×

শেষের পাতা

‘মা’র জন্য ভালোবাসা

Icon

ঝর্ণা মনি

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘মা’র জন্য ভালোবাসা
প্রথম স্পর্শ, প্রথম শব্দ, প্রথম ভালোবাসা মা। জন্মের পর যার সঙ্গে সন্তানের সবচেয়ে বেশি মিতালি, তিনি মা। মায়া এবং কায়া উভয়ই মা; যিনি সন্তানের জন্য হাসতে হাসতে নিজের বলিদান দিতেও দুবার ভাবেন না। ‘মা’ ছোট্ট একটি শব্দ; কিন্তু পৃথিবীর সব থেকে মধুর ডাক। মাকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে কোনো দিনক্ষণ প্রয়োজন হয়। মায়ের জন্য প্রতিদিনই সন্তানের ভালোবাসা থাকে। তবুও মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ মাকে জন্য ভালোবাসার, শ্রদ্ধা জানানোর দিন। আজ বিশ্ব মা দিবস। পৃথিবীর সব মাকে সম্মান জানানোর দিন। 

বিশ্লেষকদের মতে, ‘মা’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘মম’, যা পূর্বে ব্যবহৃত শব্দ ‘মাম্মা’র পরিবর্তিত রূপ। ধারণা করা হয়, ইংরেজি শব্দ মাম্মা এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘মাম্মা’ থেকে। যা ‘স্তন’ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। এই শব্দ থেকে ‘ম্যামেল’ শব্দের উৎপত্তি। যা কিনা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ইংরেজি প্রতিশব্দ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ‘মা’ কে বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দগুলোর উচ্চারণ প্রায় কাছাকাছি। আর সবগুলো শব্দের শুরুতেই ব্যবহৃত হয়েছে ‘এম’ অথবা ‘ম’ বর্ণটি। জার্মান ভাষায় ‘মাট্টার’, ওলন্দাজ ভাষায় ‘ময়েদার’, ইতালিয়ান ভাষায় ‘মাদর’, চীনা ভাষায় ‘মামা’, হিন্দি ভাষায় ‘মা’, প্রাচীন মিসরীয় ভাষায় ‘মাত’, সোয়াহিলি ভাষায় ‘মামা’, আফ্রিকান ও বাংলা ভাষায় ‘মা’। মা মানেই সর্বংসহা। মা চিরন্তন ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রতীক। 

তুলনাহীন ভালোবাসার এক মহাসমুদ্রের নাম মা। সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য মায়ের ত্যাগ তিতিক্ষার কোনো পরিমাপ নেই। পরিমাপ করা যায় না মায়ের ভালোবাসাও। মাকে নিয়ে গল্প উপন্যাস লিখে কেউ মায়ের প্রকৃত ভালোবাসার দৃষ্টান্ত যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি, পারবেও না। পৃথিবীভরা এত ভাষা, এত শব্দ; কিন্তু আপনি যখন মাকে নিয়ে লিখতে যাবেন- শব্দের ঘাটতি পড়ে যাবে। মায়ের উদাহরণ মা নিজেই। মায়ের কোনো বিকল্প নাই। মায়ের গল্পের নায়ক প্রকৃত মায়েরাই হয়। তবুও মাকে নিয়ে লেখা হয়েছে শত সহস্র কবিতা, গান। সেই গানে ব্যক্তি মা যেমন রয়েছে; তেমনি দেশকে মা সম্বোধন করেও লেখা হয়েছে গান, কবিতা। মাকে নিয়ে লিখেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘মনে পড়া’ কবিতায়। তিনি মমতাময়ী ও জন্মদাত্রী মায়ের স্মৃতিচারণ করতে চেয়েছেন। 

কবির ভাষায়, ‘মাকে আমার পড়ে না মনে। শুধু যখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে একটা কি সুর গুনগুনিয়ে কানে আমার বাজে, মায়ের কথা মিলায় যেন আমার খেলার মাঝে। মা বুঝি গান গাইত আমার দোলনা ঠেলে ঠেলে- মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে।’ শামসুর রাহমানের ‘কখনো আমার মাকে’, হুমায়ুন আজাদের ‘আমাদের মা’, আল মাহমুদের ‘নোলক’, কালিদাস এর ‘মাতৃভক্তি’ কবিতার চেয়েও বাস্তব জীবনের রূপকথার গল্প যেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা বায়েজিদ বোস্তামীর মাতৃভক্তি। মাকে দেখতে ঝড়ের রাতে সাঁতরে দামোধর নদী পাড় হয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আর মায়ের পিপাসা মেটাতে পানি হাতে সারা রাত মায়ের শিয়রে জেগে ছিলেন বায়েজিদ বোস্তামী। 

