×

শেষের পাতা

হোল্ডিং ট্যাক্স বেড়েছে সিলেটে নগরবাসীর অসন্তোষ, বিক্ষোভ

Icon

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হোল্ডিং ট্যাক্স বেড়েছে সিলেটে নগরবাসীর অসন্তোষ, বিক্ষোভ
সিলেট অফিস : সিলেট নগরীতে হঠাৎ এক লাফে ৫ থেকে ৫০০ গুণ বেড়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স। কারো কারো বেড়েছে আরো বেশি। সিলেট সিটি করপোরেশন কর্তৃক অস্বাভাবিকহারে বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে নগরজুড়ে চলছে বিক্ষোভ-অসন্তোষ। হোল্ডিং ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবিতে বিবৃতির পাশাপাশি রাজপথে পালিত হচ্ছে প্রতিবাদ কর্মসূচি। গত বুধবার রাতে নগরীর দক্ষিণ সুরমায় প্রতিবাদ সভা চলাকালে সিসিক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু উল্টো জনতার রোষানলে পড়েন মেয়র। এছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন নগরবাসী। সমাবেশে সিসিকের লাগামহীণ ও অযৌক্তিক ট্যাক্স বাড়ানোর নিন্দা জানান নগরের বিশিষ্টব্যক্তিরা। এমন সিদ্ধান্ত থেকে সিসিক কর্তৃপক্ষকে সরে আসার আহ্বান জানান তারা। এমন প্রতিবাদ সমাবেশ নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিদিনই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ এটি মানুষের জন্য মরার উপর খাঁড়ার গা। এদিকে হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জনগণের ভোগান্তি বা কষ্ট হয় এমন কোনো কাগজে আমি স্বাক্ষর করব না। আর এই বিষয়টিও সম্মানিত নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাব। নগরীর শামীমাবাদ এলাকার এক বাসিন্দা রুবেল আহমদ বছরে ৬০০ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স দিতেন। কিন্তু পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নের পর তার বার্ষিক গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬০০ টাকা নির্ধারণ করেছে সিটি করপোরেশন, যা আগের চেয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬১ গুণ। খাসদবির এলাকার এক ব্যক্তি আগে বছরে হোল্ডিং ট্যাক্স দিতেন ২০০ টাকা। এখন তার এই ট্যাক্স করা হয়েছে ৩৬০০ টাকা। এভাবে নগরীর প্রায় সব ট্যাক্সধারির জন্য ২০০ গুণ থেকে ৫০০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স। ফলে জনমনে বিরাজ করছে ক্ষোভ। জানা গেছে, নগরীর প্রায় পৌনে এক লাখ ভবনমালিকের গৃহকর ৫ থেকে ৫০০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। একাধিক ভবনমালিক জানান, গত ৩০ এপ্রিল থেকে সিটি করপোরেশন নতুন নির্ধারিত হোল্ডিং ট্যাক্স অনুযায়ী ভবনমালিকদের ট্যাক্স পরিশোধের নোটিস দেয়া শুরু করে। একলাফে ‘অসহনীয়ভাবে’ হোল্ডিং ট্যাক্স বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ভবন মালিকরা। এ নিয়ে তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। নগরবাসী দ্রুত এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। সিসিকের রাজস্ব শাখা জানিয়েছে, নতুন হোল্ডিং ট্যাক্সে আবাসিক ভবনের প্রতি বর্গফুট পাঁচ টাকা ও বাণিজ্যিক ভবনের প্রতি বর্গফুটের জন্য আট টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে সুর্নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালার আলোকে এই ট্যাক্স আদায় করা হয়নি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে আবাসিক ভবনের প্রতি বর্গফুট তিন টাকা ও বাণিজ্যিক ভবনের প্রতি বর্গফুটের জন্য পাঁচ টাকা নির্ধারিত ছিল; যদিও মেয়রের কাছে আবেদন করে অনেকে এর চেয়ে অনেক কম হোল্ডিং ট্যাক্স দিতেন। ভবন মালিকদের অভিযোগ, পুনর্মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেক আবাসিক কাঁচা কিংবা আধা পাকা ভবনের ক্ষেত্রেও ১০ থেকে ৫০ গুণ পর্যন্ত গৃহকর অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। সিসিকের রাজস্ব শাখার তথ্যানুযায়ী, ২০১৯-২০ সালে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান শেষে হোল্ডিং সংখ্যা পুনর্নির্ধারিত হয়। এতে পুরনো ২৭টি ওয়ার্ডে হোল্ডিং নির্ধারিত হয় ৭৫ হাজার ৪৩০টি। এসবের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১১৩ কোটি ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪০০ টাকা। নতুন ট্যাক্স ধার্যের সময় ধরা হয় ২০২১-২২ সাল। সেই করারোপের তালিকাই ৩০ এপ্রিল প্রকাশ করা হয়েছে। তবে নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ১৫টি ওয়ার্ডের হোল্ডিং ট্যাক্স এ তালিকায় আসেনি। সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান খান বলেন, নতুন হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে আপত্তি থাকলে ১৪ মে পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা আপত্তি জানাতে পারবেন। পরে রিভিউ বোর্ডে শুনানির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হবে। করপোরেশনের একটি সূত্রের দাবি, সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিগত পরিষদের গৃহকরবিষয়ক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নই বর্তমান মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পরিষদ করছে। যোগাযোগ করলে আরিফুল হক চৌধুরী দাবি করেন, তার পরিষদ প্রতি বর্গফুটে দুই টাকা বাড়িয়েছে। কিন্তু এখন কয়েকশ গুণ হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ার বিষয়টি যেমন শোনা যাচ্ছে, তারা সেটা করেননি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে নগর ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত মানুষ নতুন হোল্ডিং ট্যাক্সের নোটিস হাতে অসন্তোষ জানাচ্ছেন। তারা করপোরেশনের অস্থায়ী বুথে আপত্তি জানিয়ে আবেদনপত্র দাখিল করছেন। কুমারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ তৌফিক এলাহী চৌধুরী জানান, তার টিনশেডের বাসায় পরিবার নিয়ে তিনি থাকেন। আগে বছরে ৭০০ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স দিতেন। এখন তাকে ৪ হাজার ৩২০ টাকা দিতে বলা হয়েছে। অথচ তার বাসার ধরন কিংবা আয়তন, কোনোটাই বদলায়নি। গত সোমবার বিকালে নগরের আম্বরখানা এলাকায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে। বাসদ সিলেটের আহ্বায়ক আবু জাফরের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তারা নতুন হোল্ডিং ট্যাক্সকে অযৌক্তিক ও গণবিরোধী বলে অভিহিত করেন। একই দিন রাত ৮টায় জিন্দাবাজার এলাকার সিলেট নজরুল একাডেমিতে জাসদ সিলেটের সভাপতি লোকমান আহমদের আহ্বানে ‘লাগামহীন ও অযৌক্তিক গৃহকরের পরিপ্রেক্ষিতে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা হয়। এতে বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, যারা হোল্ডিং কর দেয়, তাদের ওপর বোঝা না চাপিয়ে নতুন করদাতা তৈরি করা উচিত। হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর আগে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যখন মানুষের নাভিশ্বাস, তখন এমন ভৌতিক হোল্ডিং ট্যাক্স মেনে নেয়া যায় না। এই কার্যক্রম স্থগিত করে সহনীয় হারে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানো হোক। এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমি একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। নগরীর সর্বস্তরের জনগণ মেয়র পদে নির্বাচিত করেছেন। জনগণের ভোগান্তি বা ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। হোল্ডিং কর নিয়ে যদি কোনোরূপ অসঙ্গতি/অমিল পাওয়া যায় অবশ্যই ফরম-ডি এর মাধ্যমে আপত্তি করার ব্যবস্থা রয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App