×

শেষের পাতা

সুযোগ পেলেই অপকর্মে জড়িয়ে যায় চরমপন্থিরা

Icon

কামরুজ্জামান খান

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সুযোগ পেলেই অপকর্মে জড়িয়ে যায় চরমপন্থিরা

পাবনা, ঈশ্বরদী, যশোর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, মাদারীপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মাগুরা, মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহসহ কয়েকটি জেলায় এক সময়ে চরমপন্থি-সর্বহারাদের ব্যাপক দাপট ছিল। চোখ বেঁধে অপহরণ, ডাকাতি ও খুনোখুনির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তারা ছিলেন আতঙ্কের নাম। নব্বই দশকে রাজনৈতিক পালাবদলে এদের দাপট কমতে থাকে। চরমপন্থিদের অনেকেই ভিড়ে যান আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে।

রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়ে চিহ্নিতদের কেউ কেউ আড়াল করেন অতীতের কুকর্ম। তবে মামলার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে আসতে পারেনি, ছিলেন গোপনে। এরমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার করার মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ কয়েকজন শীর্ষ চরমপন্থি নেতা মৃত্যুর পর তারা ভড়কে যায়। আত্মগোপনে থাকার পর র‌্যাবের মাধ্যমে দুই দফায় চরমপন্থি দলের  সহস্রাধিক সদস্য আত্মসমর্পণ করে।

কিন্তু লেবাস পাল্টে এলাকা ছেড়ে যারা ঢাকায় এসে বিভিন্ন ব্যবসায় নাম লিখিয়েছে; তাদের মধ্যে অনেকে সুযোগ পেলেই পুরনো রূপে ফিরছে। বিশেষ করে খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে মিশে আছেন চরমপন্থিদের অনেকে। তারা ঠিকাদারিসহ বিভিন্ন কাজের নিয়ন্ত্রক। স্থানীয় পুলিশের কাছেও এ ব্যাপারে খবর রয়েছে।

সবশেষ ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার রহস্যজনকভাবে কলকাতায় খুনের ঘটনায় পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এম এল-জনযুদ্ধ) শীর্ষ নেতা শিমুল ভূঁইয়ার সম্পৃক্ততায় চরমপন্থিদের তৎপরতার খবর নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে দক্ষিণাঞ্চলে প্রায়ই একাধিক অপকর্মে চরমপন্থিদের নাম আসে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলো এক সময় বিভিন্ন চরমপন্থি গ্রুপের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৬০ এর দশক থেকে ওই অঞ্চলে বিভিন্ন বামপন্থি দল তাদের তৎপরতা শুরু করে এবং তখন তাদের মূল ভিত্তি ছিল ‘মার্কসবাদ’ এবং ‘মাওবাদী’ আদর্শ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় এসব গ্রুপের তৎপরতা বাড়তে থাকে।

এসব সংগঠন গোড়া থেকেই অতি বাম আদর্শে বিশ্বাস করত। তবে বামপন্থি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অপরাধ প্রবণতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সংগঠনগুলো। আদর্শের দ্বন্দ্ব কিংবা আর্থিক ভাগাভাগি নিয়ে চরমপন্থি সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্রমাগত বিভেদ এবং এর ফলাফল হিসেবে নানা উপদল সৃষ্টি হতে থাকে। নিজেদের প্রতিপক্ষকে অবলীলায় খুন করতেও দ্বিধা করত না এসব চরমপন্থি গ্রুপের সদস্যরা। প্রকাশ্য দিবালোকে কাউকে হত্যা করা ছিল বিভিন্ন চরমপন্থি গোষ্ঠীর কাজের অন্যতম ধরন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন, বাংলাদেশ যখন প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা দেয়। এই অবস্থার মধ্যে কয়েকটা মার্কসবাদী গ্রুপ আত্মপ্রকাশ করে। এর মধ্যে কিছু গ্রুপ ছিল যারা শত্রুদের গুপ্তহত্যার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবে। চরমপন্থি গ্রুপগুলো শেষ পর্যন্ত জনসমর্থন পায়নি। তবে তাদের ভয়ে আতঙ্কিত থাকত সাধারণ মানুষ। আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, পুরনো কমিউনিস্ট নেতারা দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেয়ার পর এসব চরমপন্থি সংগঠন কার্যত মনোনিবেশ করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে, যার মাধ্যমে তারা অর্থ উপার্জন করতে পারে। যারা এ ধরনের চরমপন্থি, তারা তাদের রাজনৈতিক আদর্শের কথা বলছে বটে, কিন্তু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়েছে।

এদিকে র‌্যাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০২৩ সালের ২১ মে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা বেশ কয়েকটি চরমপন্থি সংগঠনের সক্রিয় তিন শতাধিক সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় র‌্যাব-১২ সদর দপ্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের হাতে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন তারা। আত্মসমর্পণকারী চরমপন্থি সংগঠনগুলো হলো- পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এম এল (লাল পতাকা), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (এমবিআরএম), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (জনযুদ্ধ) ও কাদামাটি। ৭ জেলার ৩১৫ জন চরমপন্থি ২১৬টি অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

এর আগে ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনার শহীদ আমিন উদ্দিন স্টেডিয়ামে চরমপন্থি বলে চিহ্নিত এমন ৬১৪ জন আত্মসমর্পণ করেছেন। তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সদস্য, কেউ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির, কেউবা নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন নামে হলেও এই সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড প্রায় একই ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের উপস্থিতিতে শতাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং হাজারখানেক দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন ১৫টি জেলা থেকে চরমপন্থি দলের সদস্যরা। আশির দশক থেকেই চলনবিলের আশপাশের অঞ্চল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে চরমপন্থিরা ঘাঁটি গাড়ে। ২০০০ সাল থেকে ১৮ বছরে সারাদেশে তাদের হাতে ২০৯ জন নিহত হন। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭টি মামলা হয় দেশের বিভিন্ন থানায়।

অপরদিকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মাদারীপুরে হঠাৎ সক্রিয় হয় পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। নির্বাচনের আগে তারা লিফলেট ছড়ালে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এর পাঁচ বছর আগেও সংগঠনটি ওই এলাকায় পতাকা টাঙিয়েছিল। এরপর তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। এর মধ্যে গত ২২ মার্চ চাঞ্চল্যকর মতিয়ার রহমান তরফদার (৩০) হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত চরমপন্থি মাস্টারমাইন্ড খুনী আক্তারুজ্জামান ডলারকে (৫৫) ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট মানিকদী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩। ১৯৯৩ সালে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের মধ্যে অস্ত্রের দ্বন্দ্বে যশোর জেলার অভয়নগর থানাধীন কোটা গ্রামের মতিয়ার খুন হন। দীর্ঘ ৩১ বছর দেশে-বিদেশে পলাতক ছিলেন ডলার।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App