×

শেষের পাতা

সহায়তার জন্য যাচ্ছেন রাষ্ট্রদূত

কিরগিজস্তানে সহিংসতায় বিপাকে অনেক শিক্ষার্থী

Icon

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ প্রতিবেদক : মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানে পড়াশোনা করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীরা। দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়রা এই হামলা করছে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ, ভারতীয় ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের সর্তকভাবে চলাফেরার নির্দেশ দিয়েছে দেশগুলোর দূতাবাস। তবে কিরগিজস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করে বলেছে, বিশকেকের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রসঙ্গত, গত ১৩ মে থেকে চলা সহিংসতায় এ পর্যন্ত ২৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পাকিস্তান ও মিশরের কিছু শিক্ষার্থী কিরগিজের স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মারধর করেছে- এমন ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশটির এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানায়, কিরগিজস্তানে দুর্বৃত্তদের হামলায় তিনজন পাকিস্তানি মেডিকেল শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। দেশটির একদল দুর্বৃত্ত বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নিশানা করেছে। বিশেষ করে রাজধানী বিশকেকের হোস্টেলে থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে গত শুক্রবার রাতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি ছাত্রের গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, তাসখন্দে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার জন্য শিগগিরই বিশকেক যেতে বলা হয়েছে।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, উজবেকিস্তান দূতাবাস বর্তমানে কিরগিজ প্রজাতন্ত্রে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সেই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো গুরুতর আহত বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যেই দূতাবাসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি জরুরি যোগাযোগ নম্বর শেয়ার করা হয়েছে যাতে করে এই বিষয়ে যে কোনো সমস্যায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। দূতাবাসের মাধ্যমে সরকার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখছে।

জানা গেছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে তোলপাড় চলছে মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানে। রাজধানী বিশকেকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর এ হামলা চালান স্থানীয়রা। এতে করে অন্তত ২৯ জন আহত হয়েছেন। যাদের বেশির ভাগই পাকিস্তানি ও ভারতীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে হামলার ভিডিও। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবন, সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের বেধড়ক পেটানো হচ্ছে। এ ঘটনার পর কিরগিজস্তানে অবস্থানরত ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এসব ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেল বা ক্যাম্পাস ছেড়ে বের না হওয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়। হামলার শিকার বিদেশি শিক্ষার্থীরা জানান, স্থানীয়রা হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছে। সেখানকার পুলিশ প্রশাসন কেউই তাদের সহায়তা করছে না।

দেশটিতে অবস্থান করা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব কিরগিজস্তানের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তানভীর মেহরাব জানিয়েছেন, এখানকার বর্তমান পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নেই। আমাদের হোস্টেলে স্থানীয়রা আক্রমণ করেছিল। তিনি বলেন, মূলত গত শনিবার আমাদের হোস্টেলে আক্রমণ করা হয়েছিল। আজকে আক্রমণ করা হচ্ছে আমরা যারা হোস্টেলের বাইরে বিভিন্ন বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি তাদের ওপর। বাসায় এসে দরজাতে নক করা হচ্ছে। আমরা খাবার কিনতে নিচে যেতে পারছি না। তানভীর মেহরাব আরো বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ঝুঁকিপূর্ণভাবেই আছি। আমরা এখানে নিরাপদে নেই। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব সমস্যার সমাধান হোক। দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আছেন বলে তিনি জানান। আর উজবেকিস্তানে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের ধারণা, ৬০০ থেকে ৭০০ শিক্ষার্থী এবং হাজারখানেক টেক্সটাইলের শ্রমিক কিরগিজস্তানে রয়েছেন।

কিরগিজস্তান থেকে চার্টার্ড ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা : কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সহিংসতার মাঝে আটকে পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা চার্টার্ড ফ্লাইটে

করে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। বিশকেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ড. জেরিত ইসলাম বলেন, গত শনিবার রাত থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে বড় কোনো হামলা হয়নি। কিন্তু কিছু স্থানীয় তরুণ বিদেশিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন ও লুটপাট চালিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি জানান, কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই হাজার ৭০০ পুলিশ মোতায়েন করেছে এবং আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে ড. জেরিত জানান, পরিস্থিতির উন্নতি সত্ত্বেও এখনো বিদেশি শিক্ষার্থীদের তাদের নিজ হোস্টেল ও অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বের হয়ে না আসার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা জুনে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শেষে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু এখন তারা চার্টার্ড ফ্লাইটে করে দেশে ফিরে পরবর্তীতে অনলাইনে পরীক্ষা দেবেন। আমরা উজবেকিস্তানে বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলেছি। সেখান থেকে আমাদের জানানো হয়েছে যে তারা কিরগিজস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের সহায়তা করবেন।

শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য কিরগিজে যাচ্ছেন বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত : কিরগিজের রাজধানী বিসকেকের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত মো. মনিরুল ইসলাম। কিরগিজস্তানে বাংলাদেশ দূতাবাস নেই এবং উজবেকিস্তান থেকে কিরগিজে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখাশোনা করেন মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, আমি কিরগিজে দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করছি এবং সেখানকার পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করব। রাষ্ট্রদূত আরো জানান, আমাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে বলে তারা আমাদের জানিয়েছে। শিক্ষার্থীদের চার্টার ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। আমরা বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাব।

যে কারণে উত্তেজনা বেড়েছে : স্থানীয় গণমাধ্যমের মতে, কিরগিজ ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারির ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরে উত্তেজনা বেড়ে যায়। গত ১৩ মে’র এই মারামারিকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আতিথেয়তার স্পষ্ট লঙ্ঘন মনে করেন স্থানীয়রা। গত শুক্রবার রাতেও বেশ কিছু কিরগিজ কর্মী রাস্তায় নেমেছিল। যদিও পুলিশ বলেছে, তারা ১৩ মে’র মারামারির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনজন শিক্ষার্থীকে আটক করেছে। ক্ষিপ্ত স্থানীয় জনতা প্রথমে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলগুলোকে টার্গেট করে, যেখানে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা থাকে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App