×

শেষের পাতা

চার কারণে গতিহারা নারী সংগঠন, নেই আন্দোলনে

Icon

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চার কারণে গতিহারা নারী সংগঠন, নেই আন্দোলনে

সেবিকা দেবনাথ : বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের নানা বাঁকে নারী সংগঠনগুলো ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র- প্রতিটি পর্যায়ে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করে আসছে। তবে পরিস্থিতি এখন বদলেছে। দাতা সংস্থার ফর্মূলা মেনে চলা, সরকারের চাপ, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নেতৃত্বের সংকটের কারণে নারী সংগঠনগুলোর শানিত ভাবটা বর্তমানে অনেকটাই অনুপস্থিত।

নারী নেত্রীদের কেউ কেউ বলছেন, অতীতের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করলে চলবে না। আন্দোলন সব সময় একই গতিতে চলে না। সময়ের বিবর্তনে আন্দোলনের রূপও বদলায়। তাছাড়া নেতৃত্বের সংকটও রয়েছে। সে কারণেই রাজপথে নারী আন্দোলন ও নারী সংগঠনকে দেখা যায় না। অপরদিকে কেউ কেউ বলছেন, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নারী সংগঠনগুলো এখন প্রজেক্টভিত্তিক কাজ করছে। দাতাদের অর্থায়নে চলার কারণে নিজেদের কার্যক্রমের ধরন বদলাতে বাধ্য হচ্ছে এসব সংগঠন। সরকারের পক্ষ থেকেও চাপে থাকতে হয়। আর সে কারণেই সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না তারা। দেশে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিস্তৃতির কারণেও নারী আন্দোলন গতি হারাচ্ছে।

দাতাদের অর্থায়নে চলার কারণে নারী সংগঠনগুলোর কাজের ধরন যে বদলেছে তা ২০১১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, কর্মজীবী নারী, দুর্বার নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক সংস্থা, বাঁচতে শেখা-এই ৫টি সংগঠনের উপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। ‘বিদেশি অনুদাননীতির পরিবর্তনে বাংলাদেশের নারী সংগঠনের অবস্থা’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নারী সংগঠনগুলোর দীর্ঘ পথ চলায় সহযাত্রী হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। মূলত ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি দেশে বিদেশি অনুদানের উপর নির্ভরশীল একটি বড় এনজিও খাতের আবির্ভাব হয়। সেই সময় নারী অধিকার ইস্যুটিকে উন্নয়ন ইস্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে উপস্থাপনের বিষয়টি বাংলাদেশের এনজিও খাতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তখন থেকেই দেশের নাগরিক সমাজের মধ্যে এনজিওগুলো অনেক ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। জেন্ডার ও উন্নয়ন ইস্যুতে দাতাদের অনুদান নেয়ার মধ্য দিয়ে দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় নারী সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড নানাভাবে প্রভাবিত হয়েছে। অনুদান নেয়ার শর্ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী সংগঠনের আন্দোলনমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিধি ও ধরনকে সীমিত করেছে। ওই সময়ের পর এনজিওগুলো বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে সেবা দেয়া ও অ্যাডভোকেসি সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের ছোট নারী সংগঠনের কাছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অর্থই হলো নারী আন্দোলন এবং সেবা দেয়া- এই দুই ভিন্ন ধরনের কাজের মধ্যে

ভারসাম্য রক্ষা করা। এ অবস্থায় নারী বিষয়ক বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা ও উদ্দেশ ঠিক রেখে কাজ করা নারী সংগঠনগুলোর জন্য সত্যিকার অর্থেই কঠিন হয়ে পড়েছে।

দেশের নারী আইনজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। এ সংগঠন প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ দেশে নারী ও শিশুদের জন্য সব সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিতে কাজ করা। সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী ভোরের কাগজকে বলেন, নারী আন্দোলন ও নারী সংগঠন দুটোই এখন প্রজেক্টভিত্তিক হয়ে গেছে। যে সংগঠনের কর্মপরিধির মধ্যে যা নেই এখন তারাই সেই বিষয়ে কাজ করছে। হাঙ্গার প্রজেক্টও যৌন হয়রানি নিয়ে কাজ করছে। এই সংগঠনের কর্মপরিধির মধ্যে কি যৌন হয়রানির বিষয়টি ছিল?

