×

শেষের পাতা

এভারেস্টে ফের লাল-সবুজের পতাকা ওড়ালেন বাবর আলী

Icon

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এভারেস্টে ফের লাল-সবুজের পতাকা ওড়ালেন বাবর আলী

চট্টগ্রাম অফিস : বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন চট্টগ্রামের সন্তান মো. বাবর আলী। পেশায় চিকিৎসক বাবর বাংলাদেশিদের মধ্যে ষষ্ঠ এবং চট্টগ্রামের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করলেন। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান তিনি। বেজক্যাম্প টিমের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন অভিযানের প্রধান সমন্বয়ক ফরহান জামান।

এভারেস্ট জয় করলেও বাবরের অভিযান এখনো শেষ হয়নি। তিনি এবার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে জয় করতে চান এভারেস্টের সঙ্গে লাগোয়া পৃথিবীর চতুর্থ শীর্ষ পর্বত লোৎসেও। গতকাল রবিবার ক্যাম্প-৪ এ নেমে মাঝরাতে আবারো শুরু করবেন দ্বিতীয় লক্ষ্যের পথে যাত্রা। সব অনুকূলে থাকলে আজ (সোমবার) ভোরে তার লোৎসের চূড়ায় পৌঁছানোর কথা। এর আগে গত ৩০ মার্চ চট্টগ্রামে সংবাদ সম্মেলনে এসে বাবর আলী তার এভারেস্ট জয়ের স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। পরদিন ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয় তার এভারেস্ট জয়ের অভিযান। ৪ এপ্রিল নেপালের কাঠমান্ডু থেকে পৌঁছান লুকলাতে। ১০ এপ্রিল এভারেস্টের বেজক্যাম্পে পৌঁছান তিনি। এরপর একমাস ধরে অপেক্ষার পালা। ১৪ মে শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযান। ওইদিনই তিনি দ্বিতীয় ক্যাম্পে, ১৮ মে তৃতীয় ক্যাম্পে এবং ১৯ মে ভোরে ক্যাম্প ফোরে পৌঁছান। গতকাল ১৯ মে সকালে তিনি ২৯ হাজার ৩১ ফুট উচ্চতায় শৃঙ্গে আরোহণ করে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেন।

বাবরের সংগঠন ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের পক্ষে এভারেস্ট অভিযানের সমন্বয়ক ফরহান জামান বলেন, এভারেস্টের পথে

যাত্রা অর্থাৎ উচ্চতায় পৌঁছানোর আগে সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। ১০ এপ্রিল বাবর এভারেস্টের বেজক্যাম্পে পৌঁছালেও উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৪ মে মাঝরাতে বেজক্যাম্প থেকে শুরু হয় বাবরের যাত্রা। প্রথমদিনেই সরাসরি পাড়ি দেন ২১ হাজার ৩০০ ফুট অর্থাৎ ক্যাম্প-২ এ পৌঁছান। সেখানে দুই রাত কাটিয়ে ১৭ মে ২৪ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতার ক্যাম্প-৩ এবং ১৮ মে পৌঁছান ২৬ হাজার ফুট উচ্চতার ক্যাম্প-৪ এ, যেটাকে ডেথ জোন বলা হয়। মাঝরাতেই আবারো শুরু হয় বাবরের অভিযান। ভোরের সূচনায় বাবর ২৯ হাজার ৩১ ফুট উচ্চতার এভারেস্ট শৃঙ্গের শীর্ষে উড়িয়ে দেন বাংলাদেশের পতাকা।

সন্তানের এভারেস্ট বিজয়ে বাবরের বাবা-মা খুশিতে আত্মহারা। শুধু বাবর আলীর স্বজনরা নন, তার এমন অনন্য অর্জনে চট্টগ্রামও আনন্দে ভাসছে। বাবরের এভারেস্ট জয়ে আনন্দে আত্মহারা বাবা লিয়াকত আলী বলেন, বাবরের অনন্য এই অর্জনে আমরা খুবই খুশি। তিনি বলেন, বাবরের একটা শখ ছিল, এভারেস্ট জয় করবে। এবার তার সেই স্বপ্নপূরণ হলো। এটা বাবা হিসেবে আমার জন্য খুবই আনন্দের বিষয়। বাবা হিসেবে সন্তানের এমন অর্জন সত্যিই আপ্লুত করে। এখন তিনি তার ছেলের নিরাপদে ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন, একই সঙ্গে করছেন প্রার্থনা।

