×

শেষের পাতা

সাভার রানা প্লাজা ধসের ১১ বছর পূর্তি

আহতরা বেঁচে আছেন নিদারুণ কষ্টে

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 আহতরা বেঁচে আছেন নিদারুণ কষ্টে
মো. আজিম উদ্দিন, সাভার (ঢাকা) থেকে : সাভার রানা প্লাজা ভবন ধসের দশ বছর। স্বপ্নকে সঙ্গী করে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিককে। পাশাপাশি আহত প্রায় ২ হাজার ৫০০ শ্রমিক ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাণ নিয়ে উদ্ধার হলেও পঙ্গুত্ব নিয়ে দিন পার করছেন। জীবন রক্ষার জন্য কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিয়েছেন। অনেকেই হকারি করছেন। চিকিৎসা না পেয়ে মারাও গেছেন কেউ কেউ। প্রথম ২-৩ বছর বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারি সহায়তায় চিকিৎসা সেবা পেলেও এখন আর পাচ্ছেন না। ফলে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে পঙ্গু শ্রমিকরা কষ্টকর জীবন পার করছেন। গতকাল বুধবার সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজায় আসতে থাকেন সংগঠনের ব্যানার, ফেস্টুন ও প্লের্কাড হাতে। এদিকে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে অস্থায়ী শহীদ বেদি। সাভার রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই বেঁচে আছেন, খেয়ে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায়। তাদের মধ্যে একজন শিলা বেগম কাজ করতেন রানা প্লাজার ৬ তলার ইথার টেক্স কারখানায় অপারেটর পদে। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি কারখানাটিতে কাজ করেছিলেন। একটু সুখের আশায় মেয়ে নিপাকে বরিশালে বোনের বাসায় রেখে চলে আসেন সাভারে। চাকরি নেন রানা প্লাজায়। সময় ভালো চলছিল। সংসারের অভাবও দূর হচ্ছিল। কিন্তু আচমকা রানা প্লাজা ধসে তার সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ভবনের ভিমের নিচে চাপা পড়েন তিনি। প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রথমদিকে কিছু টাকা পেলেও সেই টাকায় চিকিৎসাও ঠিকমতো করাতে পারছেন না। টাকার অভাবে সন্তানের লেখাপড়াও বন্ধের পথে। কোনোরকম দুমুঠো খেয়ে বেঁচে আছেন তিনি। এ ব্যাপারে দৈনিক ভোরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে তার পেটে ৫টি টিউমার। সারাক্ষণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দ্রুত অপারেশন করা দরকার। টাকার অভাবে অপারেশন করানো যাচ্ছে না। মৃত্যুযন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি। শরীরে একের পর এক অসুখ দানা বেঁধেছে। তবে পেটের টিউমারের যন্ত্রণায় দিশাহারা। রক্তক্ষরণে দিন দিন শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। অপারেশন করা জরুরি কিন্তু টাকা কোথায় পাব? প্রায় বছর দুই তিনি কারখানাটিতে কাজ করছিলেন। ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু বজ্রপাতের মতো সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। রানা প্লাজা ধসে কেড়ে নিয়েছে হাজারো স্বপ্ন। আহত নিলুফার ইয়াসমিন, মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় বসবাস করতেন স্বামী সংসার নিয়ে। খেয়ে পরে ভালো থাকার আশায় ২০০৭ সালে সাভারে এসে রানা প্লাজায় কাজ নেন। ভবনের ৫ম তলায় ফেনটম অ্যাপারেলস এ সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখানে ৬ বছর করেছেন রানা প্লাজা ধসের দিন পর্যন্ত। ভবন ধসে তার ডান পায়ে ভারী কিছুর আঘাত লাগে। এতে তিনি পঙ্গু হয়ে গেছেন। নিলুফার ইয়াসমিনের মতো শত শত শ্রমিকের স্বপ্ন রানা প্লাজার ধস কেড়ে নিয়েছে। নিলুফার প্রাণে বেঁচে গেলেও পঙ্গুত্ব তার সঙ্গী। বিনা চিকিৎসায় হয়তো পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন একদিন। নিলুফার আক্ষেপ করে বলেন, পায়ে পচন ধরেছে ঠিক মতো হাঁটতে পারি না। ডান পায়ে পচন ধরেছে। ডাক্তার বলেছেন, কেটে ফেলতে হবে পা। উপায় নেই, অনেক টাকার দরকার। টাকার অভাবে ঠিক মতো খেতেই পারছি না। পা কাটাব কীভাবে, চিকিৎসা করাব কীভাবে? একজন হালিমা বেগম, ধামরাইয়ের ফুটনগর এলাকায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। উপার্জনক্ষম স্বামী মারা গেলে তিনি রানা প্লাজার ৮ম তলার নিউ স্টাইল লিমিটেডে