×

শেষের পাতা

আর্থিক সুবিধা দিয়ে স্বার্থ হাসিল

তামাক কোম্পানির থাবা গণমাধ্যমেও

Icon

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তামাক কোম্পানির  থাবা গণমাধ্যমেও
সেবিকা দেবনাথ : ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশসহ বহুজাতিক তামাক কোম্পানির ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগ; জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ‘টানা ১০ বারের মতো বিএটি বাংলাদেশের সেরা করদাতার পুরস্কার অর্জন’; কিংবা করোনা মহামারির শুরুতে করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা এবং বিভিন্ন স্থানে তামাক কোম্পানির বিনামূল্যে পিপিই বিতরণের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেশ ফলাও করে প্রচারিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই প্রতিবেদনগুলো অন্যসব সাধারণ প্রতিবেদনের মতো মনে হলেও এর পেছনের খবরটা ভিন্ন। এ ধরনের প্রতিবেদন তামাক কোম্পানির পক্ষেই কাজ করেছে বলে গবেষণায় ওঠে এসেছে। গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকসহ তামাকবিরোধী সংগঠনের নেতারাও এমনটাই মনে করছেন। তারা বলছেন, বিগত দিনগুলোতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন, আইন সংশোধন, বিধিমালা প্রণয়ন, আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু কিছু গণমাধ্যমে রয়েছে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ। তারা তামাক কোম্পানির পক্ষে কাজ করছে। ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচক, ২০২৩’ এ বাংলাদেশের স্কোর ৭২, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খারাপ। আগের বছর স্কোর ছিল ৬৮। প্রতিবেদনে বলা হয়, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে তামাক কোম্পানির অব্যাহত হস্তক্ষেপ। গণমাধ্যমেও তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ওঠে এসেছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে তামাক কোম্পানি হস্তক্ষেপ রয়েছে এর সবটা জানা না গেলেও গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এক গবেষণায় ওঠে এসেছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম। এর মধ্যে দেশের প্রথম সারির দুটি ইংরেজি দৈনিক ও একটি বাংলা দৈনিকের সঙ্গে তামাক কোম্পানির পার্টনারশিপ রয়েছে। আর্থিক সুবিধা দিয়ে শীর্ষস্থানীয় দুটি টেলিভিশনেও নিজেদের পক্ষে রিপোর্ট প্রচার করছে কোম্পানি। যেভাবে প্রভাবিত করে কোম্পানি : আইনের কারণে সামনে আসার সুযোগ না থাকায় তামাক কোম্পানি প্রতিনিধিরা সরাসরি কথা না বলে সুবিধাভোগী অর্থনীতিবিদ, লেখকদের দিয়ে তামাক কোম্পানির পক্ষে নিবন্ধ, কলাম লিখিয়ে তা প্রকাশ করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন, গবেষণার কাজেও আর্থিক সহযোগিতা দেয় তামাক কোম্পানি। এছাড়া মিডিয়া ক্যাম্পেইন, পিআর এজেন্সির মাধ্যমে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রচার করছে। তামাকবিরোধী সাংবাদিক এমন কি তাদের সন্তানদেরও তাদের হয়ে কাজ করা জন্য বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে কোম্পানিগুলো। একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি ও তামাক নিয়ন্ত্রণে গবেষক সুশান্ত সিনহা এবং এন্টি টোবাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মার) আহ্বায়ক গোলাম মুর্তুজা হায়দার লিটনকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলো তামাক কোম্পনি। যা বলছে সংশ্লিষ্টরা : সুশান্ত সিনহা ভোরের কাগজকে বলেন, গণমাধ্যমে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ বেশ প্রকট। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও স্পন্সর করার সুযোগ নেই সিগারেটসহ তামাক কোম্পানিগুলোর। অথচ এরপরও হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যম ছাড়া তামাক কোম্পানিগুলোর অনিয়ম-কর ফাঁকি নিয়ে সংবাদ বেশির ভাগ গণমাধ্যম প্রকাশ করে না। এমনকি কোনো সাংবাদিক সিগারেট কোম্পানির অনিয়মের তথ্য সংগ্রহে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলেও কিছু কিছু গণমাধ্যমের কর্তা ব্যক্তিদের রীতিমতো বাধার সম্মুখীন হতে হয়, তির্যক কথা শুনতে হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিজ্ঞাপনের বাইরেও সিগারেট কোম্পানির সঙ্গে কোনো কোনো গণমাধ্যমের বার্তাকক্ষের নীতিনির্ধারকদের ‘অদৃশ্য সম্পর্কের’ প্রভাবেই সংবাদ প্রকাশ সম্ভব হয় না ওই সব গণমাধ্যমে। গোলাম মুর্তুজা হায়দার লিটন ভোরের কাগজকে বলেন, শুধু সাংবাদিক নয় তাদের সন্তানদেরও বিভিন্ন সময় বেশি বেতনে চাকরি দেয়ার প্রস্তাব দেয় তামাক কোম্পানি। আমার ছেলের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটেছে। তামাক কোম্পানি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে গণমাধ্যমকে এক ধরনের গোলক ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। এতে অনেক সময় গণমাধ্যমে এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে, যা কোম্পানির পক্ষে যায়। গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কারোর পারিবারিক সম্পর্ক বা সখ্যতা থাকলেও এর প্রভাব অনেক সময় গণমাধ্যমে পড়ে। বাজেটের আগে-পরে তামাক কোম্পানি বিভিন্ন ভুয়া সংগঠনের ব্যানারে বিড়ি শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করে। এসব খবর প্রচারের মাধ্যমে কোম্পানির স্বার্থই হাসিল হয়। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল ভোরের কাগজকে বলেন, বহুজাতিক তামাক কোম্পনিগুলো খুবই চতুর। গণমাধ্যমকে কীভাবে প্রভাবিত করতে হয় তারা জানে। গণমাধ্যমাই তামাক কোম্পানিকে বাঁচিয়ে রেখেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সম্প্রতি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের প্রধান হয়েছেন একজন নারী। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ কয়েকটি পত্রিকায় খুব বড় করে এ রিপোর্ট হয়েছে। ধরে নিচ্ছি, একজন নারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়া নারীর ক্ষমতায়নের একটি দিক। পাশাপাশি এওতো ঠিক, এ খবরের মধ্য দিয়ে বিএটির প্রচারও হয়েছে। আমি বলব এটি একটি খবর। গণমাধ্যম সেই খবর ছেপেছে। কিন্তু তামাক বা তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে যদি কোনো গণমাধ্যমের নৈতিক অবস্থান থাকে; তাহলে এই খবর ছাপা হতো না। এই রিপোর্টে জাতির কী লাভ বা কী ক্ষতি হলো? যুগ্ম সচিব ও ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের পরামর্শক ফাহিমুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, তামাক কোম্পানি প্রতিটি ক্ষেত্রেই হস্তক্ষেপ করছে। গণমাধ্যমও এর বাইরে নয়। তাদের অর্থের কোনো অভাব নেই। প্রভাবিত করার জন্য কোম্পানির আলাদা ফান্ড ও লবিস্ট আছে। নিজেদের কাজ হাসিল করার জন্য তামাক কোম্পানি তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের ভোরের কাগজকে বলেন, শীর্ষস্থানীয় কিছু গণমাধ্যমের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে তামাক কোম্পানি দুটি কাজ করে। একটি- তামাকবিরোধী সংগঠনের রিপোর্টগুলো প্রচার বা প্রকাশ হতে দেয় না। অন্যটি- কোম্পানির ব্যবসায়িক সাফল্য আসে এমন খবর প্রচার ও প্রকাশ করে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সম্প্রতি বাজেটে ‘কেমন তামাক কর চাই’ শিরোনামে তামাকবিরোধী সংগঠনের একটি অনুষ্ঠান হয়। ডেইলি স্টার সেই রিপোর্টটি প্রকাশ করেনি। কিন্তু বিএটির নতুন এমডির সাক্ষাৎকার বড় করে প্রকাশ করেছে। সিএসআরের নামে তামাক কোম্পানি বনায়ন, এসডিজি পূরণে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে- এই খবরগুলো কিছু গণমাধ্যমে বেশ ফলাও করে প্রচার করছে। জনস্বাস্থ্য আইন বিশেষজ্ঞ ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম ভোরের কাগজকে বলেন, তামাক কোম্পানি এক সময় গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিত। কিন্তু বিদ্যমান তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী সামগ্রিকভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচার নিষিদ্ধ। তাই কৌশল পাল্টে কোম্পানি এখন সাংবাদিকদের বিশেষ করে গণমাধ্যমের গেট কিপারদের নানা সুবিধা দিয়ে ও অর্থের বিনিময়ে রিপোর্ট প্রকাশ করছে। কিছু ক্ষেত্রে তামাকবিরোধী রিপোর্ট প্রকাশ করছে না। করণীয় কী? : বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সদস্য মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, মিডিয়ার দুটি দিক। একটি ব্যবসায়িক অন্যটি নৈতিক। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে তারা ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখবে সেটি তাদের বিষয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নৈতিকভাবে মনে করে, যারা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে তাদের কোনো রিপোর্ট তারা প্রচার বা প্রকাশ করবে না সেটিও তাদের বিষয়। এখানে কোনো জোর নেই। নৈতিক অবস্থানই মিডিয়াকে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখতে পারে। এবিএম জুবায়ের বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তাবায়ন এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি গণমাধ্যম যদি তামাকবিরোধী কাজগুলোকে আরো বেশি প্রচার-প্রকাশ করত তাহলে তামাকবিরোধী আন্দোলন আরো বেগবান হতো। পলিসিগুলো সঠিকভাবে সঠিক সময়ে আমরা পেতাম এবং সেগুলোর বাস্তবায়নও হতো।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App