×

শেষের পাতা

থার্ড টার্মিনালে জাইকার সঙ্গে কাজ পেতে চায়

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বিমান

Icon

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বিমান

হরলাল রায় সাগর : বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের অপারেশনাল ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ঢাকায় বিশ্বমানের অত্যাধুনিক থার্ড টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার জন্য মূলত এ প্রস্তুতি নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি। সরকারও চায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিমান সক্ষমতা অর্জন করুক। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হবে, তেমনি আরো সমৃদ্ধ হবে রাজস্ব আয়ের খাতটিও। বর্তমানে বিমানের রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং। এ লক্ষ্যে পর্যাপ্ত দক্ষ-প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সমন্বয়ে নিরাপদ সেবা নিশ্চিতের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে সরকার।

টার্মিনাল গেটে পৌঁছানোর সময় এবং পরবর্তী ফ্লাইট ছেড়ে যাওয়ার সময়ের মধ্যে একটি বিমানের অনেক পরিষেবার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং। গতি, দক্ষতা এবং নির্ভুলতা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবাগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ, যেন টার্নঅ্যারাউন্ড সময় (যে সময়টিতে বিমানটিকে গেটে পার্ক করা উচিত) কমিয়ে আনা যায়। নি¤œ গ্রাউন্ড সময়ের জন্য দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড ভালো লাভের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর প্রধান পরিষেবাগুলো হলো- বিমানের উপস্থিতি, ক্যাটারিং, র‌্যাম্প পরিষেবা, যাত্রীসেবা ও ফিল্ড অপারেশন সার্ভিস উল্লেখযোগ্য।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, বিমান দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষতার সঙ্গে নিজস্ব এয়ারক্রাফটসহ বিদেশি বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে আসছে। বহির্বিশ্বের এয়ারলাইন্সগুলোয় সুনামও রয়েছে। চালুর অপেক্ষায় থাকা থার্ড টার্মিনালেও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিরাপত্তা ও দক্ষতার সঙ্গে সুচারুভাবে সম্পন্ন করার যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করছে বিমান। বিমানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার হিসেবে আরো সমৃদ্ধ ও সক্ষম করে গড়ে তোলা হচ্ছে। তিনি বলেন, তদারকি ও কাজের গতিশীলতা বাড়াতে জিএসই অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এমনকি নিরাপত্তা সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে কর্মীদের।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (হশাআবি) অত্যাধুনিক থার্ড টার্মিনালের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের টার্মিনালটি আগামী সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে বুঝিয়ে দিতে চায় নির্মাণ সংস্থা। পরের মাস অক্টোবরেই এর কার্যক্রম শুরু করতে চায় বেবিচক। সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক এ মেগা প্রকল্পে যাত্রীদের জন্য থাকছে অত্যাধুনিক সব সুবিধা। ই-গেট, হাতের স্পর্শ ছাড়া চেকিং, নিজেই নিজের

ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা যাবে এ টার্মিনালে। সুপরিসর অ্যাপ্রোন, বিশাল গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত লাগেজ বেল্ট যাত্রীদের দেবে নতুন অভিজ্ঞতা। এছাড়া চট্টগ্রামে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও রয়েছে।

জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান অপারেশনাল কেন্দ্রস্থল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, এ বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী হ্যান্ডলিং ক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ (১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন)। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৯০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী সংস্থা বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করা হয়।

জানা গেছে, হযরত শাহজাজাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণাধীন থার্ড টার্মিনালকে কেন্দ্র করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিমান। ২০২২ সালের মার্চে শুরু হওয়া দুই বছর মেয়াদের এ যৌথ প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ এপ্রিল শেষ হয়েছে। কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে জাপান সরকারের জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। সংস্থাটি কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানোসহ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে বিমানকে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে। সরকারের সিদ্ধান্ত হয়ে আছে- থার্ড টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করবে জাইকা। সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে নেবে- এটাও জাইকার সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে।

বিমান জানায়, জাপানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুসরণে এসওপি প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেশে-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণ, গ্রাউন্ড সার্ভিস ইক্যুইপমেন্ট (জিএসই) ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানো, র‌্যাম্প সার্ভিস উন্নয়নসহ নানাবিধ প্রশিক্ষণ ও নীতিমালা প্রণয়নে বিমানকে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে জাইকার বিশেষজ্ঞ দল। প্রকল্পের অধীনে র‌্যাম্প সার্ভিস, জিএসই অপারেশন্স, জিএসই প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড মেইনটেনেন্স, ইমপোর্ট কার্গো এবং এক্সপোর্ট কার্গো খাতে ৫টি টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য নতুন ইউনিফর্ম প্রবর্তনের পাশাপাশি ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়াতে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