বাবরের মা লুৎফুন্নাহার বেগম বলেন, আমার ছেলে তার লক্ষ্যে পৌঁছেছে। আনন্দ লাগছে অবশ্যই। কিন্তু যখন সে এভারেস্টের দিকে যাত্রা করল, আমি খুব টেনশনে ছিলাম। যতক্ষণ না পর্যন্ত সে পাহাড় থেকে নেমে আসবে, ততক্ষণ তো আমার টেনশন যাবে না। তিনি আরো বলেন, ছোটবেলা থেকেই সে (বাবর) খুব দুরন্ত ছিল। তবে লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল। খেলাধুলার সব ইভেন্টে তার অংশগ্রহণ থাকত। তার একটাই শখ ছিল- পাহাড়ে-পর্বতে ঘোরাঘুরি। এটা তো একটা ডেঞ্জারাস (বিপজ্জনক) শখ। এজন্য আমরা টেনশনে থাকি।

বাবর আলীর বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বুড়িশ্চর গ্রামের নজু মিয়া হাট এলাকায়। বাবা লিয়াকত আলী কুয়েত প্রবাসী ছিলেন। ২০১৭ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। মা লুৎফুন্নাহার বেগম গৃহিণী। তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে বাবর দ্বিতীয়। বড় ভাই ব্যারিস্টার, অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। দ্বিতীয় বাবর আলী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে এমফিল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিজিটি সম্পন্ন করেন। একমাত্র বোন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কক্সবাজার জেলা আদালতে কর্মরত আছেন। সবার ছোট ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে বিকাশের মার্চেন্ট ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

২০১৭ সালে ভারতের উত্তর কাশীতে অবস্থিত ‘নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং’ থেকে বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ২০১৯ সালে পায়ে হেঁটে এবং পরে সাইকেলে দেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেন। এরপর ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে সাইকেলযাত্রা শুরু করেন বাবর আলী। এক মাসের চেষ্টায় প্রায় চার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তামিলনাড়–র কন্যাকুমারী গিয়ে থামেন তিনি। ২০২২ সালে ‘ভোমড়া-তামাবিল’, ২০২১ সালে ‘হালুয়াঘাট-কুয়াকাটা’, ২০১৭ সালে ‘টেকনাফ-তেতুলিয়া’ এবং ‘আখাউড়া-মুজিবনগর’ এই চারটি ক্রস-কান্ট্রি সাইক্লিং সম্পন্ন করেন। বাবর আলী দৌঁড়েছেন বহু ম্যারাথন ইভেন্টে। ২০১৯ সালে করেছেন কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই এবং ২০১৭ সালে কাপ্তাই-বিলাইছড়ি-কাপ্তাই কায়াকিং।

বাবর আলী লিখেছেন দুটি মৌলিক গ্রন্থ ‘পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা’ এবং ‘সাইকেলের সওয়ারি’। অনুবাদ করেছেন একটি গ্রন্থ ‘ম্যালরি ও এভারেস্ট’। এছাড়া তিনি নিয়মিত দেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও লিটল ম্যাগের জন্য অভিযানের গল্প লেখেন। এভারেস্ট জয়ের আগে আরো অনেক পর্বতশৃঙ্গ জয় করেন বাবর। ৪ হাজার ৯৮৪ মিটার উচ্চতার সারগো রি থেকে ৬ হাজার ৮১২ মিটার উচ্চতার মাউন্ট আমা দাবলাম- অন্তত ৯টি পর্বতশৃঙ্গ জয়ের রেকর্ড আছে বাবরের ভাণ্ডারে। তিনি এখন পর্যন্ত সারগো রি (৪ হাজার ৯৮৪ মিটার), সুরিয়া পিক (৫ হাজার ১৪৫ মি.), মাউন্ট ইয়ানাম (৬ হাজার ১১৬ মি.), মাউন্ট ফাবরাং (৬ হাজার ১৭২ মি.), মাউন্ট চাউ চাউ কাং নিলডা (৬ হাজার ৩০৩ মি.), মাউন্ট শিবা (৬ হাজার ১৪২ মি.), মাউন্ট রামজাক (৬ হাজার ৩১৮ মি.), মাউন্ট আমা দাবলাম (৬ হাজার ৮১২ মি.) ও চুলু ইস্ট (৬ হাজার ০৫৯ মি.) পর্বতের চূড়ায় উঠেছেন এই তরুণ।

প্রসঙ্গত, বাবর আলীর আগে আরো পাঁচজন এভারেস্ট জয় করেন। ২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের শীর্ষে ওঠেন মুসা ইব্রাহীম। ২০১১ ও ২০১২ সালে দুবার এভারেস্ট জয় করেন এম এ মুহিত। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ২০১২ সালের ১৯ মে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন নিশাত মজুমদার। একই মাসের ২৬ মে ওয়াসফিয়া নাজরীন জয় করেন এভারেস্ট। ২০১৩ সালের ২০ মে এভারেস্ট জয় করে নামার পথে মারা যান মো. খালেদ হোসাইন (সজল খালেদ), যিনি পঞ্চম বাংলাদেশি হিসেবে পর্বতজয় করেছিলেন। সেই অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর পর গত ১১ বছরে আর কোনো বাংলাদেশি এভারেস্টে অভিযান করেননি। ১১ বছর পর বাবর আলী আবার পৃথিবী সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ালেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App