×

শেষের পাতা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা

Icon

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা
কাগজ প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, যা টেকসই উন্নয়নের মূল উপাদান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমে তাদের জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।’ গতকাল বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘আইসিপিডি-৩০ : জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক বৈশ্বিক সংলাপ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ, বুলগেরিয়া, জাপান এবং ইউএনএফপিএ যৌথভাবে এর আয়োজন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের রূপান্তর একটি সমৃদ্ধ বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিমাণ ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো আন্তরিক হতে হবে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই বৈশ্বিক সংলাপ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ জাতিসংঘে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অব দ্য ফিউচার’-এর জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে সহায়ক হবে। জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ‘সামিট অব দ্য ফিউচার’-এর ঘোষণাপত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয় ব্যক্ত করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ইউএনএফপির নির্বাহী পরিচালক ড. নাতালিয়া কানেম, মালদ্বীপের সামাজিক ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রী আইশাথ শিহাম, কিরিবাতির নারী, যুব, ক্রীড়া ও সামাজিক বিষয়কমন্ত্রী মার্টিন মোরেত্তি, জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী ইয়াসুশি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা। বুলগেরিয়া সরকারের প্রতিনিধিও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার আরো কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে মানুষ ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। আমি আশা করি জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে সবার বিশেষ করে নারী ও শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে জনস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে বিশ্বের সব মানুষের বিশেষ করে মা, শিশু ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বৈশ্বিক সহযোগিতা আরো জোরদার করতে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া দরকার। একই সঙ্গে সংঘাত ও রাজনৈতিক কারণে উপদ্রুত ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দিকে মনোযোগ দেয়াও অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি। এ সময় মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী, ইসরায়েলের গণহত্যা ও আগ্রাসনের ফলে নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের কথা তিনি উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু ফিলিস্তিনে আজ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। দেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে পুনরায় সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর আমরা ‘আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন’-এর ১৫টি মূলনীতি বাস্তবায়নে জাতীয় জনসংখ্যা নীতি-২০১২ প্রণয়ন করি। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করতে জাতীয় জনসংখ্যা নীতিমালা-২০১২ কে আরো হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হালনাগাদ নীতিমালার মাধ্যমে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষতা উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং বুনিয়াদি শিক্ষার মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করা হবে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে দেশের মানুষের গড় আয়ু ২০২৩ সালে বেড়ে ৭২ বছর ৩ মাসে পৌঁছেছিল। বর্তমানে আমাদের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ কর্মক্ষম। শেখ হাসিনা বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে আমরা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাসহ ৩০ প্রকার ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ করছি। প্রায় তিন হাজার ক্লিনিকে ‘স্কিলড বার্থ এটেনডেন্স’ সেবা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন ৩ হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র/পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে মা, শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসেবা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২০০টি কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক স্বাভাবিক প্রসবসেবা দেয়া হচ্ছে। প্রসূতিসেবার জন্য এসব কেন্দ্রে ৪ জন করে ধাত্রী নিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার ধাত্রী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া মা ও শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৩ লাখ উপকারভোগীকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু হার প্রতি হাজারে ২১ জন, যা ২০০৬ সালে ছিল হাজারে ৮৪ জন। একইভাবে মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখে ২০০৬ সালের ৩৭০ জন থেকে ১৩৬ জনে হ্রাস পেয়েছে। বাল্যবিয়ে, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের মেয়েদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে তাদের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়তে হবে। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমরা ১ হাজার ২৫৩টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রে কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কর্নার প্রতিষ্ঠা করেছি। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত প্রায় ৫০ লাখ কিশোরীকে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের উদ্যোগ ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে দেশব্যাপী ‘স্কুল মিল’ চালু করা হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের বিশ্বের সর্ববৃহৎ কর্মসূচি চালুর অংশ হিসেবে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ৪৬৪ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উপবৃত্তি ব্যবস্থা চালু ও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বাজেটের মোট ৩০ শতাংশ নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য আমরা বরাদ্দ রেখেছি। বেইজিং ঘোষণা ও কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ও জাতীয় কর্মসূচি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের শ্রম শক্তির ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আইসিটি খাতে ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘গেøাবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৩’ অনুযায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং এই অঞ্চলে প্রথম। জলবায়ু নিয়ে পদক্ষেপে ঝুঁকি কমেছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারিকে প্রধানমন্ত্রী : কাগজ প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বর্তমান সরকার নানা পদক্ষেপ অনুসরণ করেছে। ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্দশা কমেছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নির্বাহী পরিচালক এবং জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ড. নাতালিয়া কানেম গতকাল বুধবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বৈঠকে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, প্রজনন স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ ও নারী শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্কুল পরীক্ষায় মেয়ে শিক্ষার্থীরা সংখ্যা ও শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্য উভয় ক্ষেত্রেই ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে। সা¤প্রতিক এসএসসি পরীক্ষায় মেয়ে শিক্ষার্থীরা নম্বর ও পাসের শতাংশে ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে। এটি আমাদের মেয়েবান্ধব নীতির জন্য সম্ভব হয়েছে। অনেক অভিভাবক অতীতে এমনকি তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পর্যন্ত ইচ্ছুক ছিলেন না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর ১৯৮১ সালে আমি যখন দেশে ফিরে আসি তখন যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারের জন্য নীতি প্রণয়ন করি। শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচি প্রবর্তনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ আমরা নিই। এছাড়া এখন মেয়েদের কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত হওয়ায় প্রচুরসংখ্যক মেয়ে স্কুলে আসছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে চমৎকার সাফল্য অর্জন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব আজিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App