×

শেষের পাতা

শপথ কাল

সরকার গঠনে মোদি পেলেন আমন্ত্রণ

Icon

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ ডেস্ক : বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) পক্ষ থেকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করার পর গতকাল শুক্রবার নরেন্দ্র মোদিকে কেন্দ্রে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। এর আগে সরকার গঠনের দাবি জানাতে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন। নরেন্দ্র মোদি আগামীকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

গতকাল বিকালে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সামনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন মোদী। গত এক দশকের প্রধানমন্ত্রিত্বে তিনি কখনো সংবাদ সম্মেলন করেননি। এদিন নিজের বক্তব্য জানালেও প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখোমুখি হননি। মোদি বলেন, এটুকু আশ্বাস দিতে পারি, গত দুই দফায় উন্নয়নের যে গতি বজায় ছিল, তৃতীয় দফার পাঁচ বছরেও তা থাকবে। এরপরে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি আমাকে ডেকেছিলেন। সরকার গড়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমি তাকে জানিয়েছি, ৯ তারিখ (রবিবার) বিকালে শপথগ্রহণ হলে ভালো হয়। এর মধ্যেই মন্ত্রীদের তালিকা আমি রাষ্ট্রপতিকে পাঠিয়ে দেব।

তিনি আরো বলেন, এর আগে এনডিএ সভা হয়েছে। সেই সভায় জোটের বন্ধুরা আমাকে এই দায়িত্বের জন্য বেছে নিয়েছেন। সমস্ত এনডিএ মিত্ররা রাষ্ট্রপতিকে এই বিষয়ে অবহিত করেছেন এবং রাষ্ট্রপতি আমাকে ডেকেছেন এবং আমাকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করেছেন।

প্রসঙ্গত, এনডিএতে বিজেপি, চন্দ্রবাবু নাইডুর নেতৃত্বাধীন তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি), নিতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডি-ইউ) এবং অন্যদের মধ্যে একনাথ শিন্দের শিবসেনার সমন্বয়ে গঠিত ২৯৩ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, যা ৫৪৩ সদস্যের লোকসভায় ২৭২ সংখ্যার বেশি। শুক্রবার রাষ্ট্রপতির কাছে সংসদ সদস্যদের তালিকাও জমা দিয়েছে জোটটি। এর আগে, এনডিএ নেতারা দিল্লিতে পুরনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলে বৈঠকে বসেন। এনডিএ সংসদ সদস্য ছাড়াও মুখ্যমন্ত্রীসহ জোটের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চন্দ্রবাবু নাইডু, নিতীশ কুমার এবং একনাথ শিন্ডে ছাড়াও, চিরাগ পাসোয়ান, জিতান রাম মাঁঝি, অনুপ্রিয়া প্যাটেল, পবন কল্যাণসহ প্রধান নেতারা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এবং এনডিএ নেতাদের মধ্যে সিনিয়র বিজেপি নেতাদের পাশাপাশি বসেছিলেন। বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতা নির্বাচিত হন নরেন্দ্র মোদি। তার নাম প্রস্তাব করেন রাজনাথ সিং। অমিত শাহ, চন্দ্রবাবু নাইডু ও নিতীশ কুমার তা সমর্থন করেন।

কিন্তু দুপুরে এনডিএর নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদির পুনর্নিবাচন পর্বের বাকি অংশে ছিল ‘চমক’। বক্তাদের তালিকায়, শরিকি ঐক্যের ছবি তুলে ধরায়, এমনকি ব্যক্তি মোদির পরিবর্তে এনডিএর ‘মাহাত্ম্য’ প্রচারেও- যা দেখে বিরোধীদের একাংশ প্রধানমন্ত্রীর এক দশক আগেকার স্লোগানে ঈষৎ মোচড় দিয়ে বলছেন, এ হল ‘সব কা সাথ, মোদি কা বিকাশ’। অর্থাৎ, নিজেকে তুলে ধরার জন্য সবার শরণাপন্ন হতে হচ্ছে মোদিকে। বাস্তবে হলো তাই। এনডিএর একের পর এক শরিক দলের নেতা মোদির প্রশস্তি গাইলেন। এনডিএ তো বটেই, বিজেপির ভেতরেও যে নেতার সঙ্গে মোদির সম্পর্ক ‘মসৃণ’ নয় বলেই শাসক শিবিরের সকলে জানেন, তাকেও বক্তৃতা দেয়ানো হলো। মোদির ‘সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা’ তুলে ধরতেই পুরনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলের ওই বৈঠকে বিজেপি এবং সহযোগী দলগুলোর লোকসভা সাংসদদের পাশাপাশি ‘আমন্ত্রিত’ তালিকায় ছিলেন রাজ্যসভা সংসদ সদস্যরাও। আমন্ত্রিত ছিলেন বিজেপি এবং এনডিএ শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। একেবারে সামনের সারিতে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। শুক্রবারের যে বৈঠকে বার বার এনডিএর ঐক্যের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা হল, ঘটনাচক্রে মোদির দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম চার বছরে সেই জোটের কোনো বৈঠকই হয়নি!

