×

শেষের পাতা

‘জাতীয় চা দিবসে’র অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

শ্রমিকদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে চা বহুমুখী করার আহ্বান, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে চা শ্রমিকদের সুরক্ষা

Icon

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

  শ্রমিকদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে

কাগজ প্রতিবেদক : কেবলমাত্র অধীনস্ত হিসেবে বিবেচনা না করে চা শ্রমিকদের প্রতি আন্তরিক ও যতœবান হতে বাগান মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চা বাগানের শ্রমিকদের যাতে আর ভাসমান অবস্থায় থাকতে না হয়, তারা যাতে ভালোভাবে বসবাস করতে পারে, তার সব ব্যবস্থা সরকার করবে বলে প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন সরকারপ্রধান। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘জাতীয় চা দিবস’ উদযাপন এবং ‘জাতীয় চা পুরস্কার ২০২৪’ প্রদান উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

চা দেশের মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা এনে দিতে সহায়তা করছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চা শ্রমিকদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা হবে। শ্রমিকদের প্রতি বেশি যতœবান হলে তারা বেশি করে কাজ করতে পারবেন। শুধুমাত্র তাদের আপনার অধীনস্থ বলে বিবেচনা করলে হবে না। মনে রাখতে হবে তাদের শ্রম, ঘাম দিয়েই আপনার উৎপাদন বাড়ানো এবং উপার্জনের পথ করে দিচ্ছে। কাজেই শ্রমিকদের প্রতি আপনাদের আরো যতœবান হতে হবে। চা শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা, তাদের নানা ধরনের অসুবিধা দূর করার দিকেও দৃষ্টি দিতে বলেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চা শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাজ করেছিলেন। চা শিল্পের গবেষণার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। চা শ্রমিকরা অনগ্রসর। তারা ভাসমান অবস্থায় আছে। তাদের আর ভাসমান থাকতে হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কাযালয়ের আলাদা ফান্ড আছে, সেখান থেকে তাদের জন্য ফান্ড দেয়া হবে।

তিনি বলেন, এখন আমাদের চা চাষ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছে। যেখানে আমাদের সামান্য চা উৎপাদন হতো, সেখানে উৎপাদন বেড়েছে। উত্তরাঞ্চল চায়ের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেটাকে সম্প্রসারণ করা, যতœ করা, কীভাবে আরো চা উৎপাদন বাড়ানো যায় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পঞ্চগড়ে আঙ্গিনাতেও চা হচ্ছে, তারা সেখানে তরকারি লাগায়, চায়ের গাছও লাগায়। পঞ্চগড়ের পাশাপাশি লালমনিরহাটেও চা বোর্ডের স্থায়ী অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া চা বোর্ড ক্ষুদ্র চাষিদের প্রযুক্তি সহায়তা, প্রণোদনা, সব দিক থেকে সরকার সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষের চায়ের চাহিদাও যে বেড়েছে, সে কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যা উৎপাদন করি তাতে রপ্তানির জন্য খুব বেশি একটা থাকে না। বাংলাদেশের মানুষ খুব বেশি চা খেতে পছন্দ করে।

৯৬ সালে সরকার গঠনের পর চা শিল্পের জন্য নেয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি, তখন বিদ্যুৎ ছিল না। ৩/৪ ভাগ মানুষ শুধু বিদ্যুৎ পেত। সেই সময় চা বাগানে যাতে উৎপাদন ব্যহত না হয়; শুধু চা বাগান নয়, আমাদের শিল্প কলকারখানা যাতে ভালোভাবে চলে, তখন জেনারেটরের ওপর থেকে ট্যাক্স তুলে দিয়েছিলাম, যাতে সহজভাবে কিনতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজী শাহেদ সাহেবকে ডাকলাম। তিনি খুব উদ্যোগী মানুষ

