×

শেষের পাতা

নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদ আলোচনা

অর্থনীতির সব খাতই এখন সংকটে

Icon

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ প্রতিবেদক : দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতই এখন সংকটে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেছেন, রেমিট্যান্স ইতিবাচক ধারায় নেই, রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও আশাব্যঞ্জক নয়। এর আগেও এসব সংকট ছিল, কিন্তু তখন প্রকাশ পায়নি। এখন রিজার্ভ সংকট, সামগ্রিক অর্থনীতিতে মন্দা, তাই এগুলো প্রকাশ পাচ্ছে। আগে নেতিবাচক দিকগুলো সামাল দেয়া গেলেও এখন সামাল দেয়া কঠিন।

গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনামের সভাপতিত্বে এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

দেশের ব্যাংক খাত নিয়ে ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতি একটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় বাজেট উত্থাপন হয়েছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। ব্যাংক খাতের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম আর খেলাপির পাল্লা ভারি হচ্ছে। দুর্নীতি, অর্থ পাচার আর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। কোটি কোটি টাকা তছরুপ হচ্ছে। আবার টাকাও জমা হয়, রাতারাতি সে টাকাও উধাও হয়ে যায়।

তিনি বলেন, বাজেটের অবস্থা দেখলে বোঝা যায় রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে নিম্নতম হারের দিকে আমরা অবস্থান করছি। এর সঙ্গে রয়েছে আইএমএফের চাপ আর নানা ভর্তুকির বোঝা। রাজস্ব আহরণের হার নিম্নমানের হলেও এ বিষয়টি সব সময়ই অবহেলায় ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকের ওপর আরো চাপ বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ছাপিয়ে দেয়া আর ঋণ নেয়া- এগুলো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। এর মধ্যেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এ খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের সংকট আরো ঘনীভূত করছে। এতে ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দেয়া বন্ধ করতে বাধ্য হবে। ব্যাংক থেকে ছোট উদ্যোক্তারা তো ঋণই পাবে না।

দেশের শীর্ষ এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ করতে পারিনি, বাজেটেও এর প্রতিফলন হয়নি। ব্যাপক অপচয় হচ্ছে, এখানে আস্থা তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, একজন ব্যাংকে টাকা রাখলেন আবার রাতারাতি ব্যাংক থেকে সেই টাকা উধাও করে ফেললেন, এটা কীভাবে সম্ভব হয়। স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগের পাশাপাশি বিএফআইইউকে (বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) কাজে লাগাতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এবারের বাজেট প্রণয়নে অলিগার্ক বা লুটেরা গোষ্ঠীর কথা শুনেছেন অর্থমন্ত্রী, যারা ক্ষমতার প্রশ্রয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এই শ্রেণিগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। আবার এই বিশেষ শ্রেণির কথা চিন্তা করে অর্থনীতিতে সংস্কার ও ব্যাংক খাত নিয়ে তেমন আলোচনা করা হয়নি।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী তিন শ্রেণির কথা শুনেছেন। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কথা শুনেছেন। আইএমএফ বলেছে, এবার বেশি উচ্চাকাক্সক্ষী বাজেট করা যাবে না। কারণ সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) বের হওয়ার প্রস্তুতিও থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, অলিগার্ক বা লুটেরাগোষ্ঠীর কথা শুনেছেন। তৃতীয়ত, এবারের বাজেট গতানুগতিক বাজেট। এতে মনে হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী আমলাদের কথা শুনেছেন। আমলাদের সুযোগ-সুবিধার যেন কমতি না হয়।

তবে কার কথা শোনেননি অর্থমন্ত্রী এমন ব্যাখ্যাও দেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। এই দুই শ্রেণি হলো- পরিশ্রমী উদ্যোক্তা এবং পরিশ্রমী কর্মী। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা মোকাবিলায় বাজেটের আকার কিছুটা কমানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রায় সবাই সংকটে আছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার বাজেটের লক্ষ্যটি কাগুজে লক্ষ্য ছাড়া আর কিছু নয়। মূল্যস্ফীতি কমানোর কোনো কৌশল নেই। কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটে তেমন বিশ্বাসযোগ্য কর্মকৌশল নেই। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে। এ দেশের বিনিয়োগকারীরা পরিশ্রম করতে রাজি আছেন। কিন্তু আস্থার পরিবেশের অভাব আছে। বাজেটে সৎ করদাতাদের জন্য ৩০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। আর কালো টাকার জন্য ১৫ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে। মোটরসাইকেলে কর বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু ইউএনওদের বিলাসবহুল গাড়ির সুবিধা কমানো হয়নি।

বাজেটের ব্যয় খাত সংকুচিত করা হয়েছে, কিন্তু ব্যয় কমানো হয়নি বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি প্রশ্ন তোলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দরকার আছে কি? আমার তা মনে হয় না। সরকার যদি একটু নির্মোহভাবে চিন্তা করে, দেশে এত মন্ত্রণালয় থাকার দরকার নেই। যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি মন্ত্রণালয়, অথচ আমাদের এখানে ৫০ থেকে ৬০টি। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানো ও মুদ্রানীতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। মূল্যস্ফীতি কমানো বাজেটের বিষয় নয়, যদিও বাজেট সেখানে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে। গত বছরের তুলনায় এ বাজেট সংকোচনমুখী হয়েছে। এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতি কমবে। সুদের হার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে এবং এটাই যদি দেড়-দুই বছর আগে করা হতো, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ এখন কম থাকত। তিনি বলেন, সুদের হার দেরিতে বাজারভিত্তিক করার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপও কমবে দেরিতে। তারপরও জিনিসপত্রের দাম কমবে না, তবে মূল্যবৃদ্ধির হার কমবে।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে সেøাগান দিয়ে বাজেট করা হয়েছে, তার আগে সরকারের নীতি পর্যালোচনায় স্মার্টনেস দরকার বলে মনে করেন আহসান মনসুর। তিনি বলেন, আমরা চাই স্মার্ট সংস্কার কর্মসূচি, সেটা রাজস্ব নীতিতে, রাজস্ব প্রশাসনে। অথচ সেখানেই দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। স্মার্ট বাংলাদেশের শুরুটা যেন সরকারের দিক থেকেই হয়, তাহলে জনগণ এমনিতেই স্মার্ট হয়ে যাবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App