×

শেষের পাতা

এসএমই মেলায় নজর কেড়েছে ইলোয়ারার সূঁচি শিল্পের কাজ

সুঁই সুতোয় ফুটিয়ে তোলা বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক বন্ধন

Icon

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সুঁই সুতোয় ফুটিয়ে তোলা বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক বন্ধন

ঝর্ণা মনি : লাল ব্যাকগ্রাউন্ডে সফেদ সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি-কালো কোট পরে ছোট্ট রাসেলকে কোলে নিয়ে বসে আছেন বাঙালির প্রবাদপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বামপাশে বাদামি রঙের পাড়ের অফ হোয়াইট শাড়িতে ঘোমটাপরা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, ডানপাশে গোলাপি রঙের কামিজ আর ফিরোজা রঙের সালোয়ার ওড়না পরিহিত ছোট কন্যা শেখ রেহানা, তার পাশে কালো শার্ট ও সাদা প্যান্টে শেখ কামাল, বঙ্গমাতার পাশে গোলাপি শার্টে শেখ জামাল, সব বামে নীল জমিনে ফিরোজা প্রিন্টের শাড়িতে শেখ হাসিনা। বাঙালির চিরচেনা এই ছবিটি কোনো বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা তৈলচিত্র নয়। নড়াইলের মেয়ে ইলোয়ারা পারভীন পরম যতনে সুঁই-সুতোর ফুঁড়ে ফুঁড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার মৃত্যুঞ্জয়ী মহানায়কের ঐতিহ্যগাথার এই পারিবারিক বন্ধনকে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পণ্য মেলার ‘এ’ হলের ১০১ নম্বর স্টলের ইলোয়ারা সূঁচি শিল্পের প্রতিটি শিল্পকর্ম দর্শক-ক্রেতার মনোযোগের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।

শুধু বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক ছবিই নয়, বঙ্গবন্ধুর একক ছবি, পিতা বঙ্গবন্ধুর ¯েœহের স্পর্শে কন্যা শেখ হাসিনার বহুল প্রচারিত ছবি, পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে অপত্য ¯েœহে মা শেখ হাসিনা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতান, অল রাউন্ডার সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মর্তুজা, লিওনার্দোর ‘মোনালিসা’ যেমন রয়েছে; তেমনি তার সুঁই-সুতোর কাব্যে ফুটে উঠেছে পাকিস্তানিদের বাঙালি নির্যাতনের দৃশ্য। রয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। গ্রাম বাংলার অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। মেলায় আসা ক্রেতা-দর্শনার্থীরা একবারের জন্য হলেও ঢুঁ মারেন তার স্টলে। চোখ বুলিয়ে নেন অপরূপ সূঁচি শিল্পে। মোহাম্মদপুর থেকে আসা শ্বাশতী রহমান তন্ময় হয়ে দেখছিলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ছবিটি। যেন তার মনের অজান্তেই বললেন, অপূর্ব! সুঁই-সুতায় কেউ কীভাবে এই অপূর্ব শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারে?

ইলোয়ারা পারভীন ভোরের কাগজকে বলেন, এস এম সুলতান আমার কাকা। কাকার কাছেই শিল্পের হাতেখড়ি। দীর্ঘ ২ যুগ ধরে সুঁই সুতার কাজ করছি। সাধনা করে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করছি। প্রথমে ছবি দেখে একটা আউটলাইন করি। তারপর সেই ছবি দেখে আমি হাতে সেলাই করি। ইডেন কলেজের দর্শন বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। এবার নিয়ে তিনবার এই মেলায় অংশ নিয়েছেন। তার শিল্পকর্ম ২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু। বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক ছবিটির দাম ৮ লাখ টাকা বলে জানান তিনি।