বিমান সূত্র জানায়, যাত্রীসেবার উন্নয়ন ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সক্ষমতা বাড়াতে গত এক বছরে ১ হাজার ১৮৪ জন গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ গত মার্চে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৮৪ জনকে। আরো ৫৫০ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে ইক্যুইপমেন্ট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪৫৪ জন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ অপারেটর-কর্মী রয়েছে। সেবা ও কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন দেয়ার জন্য দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া আগে থেকেই অনেক বিমানকর্মীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সার্টিফিকেশন রয়েছে। বিমানের এসব দক্ষ কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশের বাইরে। বিমানের কর্মীরা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজে অত্যন্ত দক্ষ। তারা এরই মধ্যে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সার্ভিস দিয়ে সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

পাশাপাশি বিমানের অপারেশনাল ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক গ্রাউন্ড সার্ভিস ইক্যুইপমেন্ট (জিএসই) ও নতুন যানবাহন কেনা হচ্ছে। বর্তমানে একটি এয়ারকন ইউনিট, ১১টি এয়ার স্টার্ট ইউনিট, ২২টি বেল্ট লোডার, ২৭টি কন্টেইনার প্যালেট লোডারসহ ১৯ ধরনের মোটরাইজড ইক্যুইপমেন্ট ২৭৩টি এবং সাত ধরনের নন-মোটরাইজড ইক্যুইপমেন্ট আছে প্রায় ৩ হাজার।

জিএসই ফ্লিট সমৃদ্ধ করা এবং সুচারুভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ইক্যুইপমেন্ট কিনতে বরাদ্দ করা হয়েছে ২০৯ কোটি টাকা। এ টাকায় চলতি বছরের মধ্যে ১০৫টি বিভিন্ন ধরনের ইক্যুইপমেন্ট কেনার প্রক্রিয়া চলছে। উল্লেখযোগ্য সরঞ্জামাদি হলো- ১০টি এয়ারক্রাফট এয়ার কন্ডিশনিং ইউনিট, ছয়টি বেল্ট লোডার, ১২টি কন্টেইনার প্যালেট ট্রান্সপোর্টার, ৪টি টোবারলেস পুশ ব্যাক টো-ট্রাক্টর, ১৫টি বেল্ট লোডার, ৪টি এম্বুলিফট, ৬টি কন্টেইনার প্যালেট লোডার, দুটি এয়ারক্রাফট এয়ার স্টার্ট ইউনিট, ৬টি এয়ারক্রাফট ফ্লাশ কার্ট ও ১০টি এয়ারক্রাফট ওয়াটার কার্ট। এরই মধ্যে দুটি অত্যাধুনিক পুশ কার্ট যুক্ত হয়েছে। এগুলো বিশ্বসেরা ফ্রান্সের টিএলডি কোম্পানির, যা বিশ্বের যে কোনো ভারী বিমানকে ঠেলে নিতে সক্ষম। নতুন ইক্যুইপমেন্ট যুক্ত হলে দৈনিক দুইশ ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিতে পারবে বিমান।

বিমান সূত্র জানায়, বর্তমানে দৈনিক ১৬০ থেকে ১৭০টি এয়াক্রাফট হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। হজের সময় তা বেড়ে ১৯০ থেকে প্রায় দুইশতে উন্নীত হয়। কর্মীদের দক্ষতায় বর্তমানে বছরে প্রায় ৩০ হাজার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেয়া হচ্ছে। একই সময়ে একসঙ্গে ১৫টি ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং দিতে সক্ষম বিমান। ২০২৩ সালে বিমানের জিএসই বিভাগ প্রায় ৫৭ হাজার দুইশ ফ্লাইটে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়েছে। এর মধ্যে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজসহ বিশ্বসেরা এয়ারলাইন্স রয়েছে। বিমান কার্গো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার হিসেবে ৩৮টি এয়ারলাইন্সকে সেবা দিয়ে আসছে। আর এ খাত থেকে অন্তত এক হাজার দুইশ কোটি টাকা আয় হচ্ছে বছরে, যা বিমানের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান খাত। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করতে পারলে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আয় করতে পারবে বিমান।

প্রসঙ্গত, থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পেতে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি সংস্থা তদবির চালাচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App