লাইন আউটপুটের সিনিয়র অপারেটর হিসেবে কাজে যোগ দেন। রানা প্লাজা ধসে অজ্ঞান হালিমার জ্ঞান ফেরে হাসপাতালে, মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি। ডান পা একেবারে থেতলে যায়। হালিমা বলেন, এপ্রিল মাস আসছে। এ সময়ে সাংবাদিকদের দেখা যায়। আক্ষেপ করে বলেন, আমরা মরে গেলেও দেখার কেউ নেই। আজ ৭ বছর কোনো ধরনের চিকিৎসা করাতে পারছি না। ৪ বার অপারেশন করিয়েও পা ঠিক হয়নি। হাটু থেকে কোমর পর্যন্ত রড ভরে দেয়া। অনেক দিন আগেই ইনফেকশন দেখা দেয়। ডাক্তার পরামর্শ দেন আরো একবার অপারেশন করতে হবে। অপারেশন করব কোথা থেকে খেয়ে পরে বাঁচতেই তো পারছি না। একমাত্র সন্তানটা বেকার। ছেলে-বউ ও নাতি নিয়ে আমার সংসারে ৪ জন খাওয়ার লোক। সাভার সিআরপি থেকে ৭০ হাজার টাকার মুদি মাল দিয়েছিল দোকান করার জন্য। ছোট্ট এই দোকানের আয় দিয়েই সংসার কোনোভাবে চালিয়ে নিচ্ছি। দুর্ঘটনায় আহত হন হাওয়া বেগম। তিনি কোমরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন রোগব্যাধিতে ভুগছেন। অসুস্থ থাকায় কোনো পোশাক কারখানায় চাকরি করতে পারিনি। পরবর্তী সময়ে মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে তাও করতে পারলেন না। শেষে বেছে নিলেন ভিক্ষাবৃত্তি। ৫ বছর ধরে সাভারে ওভার ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষাবৃত্তি করেই ২ মেয়ে ২ ছেলে ও অসুস্থ স্বামী নিয়ে জীবন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। রানা প্লাজা ধসে হাওয়া বেগমের মতো অনেকেই করুণ জীবন পার করছেন। এছাড়াও হালিমা, সাদ্দাম, সালমা বেগম, কিংবা হৃদয় এ রকম শত শত নারী-পুরুষের সেদিন জীবনে বেঁচে গেলেও মেরুদণ্ড ভেঙে কিংবা হাত-পা খুইয়ে পঙ্গুত্ব নিয়ে চিকিৎসার অভাবে অসহনীয় এক জীবনের মুখোমুখি আজ। রানা প্লাজার শ্রমিকরা আক্ষেপ করে বলেন, রানা প্লাজার ধসের বর্ষপূর্তি আসলে গুটি কয়জন সাংবাদিকরা আসেন। কিন্তু যাদের জন্য আজ আমাদের এ পরিণতি তারা কেউ খোঁজ নেন না। রানা প্লাজা ধসের ১১ বছর পরেও আহত গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে বিশাল এক অংশ এখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা সমস্যায় ভুগছেন। আহত ৫০ শতাংশ গার্মেন্টসকর্মী এখনো মানসিক বিপর্যয় ও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। আর শতকরা ৪৮ শতাংশ এখনো বেকার। তাছাড়া আহতদের ও নিহতদের পরিবারগুলো কিছু আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা পেলেও ক্ষতিপূরণ পাননি। বর্তমানে রানা প্লাজা ধসে আহত ও অঙ্গহানি শ্রমিকরা দিন কাটাচ্ছেন নিদারুণ কষ্টে। চিকিৎসা করা তো দূরের কথা, খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্স অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, রানা প্লাজার শ্রমিকরা চিকিৎসার অভাবে ধুকেধুকে জীবন পার করছেন। অসহায় শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। ৬ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করে চলেছি। দাবিগুলো হলো- এক জীবনের আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ৪৮ লাখ টাকা। রানা প্লাজার শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আহত শ্রমিকদের আজীবন চিকিৎসার ব্যয়ভার নিতে হবে। সব আসামির বিচার করতে হবে, আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রানা প্লাজার শ্রমিকদের পুর্নবাসনের উদ্যোগ দিতে হবে। ২৪ এপ্রিলকে শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। রানা প্লাজায় আহত শ্রমিকসহ নিহতের স্বজনরা বলেন, রানা প্লাজার সুবিধাবঞ্চিত আহত শ্রমিকরা পাবে তাদের ন্যায্য অধিকার, চিকিৎসা ব্যয়সহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। শ্রমিক সংঘঠনগুলোর দাবি রানা প্লাজা ধসের জায়গাতেই আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন করে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে সরকার, এমনটাই আশা করেন আহত ও পঙ্গত¦বরণকারী শ্রমিকরা। ছবি ক্যাপশন : সাভারের রানা প্লাজায় গতকাল বুধবার নিহতদের স্মরণে অস্থায়ী শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় -ভোরের কাগজ

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App