×

শেষের পাতা

করপোরেটে জিম্মি পোল্ট্রি শিল্প

Icon

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

করপোরেটে জিম্মি পোল্ট্রি শিল্প

কাগজ প্রতিবেদক : ত্রিশ বছর ধরে পোল্ট্রি খামার পরিচালনা করে আসছেন টাঙ্গাইল জেলার একজন ক্ষুদ্র খামারি (নিরাপত্তার কারণে তার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না)। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ১০ হাজার মুরগি আছে। খামারে মূলত ডিম উৎপাদন হয়। বর্তমানে দৈনিক সাড়ে ৪ হাজারের মতো ডিম পাচ্ছেন তিনি। তাপপ্রবাহের কারণে ডিম উৎপাদন কমে গেছে। প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা। এই খামারি জানান, উৎপাদন খরচের চেয়ে দাম কম পাচ্ছেন। গরমে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হওয়ায় বিল বেশি আসে, ফিডের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ-তিনগুণ। গত বছর যে ফিডের কেজি ৪৮-৫০ টাকা ছিল তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়। আগের ৭০ টাকার ফিড কিনতে হচ্ছে প্রায় দুইশ টাকায়। খামার চালাতে গিয়ে প্রায় সময়ই পড়েন আর্থিক সমস্যায়; বিদ্যুতের বিল ও মুরগির খাদ্য কেনার টাকার অভাব পড়ে। তা মেটাতে গিয়ে আড়তদারদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেন, কিন্তু তা আর পরিশোধ করতে পারেন না। দফায় দফায় এভাবে আর্থিক সহায়তা নিয়ে আটকে যান আড়তদারদের জালে। এ পরিস্থিতিতে আড়তদারের মনগড়া নির্ধারিত দরে ডিম দিতে বাধ্য হন। আগে গাজীপুর ছিল মুরগি খামারের রাজধানী, এখন টাঙ্গাইল বলেও জানান তিনি।

এ খামারি আক্ষেপ করে বলেন, নিজেদের প্রাপ্য আদায়ের জন্য খামারিরা সংগঠিতও হতে পারেন না। সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে নানা কৌশলে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেন আড়তদাররা। তাদের পেছনে বড় শক্তি আছে। তিনি বলেন, আমার মতো খামারিরা হারিয়ে যাচ্ছে। ন্যায্য দাম না পাওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ডিম উৎপাদনের খামার ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন তারা। এ অবস্থার জন্য শুধু মধ্যস্বত্বভোগীরাই নয়, রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনাও দায়ী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কাছ থেকে খামারিরা কোনো ধরনের সহযোগিতা পান না। তার প্রশ্ন- রাষ্ট্র কাদের পক্ষে কাজ করে?

শুধু ওই খামারিই নন, দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রায় সব খামারির অবস্থা একই। দেশের সম্ভাবনায়ময় পোল্ট্রি শিল্প ধুঁকছে। ফসল ফলানো কৃষকের মতো মুরগির খামারিরাও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত। শোষিত। মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে জিম্মি ক্ষুদ্র খামরারিরা। আর গোটা পোল্ট্রি শিল্প জিম্মি করে রেখেছে চিহ্নিত কয়েকটি করপোরেট কোম্পানি। এর মধ্যে কয়েকটি বহুজাতিক বিদেশি কোম্পানিও রয়েছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ডিম ও মুরগির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। এর জাঁতাকলে পড়ে নিষ্পেষিত হচ্ছে ভোক্তা সাধারণ।

পাইকারি ও খুচরা ডিম ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বাড়তি দামে ডিম কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি তীব্র গরমে খামারে মুরগি মারা যাওয়ায় ও উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারের ডিম ও ব্রয়লারের সরবরাহ অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ডিমের দাম বেড়েছে ডজনে ২০ থেকে ৩০ টাকা। আর ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭০ টাকায়। তবে সিন্ডিকেটর কাছে যেন অসহায় সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো। কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। মাঝে মাঝে নামকাওয়াস্তে পদক্ষেপ নিলেও কোনো কাজে আসছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোল্ট্রিতে

তিনটি খাত- লেয়ার ফার্ম (ডিমপাড়া মুরগি), হ্যাচারি (বাচ্চা উৎপাদন) ও ফিড (মুরগির খাদ্য উৎপাদন)। এ তিন খাতই বড় বড় কোম্পানিগুলোর দখলে। বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো একই সঙ্গে ডিম, বাচ্চা এবং ফিড উৎপাদন করছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের তুলনায় খরচ কম পড়ছে। এ কারণে বিক্রিও কম দামে করতে পারছে। আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা তাদের কাছ থেকে ফিড ও লেয়ার কিনে নিয়ে ব্রয়লার তৈরি ও ডিম উৎপাদন করায় খরচ বেশি পড়ছে। মাঝখানে একটি গোষ্ঠী হচ্ছে আড়তদার বা পাইকার। তারা ক্ষুদ্র খামরিদের কাছ থেকে ডিম ও মুরগি কিনে ছোট পাইকার ও খুচরা বাজারে সরবরাহ করে। আড়তদার ও করপোরেট কোম্পানিগুলো ফিড, ডিম, লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির দাম নির্ধারণ করে দেয়। মোবাইল ফোনের মেসেজের মাধ্যমে যখন যেমন খুশি দাম ধরে। এর মধ্যে তারা কোল্ড স্টোরেজে ডিম মজুত করে কৃত্রিম সংকটও সৃষ্টি করে। মূলত পোল্ট্রি খাতের করপোরেট কোম্পানি ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সিন্ডিকেটে বিদেশের কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানিও রয়েছে।

