×

শেষের পাতা

ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী বিশেষজ্ঞদের মতামত

উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প দরকার

Icon

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই  বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প দরকার

হরলাল রায় সাগর : দীর্ঘ ব্যাপ্তির ঘূর্ণিঝড় রেমাল রেখে গেছে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন। এরই মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব দেখতে শুরু করেছে উপকূলের মানুষ। বিশেষ করে লবণাক্ত পানিতে তারা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়েছে। সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে অনেক এলাকায়। পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা রয়েছে। অনেকে পেশা হারিয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকারি-বেসরকারিভাবে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো, খাবার ও পানি সরবরাহ, ঘর মেরামতে আর্থিক বা জিনিসপত্র দিয়ে সহযোগিতা করা এবং যারা পেশা হারিয়েছেন তাদের ক্ষুদ্র ঋণ দেয়ার মতামত দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোই বড় কাজ। এছাড়া উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প নিতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ঘূর্ণিঝড় রেমালে খুলনা অঞ্চলের তিন জেলায় ৬১ কিলোমিটার ও বরিশাল অঞ্চলে কমপক্ষে ৪০০ জায়গায় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নোয়াখালী এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলেও বহু জায়গায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে ও জলোচ্ছ¡াসে প্লাবিত হয়েছে ১৯ জেলার অনেক নি¤œাঞ্চল। এতে উপকূলের নদনদীর পাশাপাশি লোকালয়ে ঢুকে গেছে লবণ পানি। নষ্ট করে দিয়েছে মিষ্টিজলের আধার- পুকুর, খাল ও ডোবা। জলোচ্ছ¡াস ও ঘূর্ণিঝড়ে ভেসে গেছে মাছের ঘের। সরকারি হিসাবেই ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৮৩টি। আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৯২টি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬ জন।

২৬ মে রাত ৮টায় প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল উপকূলে আঘাত হানলেও এর প্রভাব শুরু হয় আগের দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে। আঘাত হানার পরের দিনও সন্ধ্যা পর্যন্ত রেমালের প্রভাব থাকে গোটা দেশে। দীর্ঘ ব্যাপ্তির এ ঘূর্ণিঝড়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়েছেন উপকূলের বাসিন্দারা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের স্থায়িত্ব ও ব্যাসার্ধ (জায়গা) বেশি থাকলেও এর শক্তি সিডর বা আইলার চেয়ে অনেক কম ছিল। সিডর-আইলায় অনেক মানুষ মারা গেছে। সেই তুলনায় রেমালে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই কম। যদিও একটা মৃত্যুও কাম্য নয়। কিন্তু রেমালের ব্যাপ্তি প্রায় ৫০ ঘণ্টার মতো বিদ্যমান থাকায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সরকারি-

বেসরকারিভাবে সামর্থ্য অনুযায়ী দুর্গত মানুষকে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা, বিশেষ করে সুপেয় পানি ও খাবার দেয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিৎ করা দরকার। এ সময়ে পানিবাহিত অনেক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। খাবার ও অপুষ্টি মিলিয়ে মানুষ রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সব মহল থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। পাশাপাশি যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের পুনরায় দাঁড়ানোর জন্য সহযোগিতা করা উচিত। সেটা হতে পারে অর্থনৈতিক, জিনিসপত্র, বিভিন্ন রকমের ত্রাণসামগ্রী কিংবা ঘর মেরামতের জিনিসপত্র। তিনি বলেন, অনেকের পেশাগত সমস্যা হয়েছে। তাকে তার পেশায় ফিরিয়ে আসার জন্য ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা দেয়া যেতে পারে।

ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো যত দ্রুত সম্ভব মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে মন্তব্য করে আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, এক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা নেয়া প্রয়োজন। আর এ বেড়িবাঁধ মেরামত কিংবা নির্মাণে সেনাবাহিনীকে নিযুক্ত করা উচিত। দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প করতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গল। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সিডর-আইলাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে দেখা গেছে সরকারিভাবে করতে দিলে কিছু অসৎ রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রভাব থাকে। এতে তাদের দ্রুত বাঁধ মেরামতে সদিচ্ছা কম থাকে। তাদের কেউ কেউ আবার বাঁধ ভেঙে ফেলে (সিডর-আইলায় খুলনার কয়রা অঞ্চলে দেখা গেছে)। বাঁধগুলো যত বেশি ভাঙা থাকবে, মানুষের বিপদ-ভোগান্তিও বেশি থাকবে- এটা দেখিয়ে তারা আবার বিভিন্ন পর্যায় থেকে ত্রাণসামগ্রী বেশি নিতে পারবে।

এ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বলেন, যেসব ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত বা বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তার ডিজাইন বা প্ল্যান বহু জায়গায় সঠিকভাবে করা হয় না। যার কারণে বাঁধগুলো টেকে না। টেকসই বাঁধের ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। টেকসই বাঁধ মানেই কংক্রিট বা ইটের বাঁধ নয়, মাটির বাঁধও টেকসই হতে পারে। বরগুনাসহ বিভিন্ন জায়গায় এরকম বাঁধ আছে। বাঁধগুলো হতে হবে ঢালু। এতে পানির চাপ সহনীয় হয়। বাঁধ ভাঙতে পারে না। কিন্তু বাঁধ খাড়া হলে তা অল্পতেই পানির চাপে ভেঙে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই খাঁড়া বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এক্ষেত্রে সরকারকে দৃঢ় তদারকি করতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, রেমাল কোনো মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় ছিল না। এটি ছিল মধ্যম মানের একটি ক্রান্তীয় বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়। তারপরও এর এত দীর্ঘ স্থায়িত্বকাল দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন। কারণ এটি উপকূলে আঘাত হানার পর থেকে প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করেছে। একইসঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাঁধ সংলগ্ন নিচু এলাকা উপচে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি ঢুকেছে। তিনি বলেন, খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বহু জায়গায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নোনাজল ঢুকে মিষ্টিজলের আধারগুলো নষ্ট করে দিয়েছে। অনেক জায়গায় ভাটার টানে পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। জলখালাসির পদ বিলুপ্তির পর থেকেই দেশের বেশির ভাগ জলকপাট রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোথাও ভেঙে গেছে, কোথাও দেবে গেছে কপাট।

এবারের ঘূর্ণিঝড়ে বেড়িবাঁধের ক্ষতি এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতের সৃষ্টি করতে যাচ্ছে মন্তব্য করে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, এ মুহূর্তে দ্রুত ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো মেরামত করতে হবে। এজন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করে জনগণের মালিকানায় বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে বর্তমান নীতি-কৌশল পরিবর্তন করে এটা করতে হবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চরফ্যাশন মডেল নিয়েই এগোতে হবে।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভিআইপিদের চলাচল সীমিত করতে হবে। ত্রাণ কাজে মনোনিবেশ না করে প্রশাসনকে প্রটোকলে সময় দিতে হয়। ফলে ত্রাণ কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। ফটোসেশন মানবাধিকারের সঙ্গে যায় না, এ ধরনের প্রবণতা পরিহার বাঞ্ছনীয়।

এ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বলেন, এ মুহূর্তে খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে মিঠাপানির জলাশয় থেকে দ্রুত লবণাক্ত পানি অপসারণ করতে হবে। সামনের আমন মৌসুম ধরতে হলে মাঠ ও জলাশয় থেকে দ্রুত নোনাজল বের করার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাম্প করে এ পানি বের করার ব্যবস্থা করা যায়। ১৯৯১ সালের সাইক্লোন এবং ২০০৭ সালের সিডরের পর এটা করা হয়েছিল।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, সরকার ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির কোনো হিসাবও ঠিকমতো রাখে না। দেশের পরিবেশ উপযোগী ‘হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে কাজ করা উচিত। উপকূলীয় জেলাগুলোয় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত সাইলো ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানান তিনি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App