট জরুরি। নমুনা এরই মধ্যে সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে (সিএফএসএল) পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্টও করা হবে।

জামিন মেলেনি শিমুল-তানভীরের : আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ মামলার অন্যতম আসামি সৈয়দ আমানুল্যা আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া ও ফয়সাল আলী সাজী ওরফে তানভীর ভূঁইয়ার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিনা হকের আদালতে উভয়ের আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক তাদের জামিন নামঞ্জুর করেন।

এরআগে গত ২৩ মে সৈয়দ আমানুল্যা আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল আলী সাজী ওরফে তানভীর ভূঁইয়া ও সেলেস্টি রহমানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুই দফায় তাদের ১৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তারা তিনজনই ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App