পোল্ট্রি খাতের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ১৫-২০টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে পোল্ট্রি শিল্প। কাজী ফার্মস, আফতাব গ্রুপ, প্যারাগন, নীলসাগর, নারিশ, বি অ্যাগ্রো, আগা হ্যাচারি, আমান হ্যাচারি, প্রোভিটা, আরআরপি, ডায়মন্ড, নর্দান এগ, এসিআই গোদরেজ, থাইল্যান্ডের সিপি বাংলাদেশ লি. নিউ হোপ, টংওয়েসহ দেশি-বিদেশি কয়েকটি করপোরেট পোল্ট্রি প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে বাজার নিয়ন্ত্রণে। উল্লিখিত কোম্পানিগুলোই বেশির ভাগ ডিম, লেয়ার, ব্রয়লার ও ফিড উৎপাদন করছে, তাই বাজারও নিয়ন্ত্রণ করছে সহজেই।

ব্যবসায়ীরা জানান, যে কোনো একটি হ্যাচারি প্রতিদিন সকালে বাচ্চার দাম নির্দিষ্ট করে ডিলারদের কাছে মোবাইল ফোনে এসএমএস দেয়। পরে অন্য কোম্পানিগুলো একই পথ অনুসরণ করে। এর আগে বাচ্চার অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির সময় এক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনেও এসব ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত অর্থলিপ্সার মনোভাবের তথ্য তুলে ধরেছে।

ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের বাজার নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার। তিনি বলেন, প্রাণিজ আমিষের এ উৎস দুটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারাই দাম বাড়াচ্ছে, আবার প্রয়োজনে তা কমাচ্ছে। এতে তারা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা। তাই এ চক্র ভাঙা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় মুরগি ও ডিমের মূল্য আরো বাড়তে পারে।

প্রান্তিক খামারি এবং করপোরেটদের ডিম-মুরগির উৎপাদন খরচের ফারাক ও বাজার নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত তুলে ধরে সুমন হাওলাদার বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ৮৭ পয়সা থেকে ১১ টাকা এবং প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা। অন্যদিকে করপোরেটদের ডিমে ১০ টাকার কম আর মুরগিতে খরচ হয় ১১৯ থেকে ১৩০ টাকা। অথচ যখন প্রান্তিক খামারিদের ডিম-মুরগি বাজারে আসে তখন দাম কমে যায়। এর কারণ হচ্ছে বড় ব্যবসায়ীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা মোবাইল ফোনের এসএমএসের মাধ্যমে দাম বাড়ান আবার কমান। এতে পুঁজি ফিরে পেতেই হিমশিম খেতে হয় খামারিদের। অন্যদিকে গ্রুপ অব কোম্পানিগুলোর ডিম-মুরগি বাজারে এলে মূল্য বেড়ে যায়, তাদের দ্বিগুণ মুনাফা হয়। বর্তমানে বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। সুমন হাওলাদার বলেন, সিন্ডিকেট আছে ফিড উৎপাদনকারীদের মধ্যেও। তারা নানা অজুহাতে ফিডের দাম বাড়ান। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে কাঁচামালের দাম কমলে তারা কমাতে চান না।

মাদারীপুর শহরের বিসিক শিল্প নগরীর ভেতরে মাদারীপুর হিমাগার। পর্যাপ্ত জায়গা খালি থাকায় মার্চ মাস থেকে ডিম মজুত শুরু করে ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ উঠেছে, শহিদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর কাজী নামে দুই বড় ব্যবসায়ী মাদারীপুরে পুরো ডিমের বাজার অস্থির করেছেন। তারা রমজানে দাম কম থাকায় ডিম মজুত করে রেখেছেন ওই দুই ব্যবসায়ী। বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ডিম হিমাগারে মজুত আছে বলে জানিয়েছেন মাদারীপুর কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল করিম। জেলায় এখন এক হালি ফার্মের ডিম পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫০ টাকা। যা খুচরা পর্যায়ে পৌঁছে ৫৫-৬০ টাকায়। এছাড়া দেশি মুরগি ও হাঁসের ডিমের দেখা নেই বাজারে। জেলায় প্রতিদিন ডিমের চাহিদা রয়েছে।

বগুড়ার কাহালুর মুরইল আফরিন কোল্ড স্টোরেজে গত বুধবার ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮৮টি ডিম মজুতের সন্ধান পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় কোল্ড স্টোরেজ মালিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

বগুড়ার মুরগির খামারি আবু মোত্তালেব মানিকসহ খামারিরা বলছেন, মুরগির খাবারের দাম কিছুটা বেশি। প্রতিদিনের ডিম উৎপাদন স্বাভাবিক আছে। বড় বড় ডিম বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের জন্য ডিমের বাজার বেসামাল।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App