মেলায় চামড়াজাত পণ্যের ৩২টি স্টল রয়েছে। উন্নত ও গুণগত মানে ক্রেতারাও খুব খুশি। হল সির ১৬ নম্বর স্টল গুজ লিমিটেডের কর্ণধার মিতা বোস ভোরের কাগজকে বলেন, মেলায় বিক্রি ভালো চলছে। তবে এখনো ভিজিটর কম। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির প্রডাক্ট হওয়ায় দাম একটু বেশি। ফলে আমাদের ক্রেতা সীমিত। তিনি জানান, গুজের ওয়ালেটের দাম ৫০০ থেকে শুরু। বেস্ট কোয়ালিটির ব্যাগের দাম সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। তবে ক্রেতাদের কাছে বেশি চাহিদা সিগনেচার ব্যাগের। এটির দাম সাড়ে ৯ হাজার টাকা। মেলা থেকে চামড়ার জুতা কিনতে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লিটন আনোয়ার ভোরের কাগজকে বলেন, দাম একটু বেশি হলেও কোয়ালিটি খুব ভালো। এছাড়া একই ছাতার নিচে হওয়ায় দেখেশুনে কেনা যায়।

লেদারের সামগ্রী নিয়ে আরমাদিয়ার কর্ণধার সুলতানা এসেছেন মিরপুর থেকে। ?ব্যাগ, ছেলে-মেয়েদের জুতা, বেল্ট, চাবির রিং দিয়ে সাজানো তার স্টল। তার স্টলে রয়েছে ১০০ থেকে ৫ হাজার টাকার সামগ্রী। বললেন, বিক্রি ভালো চলছে। তবে মেলার শেষদিকে বিক্রি আরো বাড়বে।

মেলায় সবচেয়ে বেশি ক্রেতা সমাগম দেখা গেছে মেয়েদের কসমেটিকস ও কাপড়ের স্টলগুলোতে। বর্ণিল সব পোশাকের সমারোহ নিয়ে আছে ৭৫টি স্টল। এসব স্টল সেজেছে বাহারি শাড়িতে। টাই-ডাই, সুতোর কাজ, জামদানি, টাঙ্গাইল, ব্লক, বুটিকস, হ্যান্ড পেইন্ট, সিল্ক- কি নেই মেলায়? টাই-ডাই শাড়িগুলোর দাম আড়াই হাজার টাকা। হ্যান্ড পেইন্টের শাড়িগুলোর দাম ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। জামদানি শাড়িগুলোর দাম সাড়ে ৩ হাজার থেকে শুরু, ৪৫ হাজার পর্যন্ত। তবে ক্রেতাদের বেশি পছন্দ টাই-ডাই। সপ্তর্ষী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মনিকা দাস ভোরের কাগজকে জানান, বাটিক ও টাই-ডাই শাড়ি বেশি বিক্রি হচ্ছে। বাটিক সুতি এবং সিল্ক, দুটিরই কদর বেশি। রাজধানীর মালীবাগ থেকে মেলায় এসেছেন আসমা আক্তার। তিনি বলেন, প্রতি বছরই মেলায় আসি। মেলায় ভালো মানের কাপড় পাওয়া যায়। তাই পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করে নিয়ে যাই। বাইরে থেকে কাপড় কিনলে দামও বেশি রাখে, অনেক সময় কাপড়ের মানও খারাপ হয়। মেলায় এমনটা হয় না।

মেলায় আলাদা করে নজর কেড়েছে পাটজাত পণ্য। ক্রেতারাও ভিড় করে কিনছেন পাটের তৈরি ব্যাগ, ম্যাটসহ নানা পণ্য। মেলায় পাটজাত পণ্যের ৪২টি স্টল রয়েছে। পাটের বহুমুখী পণ্য নিয়ে মেলায় এসেছেন রুকাইয়া নাজনীন। তার স্টলে রয়েছে পাটের তৈরি ব্যাগ, শপিং ব্যাগ, ওয়াই ব্যাগ, গ্রোসারি ব্যাগ, হ্যান্ডিক্রাফট, হোম ডেকোরেশনের সামগ্রী। রুকাইয়া নাজনীন ভোরের কাগজকে বলেন, পাটপণ্য এখন আভিজাত্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্টলে ২৫০ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকার সামগ্রী রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের অনেকেই চাকরি ও ঘরের কাজের পাশাপাশি মনোযোগ দিয়েছেন ব্যবসা বাণিজ্যে। তেমনি একজন ইশিতা জাহাঙ্গীর। ২০২১ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে কারুপীঠ শুরু করেন ইশিতা জাহাঙ্গীর। পাপেট থিয়েটারে এ পাপেট শিল্পী জানান, তার শিক্ষায়তনে ৮০ জনের বেশি শিশু আছে। পাশাপাশি তৈরি করা পুতুল বিক্রি ও প্রদর্শন করছেন। আবার কয়েকজন উদ্যোক্তা মিলে তৈরি করেছেন ইনকিউবেশন সেন্টার। তারা খাবার, পোশাক ও পাট পণ্য নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছেন। তাদের স্টলে হাতের কাজ টু পিচ ২০০০ টাকার এর উপরে। শিল্পী রাশেদ ভোরের কাগজকে জানান, জামদানি রয়েছে ১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত। ওয়ান পিস ১৫০০ টাকা। কটি ৩৫০ টাকা। কাঁঠালের আচার দাম ২৫০ টাকা।

