×

শেষের পাতা

স্বীকৃতি পেল বসনিয়ার মুসলিমদের ওপর গণহত্যা

১১ জুলাই স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা দিবস ঘোষণা করল জাতিসংঘ

Icon

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

১১ জুলাই স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা দিবস ঘোষণা করল জাতিসংঘ

কাগজ ডেস্ক : ১৯৯৫ সালে সংঘটিত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা স্মরণ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করল জাতিসংঘ। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই গণহত্যায় বসনিয়ার আট হাজার মুসলিমকে হত্যা করে সার্বিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা বসনিয়ান সার্ব বাহিনী।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জার্মানি এবং রুয়ান্ডার পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। এর বিরোধিতা করে সার্বিয়া ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানোর পরও এটি পাস হয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে। অবশ্য এই প্রস্তাবকে ‘পলিটিসাইজড’ বলে অভিহিত করেছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুসিচ। তার দাবি, এর ফলে পুরো সার্বিয়া এবং সার্ব জনগণের গণহত্যাকারী হিসেবে পরিচিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলো। ‘১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস’ প্রচলনের পক্ষে ভোট দেয় ৮৪টি সদস্য রাষ্ট্র। প্রস্তাবের বিপক্ষে পড়ে ১৯টি ভোট। আর, ৬৮টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিল। এই খবর ওই গণহত্যায় নিহত আট হাজার পুরুষের স্বজনদের জন্য সন্তোষজনক। বসনিয়ান সার্ব বাহিনী ওই মানুষগুলোর উপর পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়। বসনিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় স্রেব্রেনিৎসায় জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সেইফ এরিয়া’ (নিরাপদ স্থান) শান্তিরক্ষীদের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু সংখ্যায় অপ্রতুল হওয়ায় শান্তিরক্ষীরা বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠেনি। বসনিয়ান সার্ব সামরিক কর্মকর্তা রাতকো ¤øাদিচের নির্দেশে বাহিনীর সদস্যরা নারী ও পুরুষদের আলাদা করেছিল। মা, স্ত্রী, কন্যা, বোনদের থেকে সেই যে পরিবারের পুরুষ সদস্যটিকে আলাদা করা হয়েছিল, আর তাদের দেখা মেলেনি।

হত্যায়ই থেমে থাকেনি নৃশংসতা। পরবর্তী সময়জুড়ে বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর সদস্যরা নিহতদের গণকবরগুলো পুনরায় খোঁড়ে। গণহত্যাকে ধামাচাপা দিতে দেহাবশেষগুলোকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয় তারা। ফলে, একেকজনের শরীরের অংশগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়।

ঘটনার ২৯ বছরে বেশির ভাগ পরিবার কিছু না কিছু দেহাবশেষ শনাক্ত করে দাফন করতে সক্ষম হয়েছে। গণহত্যার স্থানটির কাছেই, পোতোক্যারি সিমেট্রিতে কবর দেয়া হয় তাদের। তবে কোনো কোনো পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

দ্য ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন মিসিং পারসনস্ এর সহায়তায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সাত হাজার ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ‘স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায়’ নিহতদের স্মরণে ১১

জুলাইকে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা স্মরণ দিবস ঘোষণা করে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস হওয়ার প্রশংসা করে একটি বিবৃতি দিয়েছে সংস্থাটি। দিবসটি ব্যক্তি, পরিবার এবং স¤প্রদায়ের ওপর গণহত্যার স্থায়ী ক্ষতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে উল্লেখ করে এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার শিকার মানুষগুলোকে স্বীকৃতি এবং শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

