×
Icon ব্রেকিং
বরগুনায় সেতু ভেঙে বিয়ের মাইক্রোবাস খালে, নিহত ১০

শেষের পাতা

কংক্রিটের নগরে অপরূপ কৃষ্ণচূড়া

Icon

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কংক্রিটের নগরে অপরূপ কৃষ্ণচূড়া
ঝর্ণা মনি : বৈশাখের আকাশে ফুটন্ত সূর্য, রোদ্দুরে তপ্ত প্রকৃতি, গরম লু হাওয়া। তাপদাহে বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রকৃতি যখন পুড়ছে তাপপ্রবাহে, ঠিক তখনই রুক্ষতাকে হার মানিয়ে প্রকৃতি যেন হেসে উঠেছে নতুন করে। কোথাও টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়া, কোথাও কমলা রঙের রাধাচূড়া। কোথাও আবার ছেয়ে আছে স্নিগ্ধ বেগুনি রঙের জারুল। পথ চলতে থমকে দাঁড়িয়ে এসব ফুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেননি, এমন মানুষ পাওয়া ভার হবে নিশ্চয়ই। আর মিষ্টি হলুদ রঙের সোনাঝরা সোনালুর ঝলমলে চাহনি গ্রীষ্মের রূপে যোগ করে দ্বিগুণ মাত্রা। রোদ ঝলমলে দিনে, নীল আকাশের নিচে গ্রীষ্মের বাহারি ফুল দিগন্তকে যেন সাজিয়ে তুলেছে মোহনীয় রূপে। নগরীর বিভিন্ন সড়কে, উদ্যানে, পার্কে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল, সোনালুর বাহারির রূপ বিমোহিত পথিককে দিচ্ছে দু’দণ্ড প্রশান্তির অবসর। পথিকমন যেন বলছে, ‘যেখানে কৃষ্ণচূড়া লালে লাল!/ যেখানে বন্ধু হবে/ কিছু সাঁওতাল/ আরো দূরে, ঘুরে ঘুরে,/ চলো না হেঁটে আসি/ চলো না পাশাপাশি।’ তবে এসব বাহারি ফুলের মধ্যে কৃষ্ণচূড়ার আধিক্যই বেশি পরিলক্ষিত। এ ঋতুতে কখনো কালবৈশাখীর রুদ্র তাণ্ডব, কখনো রোদের খরতাপ। একই সঙ্গে গাছগাছালিতে নানা জাতের পাখিদের কিচিরমিচিরও প্রকৃতিতে প্রাণ ফেরার কথাই জানান দিচ্ছে। এমন রুক্ষ গ্রীষ্মে গাছে গাছে রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া সৌন্দর্য বিলাচ্ছে নীরবে। ঝলমলে রঙের খেলা আর কখনো কখনো বাতাসে সোঁদা গন্ধে আপন ছন্দ তুলে ধরেছে প্রকৃতি। কংক্রিটের ছাই রঙের ঢাকাকে রূপসী করে তুলতে কৃষ্ণচূড়ার অবদানই সবচেয়ে দৃশ্যমান। এই বৈশাখে ঢাকার প্রায় প্রতিটি এলাকার অলিগলিতে বাতাসে দোল খায় কৃষ্ণচূড়া। তবে বিমানবন্দর, সংসদ ভবন, রমনা, হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ, হাতিরঝিল, চন্দ্রিমা উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কৃষ্ণচূড়ার আগুন রূপ চোখে পড়ে। কৃষ্ণচূড়ার এই মায়াবী আহ্বান পথচারী সব বয়সের মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। কেননা- দুঃখ, যন্ত্রণা, বঞ্চনা, হতাশা ও সংশয়ে ভরা আমাদের যাপিত জীবনে ফুল ও বৃক্ষ আনন্দ আর প্রেমের এক অফুরান উৎস। কৃষ্ণচূড়া ফুলের বর্ণ-বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। গাঢ় লাল, লাল, কমলা, হলুদ এবং হালকা হলুদের এক দীর্ঘ বর্ণালিতে বিস্তৃত এর পাপড়ির রঙ। প্রথম ফোটার উচ্ছ¡াস আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে এলেও বর্ষার শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণচূড়ার গাছ থেকে ফুলের রেশ হারিয়ে যায় না। শুধু ফুল নয়, পাতার ঐশ্বর্যেও কৃষ্ণচূড়া অনন্য। এই পাতার সবুজ রং এবং সূ² আকৃতি অতিশয় আকর্ষণীয়। গ্রীষ্মের খেয়ালি হাওয়ায় নম্র, নমনীয় পাতাদের নৃত্য বড়ই দৃষ্টি শোভন। কৃষ্ণচূড়ার কচি ফলেরা পাতার মতোই সবুজ। তাই পাতার ভিড়ে সহজে তাদের দেখা যায় না। শীতের হাওয়ায় পাতা ঝরে গেলেই ফল চোখে পড়ে। পাকা ফল গাঢ় ধূসর। পাতাহীন কৃষ্ণচূড়ার শাখায় তখন ফল ছাড়া আর কিছুই থাকে না। বসন্তে আবার কৃষ্ণচূড়ার দিন ফেরে। একে একে ফিরে আসে পাতার সবুজ, প্রস্ফুটনের বহুবর্ণের দীপ্তি নিঃশব্দে ঝরে পড়ে বির্বণ ফলেরা। কৃষ্ণচূড়া ফিরে পায় তার দৃষ্টি নন্দন শোভা। তবে আমাদের দেশে পথের ধারে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বনে-জঙ্গলে সবখানেই এই ফুলের আধিক্য থাকলেও এর আদি নিবাস সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার। সেখানকার শুষ্ক পত্রঝরা বৃক্ষের জঙ্গলেই এর দেখা মেলে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৮২৪ সালে মাদাগাস্কার থেকে মরিশাসেই প্রথম আনা হয় এই ফুল। পরে সেখান থেকে ইংল্যান্ড এবং অবশেষে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার ঘটে। এভাবেই এই ফুল জন্মাতে শুরু করে ভারতবর্ষ, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন, ক্যারাবিয়ান অঞ্চল, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কালক্রমে বাংলাদেশও যুক্ত হয় সে তালিকায়। কৃষ্ণচূড়া ছাড়াও এই ফুলের আছে ভিন্ন ভিন্ন নাম। বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিক্স রেজিয়া। ডেলোনিক্স শব্দটি গ্রিক শব্দ। যার অর্থ দাঁড়ায়- ‘দৃশ্যমান থাবার মতো’। আবার ইংরেজিতে বেশ কয়েকটি নাম লক্ষণীয়। যেমন ফ্লেম ট্রি, রয়্যাল পৈন্সিয়ানা, ফ্ল্যাম্বোয়ান্ট এবং পিকক ফালুয়ার নামেও এটি পরিচিত। হিন্দিতে কৃষ্ণচূড়াকে বলা হয় গুলমোহর। গ্রীষ্মের তাপদাহে ক্লান্ত নয়নে প্রশান্তির বার্তাবাহক এই কৃষ্ণচূড়া। উঁচু আসনে লাল বসনে রানির বেশধারী কৃষ্ণচূড়া প্রকৃতির মাঝে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে যেন। ডালে ডালে চোখ ধাঁধানো রঙের ঔজ্জল্য ছড়ায় রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া। দীর্ঘ, প্রসারিত গাছে ফুলের প্রাচুর্য লাল হয়ে ওঠে আকাশে-বাতাসে। এ যেন লাল রঙের এক মায়াবী ক্যানভাস, চোখে, মনে এনে দেয় শিল্পের এক মায়াবী দ্যোতনা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App