বেচাকেনার দৌড়ে নারীদের সাজসজ্জার জিনিসপত্র সব সময়ই এগিয়ে। মোহাম্মদপুর থেকে রিকশা প্রিন্ট নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছে আর্টজেনিক্স। স্বত্বাধিকারী রাইসা ভোরের কাগজকে জানান, রিকশা প্রিন্ট এখন বিশ্ব ঐতিহ্য। তাই গহনা সামগ্রী থেকে ত্রৈজসপত্র সব কিছুতেই রিকশাচিত্র নিয়ে মেলায় এসেছি। ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া মিলেছে। ১০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার পণ্যসামগ্রী রয়েছে মেলায়।

হাতির দাঁত, মহিষের হাড়, শিং, পাঠ, কাঠ, বাঁশ, বেত, হ্যান্ডমেড পেপার, বীজ, তামা, কাঁসা, পিতলের হস্তশিল্প নিয়ে লালবাগ থেকে ‘হস্তশিল্প খনি’ মেলায় নজর কেড়েছে ক্রেতাদের। স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ ইবনে হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, একটু ব্যতিক্রমী চিন্তা থেকেই এসব পণ্য উৎপাদন করি। দাম একটু বেশি, কিন্তু ক্রেতারা অবশ্যই জিতবেন; কারণ এসব পণ্য অবশ্যই ইউনিক।

মেলায় পণ্যের দাম বেশি বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। অন্যদিকে উদ্যোক্তারা বলছেন, ডলারের দামক বাড়াসহ নানা কারণে এবার পণ্যের দাম বাড়তি। উদ্যোক্তারা জানান, পণ্যের বাজারমূল্য ও শৈল্পিকমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন উদ্যোক্তারা। আয়োজক প্রতিষ্ঠান এসএমই ফাইন্ডেশন জানিয়েছে, এবারের মেলায় হস্তশিল্পের ৩৮টি প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের ২৭টি, ২৩টি হালকা প্রকৌশল পণ্যের, ১৪টি খাদ্যপণ্যের, ১৩টি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক (আইটি) পরিষেবা, ৫টি ভেষজ শিল্পপণ্যের ও ৫টি গয়নাপণ্যের প্রতিষ্ঠান মেলায় পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানের ১২টি এসএমই ক্লাস্টারের উদ্যোক্তারা মেলায় অংশ নিয়েছে। অন্যান্য খাতের মধ্যে প্লাস্টিক পণ্যের ৪টি, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস খাতের ৩টি, আসবাব খাতের ৩টি ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ১৯টি স্টল রয়েছে মেলায়। এছাড়া ৩০টি ব্যাংক, ১৫টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ক্লাব ও প্রায় ৫০টি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণকারীদের সেবা দিচ্ছে। অন্যদিকে এসএমই ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের এসএমই বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টারগুলো তাদের কার্যক্রম প্রদর্শন করছে এ মেলায়। এছাড়া উইন্ডি টাউন হলে সহজ অর্থায়ন, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্লাস্টার উন্নয়ন বিষয়ে প্রতিদিন সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রসঙ্গত. গত রবিবার (১৯ মে) শুরু হয়েছে ১১তম জাতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পণ্য মেলা। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে এই মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ মে পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App