×

শেষের পাতা

তিন দিনে অস্বাভাবিক রেমিট্যান্স

Icon

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তিন দিনে অস্বাভাবিক রেমিট্যান্স
কাগজ প্রতিবেদক : ঈদের আগে সাধারণত দেশের প্রবাসী আয় বেড়ে যায়, আর ঈদের পরে কিছুটা কমে। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিষয়টি পুরো উল্টো ঘটেছে। ঈদের আগের ১২ দিনে গড়ে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। আর ঈদের পর এপ্রিলের শেষ ৩ দিন গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে ১২ কোটি ডলার। আর শুধু শেষ দিনেই রেমিট্যান্স এসেছে ১৩ কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ সদ্যবিদায়ী এপ্রিল মাসের শেষ দিকে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকহারে বেড়েছে রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য ওঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিরা ২০৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১১০ টাকা ধরে)। দৈনিক গড়ে এসেছে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ৭৪৮ কোটি টাকা। তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ ৩ দিনেই রেমিট্যান্স এসেছে ৩৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ শেষ ৩ দিনে গড় রেমিট্যান্স এসেছে ১২ কোটি ডলার করে। মাসের শেষে হঠাৎ করে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হককে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেক সময় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। কোনো কোনো ব্যাংক তখন এগ্রেসিভলি টাকা সংগ্রহ করে। তিনি বলেন, কিছু বড় বড় এজেন্ট এখানে ঢুকে গেছে। নেগোসিয়েশন করে একসঙ্গে অনেক টাকা নিয়ে পাঠিয়ে দেয় দুবাইতে। সেখান থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। আর এজন্যই এখন সৌদি আরব থেকে টাকা আসা কমে গেছে। আরব আমিরাত থেকে বেড়েছে। যদিও বিষয়টি সঠিক পথে আনা বলে না। কিন্তু রিটেইল যারা তারা এখন আর বড় এজেন্টদের কারণে সরাসরি পাঠাতে পারে না। মার্কেটের স্ট্রাকচার পরিবর্তন হয়ে গেছে। তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে কমিউনিটি ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, শরীয়াহভিত্তিক আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, বিদেশিখাতের হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে। তবে তথ্য বলছে, দেশের প্রধান সব শ্রমবাজার থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ইউএই থেকে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩২৭ কোটি ৭ লাখ ডলার। একই সময়ে প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব থেকে ১৯৬ কোটি ৬৯ লাখ ডলার এসেছে। অর্থাৎ সৌদি আরবের সঙ্গে আমিরাত থেকে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহের ব্যবধান ৬০ শতাংশেরও বেশি। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শীর্ষ রেমিট্যান্সের বাজার হিসেবে ইউএই তার নাম ধরে রেখেছে। সৌদি আরবের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় বিপর্যয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশটি থেকে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় এসেছে মাত্র ১৯৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। অথচ গত অর্থবছরেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেকর্ড ৩৫২ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। আগের ৩ বছরও প্রবৃদ্ধির ধারায় ছিল দেশটি থেকে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহ। সেই প্রবাহে বিপর্যয়ের কারণে শীর্ষস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেমে গেছে চতুর্থে। সৌদি আরব নেমেছে তৃতীয় স্থানে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের নাম। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, সিঙ্গাপুরসহ বড় শ্রমবাজারগুলোর রেমিট্যান্স প্রবাহ এখন বেশ শ্লথ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদি আরবের রেমিট্যান্সের বাজার ক্রমেই হুন্ডির নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। বৈধ পথে দেশটি থেকে অর্থ পাঠানোও কঠিন হয়ে উঠছে। সৌদি আরবের আল উলা শহরে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন বাংলাদেশি আবু ইউসুফ। সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে হুন্ডিকেই দায়ী করেন তিনি। ভোরের কাগজকে আবু ইউসুফ বলেন, সৌদি আরবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বড় অংশের আয় চলে যাচ্ছে হুন্ডি কারবারিদের হাতে। ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় ডলারের দাম বেশি পাওয়ায় বিকাশের মাধ্যমেই টাকা পাঠাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেছেন। বাংলাদেশি কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সৌদি আরবে বসবাসকারী প্রবাসীদের ঘিরে হুন্ডির এ জমজমাট ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। আবু ইউসুফ বলেন, সৌদিতে কিছুটা আর্থিক ক্রাইসিস চলছে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো বেতন দিতে পারছে না। তবে বিকাশের এজেন্টরা বাকিতেই বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। আমি যেমন গত ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এখনো পাইনি। কিন্তু আমার পরিচিত একজন বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত গত দুই দশকে কাজের উদ্দেশে ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭৫ বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি অভিবাসী হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ গেছেন গত ৩ বছরে। অথচ দেশটি থেকে এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ না বেড়ে উল্টো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ৩ বছর আগে অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৫৭২ কোটি ১৪ লাখ ডলার। এর পর থেকেই প্রবাহ কমছে ধারাবাহিকভাবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৫৪ কোটি ১৯ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এলেও গত অর্থবছরে তা ৩৭৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলারে নেমে আসে। আর চলতি অর্থছরে পরিস্থিতি আরো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে মাত্র ১৯৬ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। এর আগে ২০২০ সালে হুন্ডি বন্ধ থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২ হাজার ১৬১ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। এটি এ যাবতকালের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে করোনাকালীন ২০২০-২১ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App