গত বছরের ১৮ জুলাই বেঙ্গালুরুতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র আনুষ্ঠানিক আবির্ভাবের দিনে দিল্লিতে এনডিএর শরিকদের নিয়ে প্রথম বৈঠক করেছিলেন মোদি, অমিত শাহ, জেপি নড্ডারা। গত পাঁচ বছরে এনডিএর সেটিই প্রথম এবং সেটিই শেষ বৈঠক! তার নেতৃত্বে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও মোদির প্রতি ‘বিশ্বাস’ যে সবার অটুট, তা তুলে ধরতে ওই বৈঠক সরাসরি (লাইভ) সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল খবরের চ্যানেলে- যা হয়ে থাকে সংসদের অধিবেশন চলার সময় বা সংসদ শুরুর আগে যৌথ অধিবেশনের ক্ষেত্রে। এনডিএ বা অন্য কোনো জোটের বৈঠক এভাবে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা স্মরণকালের মধ্যে হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করতে পারছেন না।

বৈঠকের প্রথমে বিজেপির সভাপতি জেপি নড্ডা দলের সংসদীয় নেতা হিসেবে মোদির নির্বাচিত হওয়ার কথা ঘোষণা করেন। এর পরে রাজনাথ সিংহ এনডিএর সংসদীয় নেতা হিসেবে মোদির নাম প্রস্তাব করেন। গত কয়েক বছরে বিজেপির ‘নম্বর টু’ হয়ে ওঠা অমিত শাহের বদলে রাজনাথকে এই ভূমিকায় দেখতে পাওয়া ‘চমক’ তো বটেই। কারণ, প্রতিরক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী হলেও সরকার এবং বিজেপির অন্দরে রাজনাথ খানিকটা নীরবেই থাকেন। চমক ছিল আরো। তৃতীয় বক্তা অমিত শাহের পরেই নিতিন গডকড়ীর আগমন! প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আরএসএস ঘনিষ্ঠ নেতা গডকড়ীর সম্পর্ক ‘মসৃণ’ নয়। গত এক দশক ধরে মোদি মন্ত্রিসভায় থাকলেও দল এবং জোটের অন্দরে কখনো ‘সক্রিয়’ হতে দেখা যায়নি তাকে। এমনকী, কয়েক বছর আগে আমজনতার স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে মোদি সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন সাবেক বিজেপি সভাপতি গডকড়ী।

তবে এদিন বারবার করে নরেন্দ্র মোদি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার বার্তা দেন। তিনি নিজে বারবার এনডিএর ভূয়সী প্রশংসা করেন। বালাসাহেব ঠাকরে, জর্জ ফার্নান্ডেজ, শরদ যাদবদের হাত ধরে যে এনডিএর যাত্রা শুরু হয়েছিল সেকথাও বলেন। বৈঠক শেষ হওয়ার পর মোদি প্রথমে যান লালকৃষ্ণ আদভানির বাড়ি, তারপর মুরলী মনোহর জোশী হয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি কোবিন্দের কাছেও যান।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, এনডিএ এখন নতুন ভারত, বিকশিত ভারত, উচ্চাকাক্সক্ষী ভারতের সমার্থক। গত ১০ বছরে এনডিএ সরকার সুশাসন ও উন্নয়নে মন দিয়েছিল, এবারো দেবে। মোদির দাবি, বিরোধীরা বলার চেষ্টা করেছিল, আমরা এই নির্বাচনে হেরে গেছি। কিন্তু দেশের মানুষ জানে আমরাই জিতেছি। আমি দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করছি, আমরা মতৈক্যের ভিত্তিতে চলব। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টার কোনো ত্রæটি করব না। মোদি কংগ্রেসকে খোঁচা দিয়ে বলেন, ওরা ১০ বছর পরেও একশ আসনে পৌঁছতে পারল না। ২০১৪, ২০১৯ এবং ২০২৪ মিলিয়ে ওরা যত আসনে জিতেছে, তার থেকেও এইবার বিজেপি বেশি আসনে জিতেছে।

এবার এনডিএ সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বিজেপি পায়নি। তারা পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ৩০টি আসন কম পেয়েছে। এরপরই বিরোধীরা বিশেষ করে কংগ্রেস বলে, এটা মোদির নৈতিক পরাজয়। শুক্রবার তারই জবাব দিলেন মোদি।

প্রবীণ সাংবাদিক শরদ গুপ্তা ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, মোদি যে এবার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলবেন, সেই বার্তাই শুক্রবার বারবার দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সবাইকে বলতে দেয়া, প্রবীণদের বাড়িতে গিয়ে আশীর্বাদ নেয়া, দলের নেতাদের গুরুত্ব দেয়া, মতৈক্যের ভিত্তিতে চলার কথা বলা, সবই সেই বার্তাই দিচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App