যেভাবে মা দিবস : ‘আমি ভীষণ ভালোবাসতাম আমার মা-কে/ কখনো মুখ ফুটে বলিনি।/ টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে/ কখনো কখনো কিনে আনতাম কমলালেবু/ শুয়ে শুয়ে মা-র চোখ জলে ভরে উঠত/ আমার ভালোবাসার কথা/ মা-কে কখনো আমি মুখ ফুটে বলতে পারিনি।’ ‘জননী জন্মভূমি’ কবিতায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এভাবেই তুলে ধরেছেন সন্তানের মনোজগত চিত্র। মানসিক বিকাশ থেকে শুরু করে জীবনের সফলতা প্রতিটি পদক্ষেপেই মায়ের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সন্তানের জন্য সব থেকে বেশি যে আত্মত্যাগ করতে বিশেষ এই দিবসটি কীভাবে এলো তা হয়তো অনেকেরই অজানা। ইতিহাস বলছে, অনেক পথ পেরিয়ে এই দিবসটি নতুন রূপ পেয়েছে। ধারণা করা হয়, মা দিবসের সূচনা প্রাচীন গ্রিসের মাতৃরূপী দেবী সিবেলের এবং প্রাচীন রোমান দেবী জুনোর আরাধনা থেকে। এছাড়া ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য অনেক আগে থেকেই মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবারকে বেছে নিয়েছিলেন। ষোড়শ শতকে এটি ইংল্যান্ডে মাদারিং সানডে বলে পরিচিতি লাভ করে। অনেকেই ক্যাথলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী এটিকে লেতারে সানডে যা লেন্টের সময়ে চতুর্থ রবিবারে পালন করতে শুরু করে। 

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, জুলিয়া ওয়ার্ড হোই রচিত ‘মাদার্স ডে প্রক্লামেশন’ বা ‘মা দিবসের ঘোষণাপত্র’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস পালনের গোড়ার দিকের প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৮৭০ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পৈশাচিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে শান্তির প্রত্যাশায় সমাজকর্মী জুলিয়া একটি ঘোষণাপত্র লেখেন। এরপর যুদ্ধ শেষে পরিবারহীন অনাথদের সেবায় ও একত্রীকরণে নিয়োজিত হন মার্কিন সমাজকর্মী আনা রিভিজ জার্ভিস ও তার মেয়ে আনা মেরি জার্ভিস। এ সময় তারা জুলিয়া ওয়ার্ড ঘোষিত মা দিবস পালন করতে শুরু করেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আনা রিভিজ জার্ভিস ১৯০৫ সালের ৫ মে মারা যান। তার মৃত্যুর পর মেয়ে মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশে কাজ শুরু করেন। বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে ১৯০৮ সালে তার মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন, সেখানে সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের সূচনা করেন। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মায়েদের জন্য উৎসর্গ করে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। 

মা তুঝে সালাম : ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি/ কিন্তু জেনো ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর/ ত্রিভূবনে নাই।’ ‘মা’ কবিতায় হৃদয়ে আঁকা মায়ের প্রতিচ্ছবি এভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কবি কাজী কাদের নেওয়াজ। ছোট্ট মা শব্দটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশালতা, আকাশের চেয়ে বড় উদার, মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর। আজ রবিবার সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে সবাই পালন করে মা দিবস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভরে ওঠে মায়ের সঙ্গে সন্তানদের ছবিতে, নানা লেখায়। বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ অনেক বেশি মানুষ নিজের মাকে ফোন করবেন, তার জন্য ফুল ও উপহার দেবেন। তবে বছরের শুধু একটি দিনই নয়; বরং আজকের দিনটিকে কেন্দ্র করে বছরের ৩৬৫ দিনই হোক মা দিবস। মাতৃস্নেহে আগলে থাকুক মায়ের সন্তানরা। ভালো থাকুন পৃথিবীর সব মা। সুস্থ থাকুন। মা তুঝে সালাম। হ্যাপি মাদার্স ডে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App