নেতৃত্বের শূন্যতাও নারী সংগঠনগুলোর ঝিমিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন এই নারী অধিকারকর্মী। তিনি বলেন, সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাব এবং আন্তরিকতার পাশাপাশি নেতৃত্বের সংকটও রয়েছে। দীর্ঘ সময় যারা নারী আন্দোলন ও সংগঠনের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের অনেকেই আজ নেই। তরুণ নেতৃত্বও তেমনভাবে গড়ে উঠছে না। আন্দোলনে কে নেতৃত্বে থাকবে, কে কার কাজটা কত বড় করে দেখাবে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। এগুলো সত্যিই হতাশ করে। তবে এত কিছুর পরেও কিছু কিছু মানুষ এখনো নারী আন্দোলনটাকে এগিয়ে নিতে চায়। এগিয়ে নিচ্ছেন।

সদস্যভিত্তিক নারী সংগঠন নারীপক্ষ। ১৯৮৩ সালে নারীকে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে নারীপক্ষ। সংগঠনের সদস্য ও প্রকল্প পরিচালক সামিয়া আফরীনও নারী সংগঠনগুলোর প্রজেক্টভিত্তিক কাজের বিষয়টি স্বীকার করলেন। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, প্রজেক্টভিত্তিক কাজ করায় নারী আন্দোলনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। ভয়-ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতায় অনেক নারী সংগঠন গুটিয়ে যাচ্ছে। নারী নেতৃত্বও তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। যে কারণে সংগঠনগুলো টিকে থাকতে পারছে না। ঢাকার বাইরে ছোট ছোট সংগঠনগুলোর অবস্থা আরো করুণ। ধর্মান্ধতা ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কারণেও নারী আন্দোলন ও নারী সংগঠনের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ছে। ১৯০৫ সালে বেগম রোকেয়া যে স্বপ্নের কথা বলেছেন সে বিবেচনায় আমরা যেন ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে গ্রামের অনেক নারীর খাদ্য ও কাজের খোঁজে শহরে অভিবাসনের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত হয় নিজেরা করি। দুঃস্থ নারীদের পুনর্বাসনের কার্যক্রম নিয়ে কাজ শুরু করা এই সংস্থার সমন্বয়কারী খুশি কবীর। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, নারী সংঠনগুলো আন্দোলন নয় প্রজেক্টভিত্তিক কাজ করছে। সরকারও এখন এনজিওদের মুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে চায় না। নারী সংগঠন যতই আন্দোলন করুক সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে তা বাস্তবায়িত হবে না। আর সে কারণেই অনেক সময় আন্দোলন চুপসে যায়। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইয়াসমিন হত্যার সময় আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম। তার বিচারও পেয়েছি। কিন্তু তনু হত্যার ক্ষেত্রে আন্দোলনটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। পরিবেশ পরিস্থিতি এবং অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। আগে সংগঠনগুলোর মধ্যে যেমন মেলবন্ধন ছিল এখন তা নেই। মাঠের আন্দোলনের চেয়ে স্মারকলিপি দেয়া, স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজগুলো হচ্ছে।

বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) ১৯৮৬ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য, বিশেষ করে পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীদের জন্য সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। বিএনপিএসের পরিচালক শাহনাজ সুমী ভোরের কাগজকে বলেন, নারী সংগঠনগুলো যেমন মাঠে কাজ করছে, তেমনি নারীবিরোধী পক্ষের শক্তিও বহুগুণ বেড়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে যারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন তারাও এই শক্তিটিকে ভয় পায়। জাতীয় কোনো সমস্যায় নারীবিরোধী শক্তিগুলো মাঠে না নামলেও নারী-ইস্যুতে তারা রাস্তায় নেমে যায়। এ কারণেও নারী আন্দোলন আশানুরূপ গতিতে এগুচ্ছে না।

দেশের সবচেয়ে প্রাচীন নারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। উপমহাদেশের নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃত বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরী বেগম সুফিয়া কামালের উদ্যোগে ১৯৭০ সালে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। আইন, সংবিধান ও বাস্তব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার সংরক্ষণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাসহ একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, বৈষম্যহীন পরিবার ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই সংগঠনের সূচনা। নারী সংগঠন প্রকল্পভিত্তিক হয়ে গেছে, অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখতে পারছে না- এমনটা মনে করেন না সংগঠনটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট ছক নেই। সময়ের প্রেক্ষিতে এর বদল হয়। যখন দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়, রাজপথে আন্দোলন থাকে তখন নারী আন্দোলন হয় এক ধরনের। নারীদের প্রয়োজনেও রাজপথে আন্দোলন হতে পারে। আবার অ্যাডভোকেসিও আন্দোলনের একটি ধরন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়টি থাকায় নারী ইস্যুটি বৈশ্বিকভাবেই গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ইস্যুকে সরকারও বিবেচনায় নিয়েছে। সে কারণেই রাজপথের আন্দোলন তেমনভাবে চোখে পড়ছে না। কিন্তু আমরা অ্যাডভোকেসির কাজগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাচ্ছি। এর মাধ্যমে আমরা কিছু দাবি পূরণেও সক্ষম হয়েছি। তাই বলে আমরা রাজপথের আন্দোলন ছেড়ে দিয়েছি, সব এনজিও হয়ে গেছে তেমনটা ভাবা ঠিক নয়। নারীর মানবাধিকার বাস্তবায়নের আন্দোলন চলছে, চলবে। সময়ের প্রেক্ষাপটে ধরনটা বদলেছে মাত্র।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App