×

শেষের পাতা

মার্জারে তড়িঘড়ি, ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

Icon

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্জারে তড়িঘড়ি, ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
মরিয়ম সেঁজুতি : ব্যাংক খাতে এখন এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কখন কোন ব্যাংককে কার সঙ্গে ‘মার্জার’ বা একীভূত করে দেবে তা কেউ জানে না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আপাতত পাঁচ ব্যাংকের বাইরে আর কোনো ব্যাংক একীভূত করা হবে না। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকারদের পাশাপাশি আমানতকারীদের মধ্যেও নানা রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। ভয়ে অনেকেই ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিচ্ছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ব্যাংক একীভূত করা স্বীকৃত পন্থা, তবে উদ্যোগ নিতে যে পরিমাণ হোমওয়ার্ক প্রয়োজন ছিল, তা সম্পন্ন করার আগেই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আর এ কারণে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে খেলাপি ঋণ কমানোর পরামর্শ দেন তারা। অপরদিকে, খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্তে আমানতকারী, স্টেকহোল্ডার, ব্যাংকার ও পরিচালকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংককে অন্য পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কার্যত কিছুটা সবল ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে দুর্বল ব্যাংকের বোঝা। ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে পথনকশা দেয়ার পর ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি মাসের শুরুতে ব্যাংক একীভূত সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করেছে, তবে সে নীতিমালা জারির আগেই তিনটি ব্যাংক ও পরে দুটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত হয়। নীতিমালা অনুযায়ী এ পর্যায়ে ব্যাংক একীভূত হওয়ার কথা স্বেচ্ছায়; কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই এ নীতিমালা মানছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন যাবত বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংক একীভূতকরণ একটি স্বীকৃত পন্থা। দেশে-বিদেশে হয়েছে। তবে ব্যাংক একীভূতকরণের পূর্বশর্ত হচ্ছে- হয় দুটি ব্যাংক রাজি হয়ে মার্জার করবে, অথবা একটি ব্যাংক আরেকটি ব্যাংককে হস্তায়ন অধিগ্রহণ করবে। সাবেক এ গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যা দূর করতে যে উদ্যোগ নিয়েছ তা ভালো। তবে উদ্যোগ নেয়ার আগে যে পরিমাণ হোমওয়ার্ক প্রয়োজন ছিল, তা সম্পন্ন করার আগেই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, বেসিক ব্যাংক ও বিডিবিএল যেমন মার্জ করতে আপত্তি জানিয়েছে। বিডিবিএল হচ্ছে একটি স্পেশালাইজড ব্যাংক। এটা করা হয়েছিল শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়ার জন্য। অন্যান্য সরকারি তফসিলি ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়ার কথা ছিল না। তবে বিশ্বব্যাংক ১৯৯১ সালে আমাদের সরকারকে প্রভাবিত করেছে, যা একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। বিডিবিএল এর ধরন ভিন্ন। তাদের যদি তফসিলি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হয় তবে দুই ব্যাংকের দুই সংস্কৃতি হলো। এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, রাকাবের বিষয়টা আরো ইস্টারেস্টিং। ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দেয়া ছিল কষ্টসাধ্য, বিশেষ করে রাজশাহীর আশপাশের অঞ্চলগুলোতে। সেজন্য সরকার রাকাবের সৃষ্টি করে। এখনো সেই সমস্যা রয়ে গেছে। তাহলে এ ব্যাংকটিকে একীভূত করা হবে কীভাবে? ড. ফরাস উদ্দিন বলেন, আমার মতে, প্রথমত, যথোপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এটাকে আরো ভেবেচিন্তা করে করা উচিত ছিল বলে মনে করি। দ্বিতীয়ত, মার্জারের লক্ষ্য বলা হচ্ছে- যে ব্যাংক দুর্বল তাকে সবল করা। তবে এতে সবল ব্যাংকও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৃতীয়ত, মার্জারই একমাত্র উপায় নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পূবালী, সোস্যাল ইসলামী ও সিটি ব্যাংকের কথা। এগুলো এককালে ‘প্রব্লেম ব্যাংক’ বা সমস্যাযুক্ত ব্যাংক ছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক এদের প্রত্যেকের সঙ্গে চুক্তি করে। এখন ওইসব ব্যাংক দেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম। একীভূতকরণের মাধ্যমে ব্যাংকখাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব কিনা- জানতে চাইলে সাবেক এ গভর্নর বলেন, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলার পেছনে দায়ী হচ্ছে খেলাপি ঋণ। অথচ এসব ঋণখেলাপিদের যেন জামাই আদর করা হচ্ছে। তাদেরকে নানা সুবিধা দেয়া হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একসপ্তাহ আগেও যে সুবিধা দেয়া হয়েছে- এটা বিশৃঙ্খলাকে আরো উস্কে দিয়েছে। এভাবে করা যাবে না। ২০১৬-১৭ সালের বাজেটে তৎকালীণ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাংক কমিশন গঠন করে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তা আজও কার্যকর হয়নি। সমস্যা চিহ্নিত করা আছে, এখন সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক একীভূত করার একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে ১০টির মতো দুর্বল ব্যাংককে ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। তারই অংশ হিসেবে গত ১৮ মার্চ এক্সিম ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক একীভূত হওয়ার জন্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। এদিকে, সিটি ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংক এবং ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংকের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের একীভূত হওয়ার খবর প্রকাশের পর গত সপ্তাহে দুই ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় জানতে চেয়ে গত ১৮ এপ্রিল রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি দেয়। বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত সপ্তাহের কয়েকদিনে ব্যাংক থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। গত বছরের জুনে বেসিক ব্যাংকে আমানত ছিল ১৫ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকটির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেই পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক ঊর্ধ্বতন পরিচালক ড. জায়েদ বখত ভোরের কাগজকে বলেন, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে মার্জার পদ্ধতি ঠিক আছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এ পথ অবলম্বন করা হয়েছে। তবে আগে কিছু পড়াশোনা না করেই মার্জার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের এ চেয়ারম্যান বলেন, ব্যালেন্স সিট দেখে দুই কোম্পানির সঙ্গে বসে আলাপ আলোচনা করে একটি ঐক্যমতের ভিত্তিতে একীভূতকরণের বিষয়ে এগোনো উচিত ছিল, সেটা হয়নি। প্রস্তুতি ছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়ায় বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাজারে এর খারাপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, আলোচিত ব্যাংকগুলো থেকে আমনতকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ঋণখেলাপি। মন্দমানের এ টাকা আদায়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। উল্টো মার্জার এবং খেলাপি ঋণ কীভাবে কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখা যায়, বিভিন্ন সময় সে উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। এটা সরকারের ভুল নীতি। এছাড়া ঋণখেলাপিদের নানা সুযোগ-সুবিধাও দেয়া হয়। তিনি বরেণ, ব্যাংক খাত উদ্ধারে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শাস্তির কোনো বিকল্প নেই। শুধু মার্জার করে ব্যাংক খাতকে বাঁচানো যাবে না। মূল অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। তথ্য অনুযায়ী, সিটির ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়া নিয়ে গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা চায় বেসিক ব্যাংককে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্য কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা হোক। বেসিক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু মো. মোফাজ্জল গণমাধ্যমকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান টাকা জমা দিতে বেসিক ব্যাংককে বেছে নিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকটি বেসরকারি সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে যাওয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের অর্থ তুলে নিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বেসিক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকদের কাছে টাকা উত্তোলন করতে ইচ্ছুক নানা প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক ফোন কল আসছে। এতে শেষ পর্যন্ত সরকারের ক্ষতি হবে। অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকরাও তাদের জমা অর্থ ?তুলে নিতে ভিড় করছেন। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম খান বলেন, হঠাৎ করে টাকা তোলার তাড়াহুড়ো ব্যাংকটিকে প্রচণ্ড চাপে ফেলেছে। তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন শাখায় গিয়ে আমানতকারীদের সঙ্গে কথা বলছি এবং টাকা উত্তোলন না করতে অনুরোধ করছি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দুর্বল ও ভালো উভয় ব্যাংকই আমানত তুলে নেয়ার হুড়োহুড়ির মুখে পড়তে পারে। আমানতকারীদের টাকা যেন খোয়া না যায়, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App