ছিলেন। তিনি সেখানে খাম্বা বানাতেন। আমি বললাম, বিদ্যুৎ নাই খাম্বা দিয়ে কী করবেন। আপনি এখন চা বানান। তাকে ধরিয়ে দিলেই কাজে লেগে যান। সরকারিভাবে হবে না। আপনাকে উদ্যোগ নিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি বিরোধী দলে থাকতেও তাকে অনুরোধ করেছিলাম। তারপর সরকারে আসার পর যা যা সুবিধা দরকার দিয়েছি। সত্যি চা বাগান হল। এখন পুরো উত্তরবঙ্গের সবখানে চা বাগান হচ্ছে। পঞ্চগড়ে সফল হওয়ার পর ঠাকুরগাঁওয়ে চা বাগান, দিনাজপুরে চা বাগান, নীলফামারী, রংপুরের কিছু অংশ, লালমনিহাটও চলে গেছে, কুড়িগ্রামেও। যদিও কুড়িগ্রামে অনেক নদী, উঁচু জায়গা খুবই কম, তারপরও সেখানেও চেষ্টা করা হচ্ছে।

চা উৎপাদনের তথ্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করে ২০২৩ সালে দেশের চা বাগানগুলোতে ১০২ দশমিক ৯২ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ১৬৮টি বৃহৎ চা বাগান এবং প্রায় ৮ হাজার ক্ষুদ্র চা বাগান রয়েছে। চায়ের নিলাম চট্টগ্রামের পাশাপাশি এখন সিলেটেও হচ্ছে।

‘অ্যারোমা টি’ উৎপাদন করা প্রয়োজন : বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে চা বহুমুখী করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, মানুষের রুচি এখন বদলে গেছে। বিভিন্ন ধরনের চা এখন পাওয়া যায়। সুগন্ধি চা তৈরি করুন। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্বাদের চায়ের চাহিদা এখন অনেক বেশি। চা উৎপাদনের পাশাপাশি এদিকে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, এখন বিভিন্ন ধরনের চা পাওয়া যাচ্ছে। হারবাল টি, মসলা টি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। সেজন্য ‘অ্যারোমা টি’ উৎপাদন করা প্রয়োজন। কারণ, বিভিন্ন অ্যারোমা চায়ের কদর অনেক বেশি। এছাড়া তুলসি, আদা, লেবু, তেজপাতা, এলাচ, লং, দারুচিনি প্রভৃতির সাহায্যে আমরা যে চা বানাই সে চাও প্যাকেটজাত করা যায়।

সরকারপ্রধান বলেন, যারা চা মালিক এবং ব্যবসায়ী তাদের বলবো আপনারা ভ্যালু অ্যাডেড করেন। বাল্কে চা বিক্রির পরিবর্তে যদি ভ্যালু অ্যাডেড করেন তাহলে আপনারা ভালো দাম পাবেন। উপার্জন করতে পারবেন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা এবং বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

পাট পাতা থেকে চা তৈরিতে গবেষণা চলছে এবং সীমিত আকারে উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি নিয়ে আরো গবেষণা করে এর উৎকর্ষ সাধন প্রয়োজন।

সারাদেশে বিদ্যুতায়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এখন গ্রামগঞ্জের মানুষ অনেক বেশি তথ্য পান। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিশ্ব পরিস্থিতির আলোচনায় চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। তিনি বলেন, চায়ের কাপে এই ঝড় দিন দিন বাড়ছে। কাজেই চায়ের চাহিদাও বাড়ছে। সেজন্য উৎপাদনও বাড়াতে হবে। এটা করার জন্য যা যা করা দরকার অবশ্যই আমরা করব। আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা করব সেটাই আমাদের লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে চা শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা দেয়া হবে। চা শিল্পের গবেষণার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সেই সঙ্গে মানুষের রুচি ও চাহিদার দিকে নজর দিয়ে চা উৎপাদন করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে চা শিল্পে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটটি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন চা কোম্পানি বা ব্যক্তিকে ‘জাতীয় চা পুরস্কার ২০২৪’ তুলে দেন শেখ হাসিনা।

বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি টিপু মুনশি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহা. সেলিম উদ্দিন, চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম বক্তৃতা করেন।

প্রসঙ্গত. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালের ৪ জুন প্রথম বাঙালি হিসেবে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যোগদান করে বাঙালি জাতিকে সম্মানিত করেন। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার ২০২১ সাল থেকে জাতীয় চা দিবস পালন করে আসছে। ‘স্মার্ট বাংলাদেশের সংকল্প, রপ্তানিমুখী চা শিল্প’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশে চতুর্থবারের মতো এ বছর ‘জাতীয় চা দিবস-২০২৪’ উদযাপন হচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App