অবশ্য, সার্বিয়া সরকার বিষয়টিকে একইভাবে দেখছে না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবের ওপর বিতর্কের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট ভুসিচ হুঁশিয়ার করে বলেন, এই প্রস্তাব পাস হলে তা ‘প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিতে পারে’। আরো অনেক গণহত্যা নিয়েই তখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্রোয়েশিয়ায় নাৎসি বাহিনীর মিত্র সরকারের শাসনামলে সার্বরা গণহত্যার শিকার হয়েছিল উল্লেখ করে, তার জন্য জাতিসংঘে যে কখনো কোনো প্রস্তাব পাস হয়নি তা মনে করিয়ে দেন ভুসিচ। ওই ঘটনার জন্য সার্বিয়াও এমন একটি গণহত্যার প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভুসিচ দাবি করেন, ‘স্রেব্রেনিৎসা প্রস্তাবে কোনো সমাধানের বিষয় নেই, স্মৃৃতির বিষয় নেই বরং এতে নতুন ক্ষত সৃষ্টি হবে; শুধু আমাদের আঞ্চলিক পর্যায়ে নয়, এই পরিষদেও’। সার্বিয়া সরকারের এমন তীব্র বিরোধিতায় সেই দেশটিতেও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। কারণ, প্রস্তাবে সুনির্দিষ্টভাবে কেবল গণহত্যায় দায়ী ব্যক্তিদের কথাই বলা হয়েছে। স্পষ্ট করা হয়েছে, সেই দায় ‘নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় বা অন্য কোনো গোষ্ঠী বা স¤প্রদায়ের ওপর সামগ্রিকভাবে আরোপ করা যাবে না’।

স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এমন রুল জারি করলেও, এর জন্য ‘সার্বিয়াকে সরাসরি দায়ী বা সম্পৃক্ত নয়’ বলে উল্লেখ করা হয়। অবশ্য, সার্বিয়া গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন ওই আদালতের বিচারকরা।

এর তিন বছর পর, সার্বিয়ার জাতীয় সংসদে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। প্রতিরোধে আরো ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য ক্ষমাও চাওয়া হয় সেই প্রস্তাবে। ২০১৫ সালে সার্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় আলেকজান্ডার ভুসিচ ওই গণহত্যার ২০ বছর পূর্তিতে স্রেব্রেনিৎসায় শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। ওই সময় বিক্ষুব্ধদের কেউ কেউ তার দিকে বোতল এবং পাথর ছুড়ে মারে। কিন্তু তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, ‘তিনি বিরোধ নিষ্পত্তির নীতিতে অটল থাকবেন’। তবে প্রেসিডেন্ট ভুসিচ ও তার দেশ সার্বিয়া কখনো স্রেব্রেনিৎসার হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকার করেননি। অবশ্য, সার্ব জাতীয়তাবাদীদের অনেকে গণহত্যার হোতা বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা জেনারেল রাতকো ¤øাদিচকে একজন বীর হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে থাকেন।

যেমন, বসনিয়ার সার্ব অধ্যুষিত রিপাবলিকা স্রপস্কা প্রদেশের প্রেসিডেন্ট মিলোরাদ দদিক বরাবরই স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যার কথা নাকচ করে আসছেন। যদিও দেশটির আইনে গণহত্যা অস্বীকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসায় আট হাজার মুসলিমকে হত্যা করা ছিল সেই যুদ্ধের সবচেয়ে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। বসনীয় সার্ব বাহিনী স্রেব্রেনিৎসা দখল করে নেয় ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই। পরবর্তী কয়েকদিনে তারা ওই গণহত্যা চালায়। মুসলিম পুরুষ এবং বালকদের বেছে বেছে আলাদা করে হত্যা করা হয়, তারপর তাদের গণকবর দেয়া হয়। জেনারেল রাতকো ¤øাদিচের নেতৃত্বে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেখানে এই হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, সেটি ছিল জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ¤øাদিচের বিচারের সময় কৌঁসুলিরা বলেন, বসনিয়া থেকে বসনিয়ান মুসলিমদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার যে ঘৃণ্য পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, সার্ব বাহিনী ভিআরএস এর অধিনায়ক হওয়ার মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছিলেন জেনারেল ¤øাদিচ। সেদিন থেকে এই গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের সঙ্গে তিনি সরাসরি সংশ্লিষ্ট হন। কৌঁসুলিরা আরও বলেন, জেনারেল ¤øাদিচ এবং তার বাহিনী স্রেব্রেনিৎসায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। ¤øাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। বলকান যুদ্ধের গণহত্যার এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এর আগে সাবেক সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচকেও বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে বিচার শেষ হওয়ার আগেই তিনি কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App