×

শেষের পাতা

ছয় দফা দিবসের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী

গুঁজে রাখা টাকা উদ্ধার করতেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

Icon

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 গুঁজে রাখা টাকা উদ্ধার করতেই  কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

কাগজ প্রতিবেদক : বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে ‘মাছ ধরতে আধার দেয়ার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, কালো টাকা নিয়ে একটা প্রশ্ন এসেছে। অনেকে বলে তাহলে আর কেউ ট্যাক্স দেবে না। বিষয়টা কিন্তু তা নয়। এটা শুধু কালো টাকা নয়। জিনিসের দাম বেড়েছে। এখন এক কাঠা জমি আছে যার, সে-ই কোটিপতি। এখন সরকারি দামে কেউ জমি বিক্রি করে না। বেশি দামে করে। বাড়তি টাকা গুঁজে রাখে। গুঁজে যেন না রাখে, সামান্য কিছু একটা দিয়ে টাকাটা পথে আসুক। জায়গামতো আসুক। তারপর তো ট্যাক্স দিতে হবে। আমি ঠাট্টা করে বলি, মাছ ধরতে তো আধার দিতে হয়। সেরকম একটা ব্যবস্থা এটা। এটা আগেও হয়েছে। অন্তত টাকাটা উদ্ধার করা হোক। সেই ব্যবস্থাটাই নেয়া হয়েছে।

ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকালে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করেন। আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন- আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শাজাহান খান, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সবুর, কেন্দ্রীয় সদস্য ও হুইপ অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উত্তরের সাধারণ সম্পাদক ও বিজিএমইএ সভাপতি এস এম মান্নান কচি এবং ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পনিরুজ্জামান তরুণ। আলোচনা সভা যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ ও উপপ্রচার সম্পাদক সৈয়দ আবদুল আউয়াল শামীম।

বাজেটের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি আমলে সর্বশেষ বাজেট ছিল মাত্র ৬২ হাজার কোটি টাকার। কেয়ারটেকার সরকার দিয়ে গিয়েছিল ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট। আর আমরা এবার ৭ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে সক্ষম হয়েছি। এই বাজেটে মানুষের মৌলিক চাহিদা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, দেশীয় শিল্প ও সামাজিক নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, যা মানুষের জীবনকে উন্নত করবে। মানুষের প্রয়োজনটাকে আমরা আগে মেটাতে চাই, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা বাজেট দিয়েছি। খাদ্যপণ্যে আমরা ট্যাক্স কমিয়ে দিয়েছি। গ্যাসের ওষুধের দাম কমবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট ঘাটতি নিয়েও অনেকে কথা বলে। আমি সরকারে আসার পর এটা ২১তম বাজেট দিলাম। সব সময় আমরা ৫ ভাগের মতো বাজেট ঘাটতি রাখি। এবারো ৪ দশমিক ৬ ভাগ রাখা হয়েছে। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ... খোঁজ নিয়ে দেখেন আমেরিকায় বাজেট ঘাটতি কত? উন্নত দেশেও এর থেকে বেশি বাজেট ঘাটতি থাকে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, বিশেষ করে খাদ্যমূল্য। সেখানে উৎপাদন আর সরবরাহ বাড়াতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি মাথায় রেখে আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে চলতে হয়। আমাদের দেশে ‘কিছু ভালো লাগে না’ গ্রুপ আছে, তাদের ভালো না লাগাই থাক। ওগুলোয় কান দেয়ার দরকার নেই। এটা যুগ যুগ ধরে আমি দেখি। এটা নতুন নয়। যখন কোনো অস্বাভাবিক সরকার আসে, তখন তারা খুব খুশি হয়। তাদের নাকি গুরুত্ব থাকে। আর জনগণের ভোটে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাদের কিছুই হয় না, মূল্যায়ন হয় না। এখন মূল্যায়নটা করব কীভাবে? দাঁড়ি-পাল্লা ঠিক করে

সেখানে দাঁড় করিয়ে মাপব না কী? তিনি বলেন, কেয়ারটেকারের সময় তাদের চরিত্র দেখেছি, একটা অগণতান্ত্রিক সরকারকে কীভাবে তেল মারে। আমাদের তো ওই তেল মারা গোষ্ঠীর দরকার নেই। আমাদের শক্তি জনগণ। জনগণ আমাদের ভোট দেয়। জনগণের জন্য কাজ করি, জনগণের কল্যাণ করব- এটাই আমাদের লক্ষ্য। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অনেক জায়গায় অনেক খেলা খেলতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু জনগণই একমাত্র আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে, বিশ্বাস রেখেছে। তাদের ভোটেই আমরা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে একটানা এই চতুর্থবার ক্ষমতায় আছি। একটানা ক্ষমতায় আছি বলেই বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি সম্মান নিয়ে চলতে পারে।

বাঙালির সঙ্গে পাকিস্তানি সরকারের চরম বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষায়-দীক্ষায়, কালচারে, সবদিক থেকে ছিল ওরা পেছনে, আর বাঙালিরা ছিল অগ্রগামী। কিন্তু সেই বাঙালিরাই ছিল বঞ্চিত। সব থেকে ভয়াবহ অবস্থা হলো ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে সব থেকে মজার ব্যাপার হলো সেনাবাহিনীর হোমরা-চোমরা, উঁচু-লম্বা, বিরাট বিরাট অফিসার, কিন্তু পাকিস্তানের লাহোর রক্ষা করেছিল আমাদের বেঙ্গল রেজিমেন্ট বাঙালি সৈন্যরা। সাহসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। ওই লম্বা মোটা পাকিস্তানিরা ভয়েই লেজ গুটিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে যদি বাঙালিরা না থাকত, তাহলে লাহোর আর পাকিস্তানের থাকত না। ওটা ভারতীয়রা নিয়ে যেত।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, পূর্ববাংলার টাকা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান চলত। তারপরেও শোষণ-বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে বাঙালিদের। আর এর প্রতিবাদ করেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, তিন দফা পাকিস্তানের রাজধানী পরিবর্তন হয়, কিন্তু টাকা যায় পূর্ববাংলার। দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল পূর্ববাংলা। বঞ্চনা-বৈষম্যের প্রতিবাদ করলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধুই। আমাদের এখানে নামিদামি অনেক নেতা ছিলেন, তারা বঞ্চনার প্রতিবাদ করেননি। তারা শুধু তেল মারায় ব্যস্ত ছিলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুই সবসময় প্রতিবাদ করেছেন। বাঙালি ছিল অরক্ষিত। এরপরেই তিনি ৬ দফা দাবি উত্থাপন করলেন। জাতির পিতা যখন ছয় দফা দাবি পেশ করতে গেলেন, তখন তাকে বাধা দেয়া হয়েছিল। পেশ করতে দিতে দেয়া হলো না, তখন তিনি ওখানে বসেই প্রেস কনফারেন্স করলেন এবং প্রচার করে দিলেন। তাকে হত্যারও প্রচেষ্টা করা হয়েছে। তিনি ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে আবার এটা প্রচার করেন। পরবর্তী সময়ে ৬ দফা নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার শুরু করেন। বৈষম্য দূর করতে যা যা দরকার তার সবই ৬ দফায় তিনি তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ছিল ২০ দলীয় জোট। এখনো আমাদের বিরুদ্ধে ২০ দলীয় জোটেই আছে। ওই ২০ আর যায় না, ২০ থেকেই যায়- ওটাও বিষ ফোঁড়ার মতো আছে। ইয়াহিয়া খান ভেবেছিল সেই ২০ দলীয় জোট কমপক্ষে ২০ থেকে ৪০ বা ৫০টি সিট পাব। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন এবং বলেছিলেনও যে আমরা মাত্র ২ সিট পাব না, বাকি সব পাব। গোটা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন বঙ্গবন্ধু। যেটা ওরা মেনে নিতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে অনেক আঁতেল আছেন, তারা অনেক কিছু বেশি বোঝেন। যখন নির্বাচন এলো, তারা বলল ভোটের বাক্সে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বললেন, ভোটের বাক্সে লাথি মেরে স্বাধীন হবে না, ভোটের বাক্সে ভোট দিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। তিনি বলেছিলেন, আমি নির্বাচন করব। কারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট হবে বাংলার মানুষকে কে নেতৃত্ব দেবে? সেটাই হয়েছিল। আব্বা বলতেন, আমরা পরিবারের সদস্যরা জানতাম... হ্যাঁ নির্বাচন হবে। আমরা জিতব। ওরা ক্ষমতা দেবে না। আমরা যুদ্ধ করব, দেশ স্বাধীন করব। কিন্তু পাবলিকলি তিনি এটা বলতেন না। তিনি মানুষকে ধীরে ধীরে এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে ধাপে ধাপে একেকটা কর্মসূচি দিয়ে সেই ’৪৮ সাল থেকে শুরু করে অত্যন্ত ধৈর্য ধরে তারপর এই যুদ্ধ এবং দেশ স্বাধীন করতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ মার্চের ভাষণে জাতির পিতা বলেছিলেন আমাদের কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না। কেউ দাবায়া রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। যখনই দেখল সুদিন, তখনই (’৭৪ সালে) দুর্ভিক্ষ ঘটালো। নগদ টাকা দিয়ে কেনা খাদ্যও আসতে দেয়নি। আমাদের কিছু বাঙালিও এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে অবশ্য এরা সবাই বিএনপিই করতে গিয়েছিল।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App