×

শেষের পাতা

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন : ঐতিহ্যের বলীখেলা ও মেলার প্রতীক্ষায় চট্টগ্রামবাসী

Icon

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন : ঐতিহ্যের বলীখেলা ও মেলার প্রতীক্ষায় চট্টগ্রামবাসী
প্রীতম দাশ, চট্টগ্রাম অফিস : বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ চট্টগ্রামের আবদুল জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা। বৃহত্তর চট্টগ্রামের সবচেয়ে বৃহৎ এ বৈশাখী মেলাকে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নগরায়ণের আগ্রাসনে মানুষের যান্ত্রিকতায় লোকজ আচার-অনুষ্ঠান যখন হ্রাস পাচ্ছে সেখানে জব্বারের বলীখেলা এখনো তার জৌলুস ধরে রেখেছে। শত বছর পার করা এই মেলা বাঙালির জীবনের বর্ণিল প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে। খেলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা মেলা নিয়ে মানুষের আনন্দ ও উচ্ছ¡াস এখনো এতটুকুও কমেনি। এই মেলা এখন চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের মেলা ও মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ঐতিহ্যের বলীখেলা ও মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন চট্টগ্রামবাসী। ঐতিহ্যবাহী বলীখেলার ১১৫তম আসর বসছে আগামী ২৫ এপ্রিল। নগরীর লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের এই বলীখেলা। বলীখেলার পাশাপাশি তিন দিন ধরে চলবে বৈশাখী মেলা। লালদীঘি মাঠসহ প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে আয়োজিত এ বৈশাখী মেলায় গ্রামীণ লোকজ রকমারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বসতে শুরু করেছে। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে জব্বারের বলীখেলা ও মেলার আয়োজন হয়নি। এরপর ২০২২ সালে আয়োজন করা হয়। সেবার বলীখেলা ও মেলা ব্যবস্থাপনায় খরচের দায়িত্ব নেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি যুব সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করতে ও শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশে চট্টগ্রাম নগরীর বদরপাতি এলাকার সওদাগর আবদুল জব্বার ১৯০৯ সালে এই বলীখেলার সূচনা করেন। খেলা উপলক্ষে বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। এ খেলার প্রবর্তক আবদুল জাব্বারের মৃত্যুর পর এ প্রতিযোগিতা জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ নগরীর লালদীঘি মাঠে এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ খেলায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় ‘বলী’। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘কুস্তি’ বলীখেলা নামে পরিচিতি। ব্রিটিশ আমলে ও স্বাধীনতার আগে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামি-দামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বলীখেলা দেখতে ও মেলায় ঘুরতে আসেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষ। নগরীর আন্দরকিল্লা, বক্সিরহাট, লালদীঘি পাড়, কেসি দে রোড, সিনেমা প্যালেস, শহীদ মিনার সড়ক, কোতোয়ালি মোড়, জেল রোডসহ প্রায় চার বর্গকিলোমিটারজুড়ে এ মেলার বিস্তৃতি ঘটে। এ মেলায় অংশ নিতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের লোকজ পণ্য নিয়ে মেলার এক-দুই দিন আগে চলে আসেন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যবসায়ীরা। বলীখেলার সব প্রস্ততি সম্পন্ন হয়েছে। মেলা উপলক্ষে পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া র‌্যাবের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন। মেলাকে ঘিরে সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা উপলক্ষে মেলা আয়োজক কমিটির সঙ্গে গতকাল রবিবার সকালে মতবিনিময় সভা করে পুলিশ। নগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি এসএম ওবায়েদুল হক জানান, সভায় পুলিশ বাহিনী দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মেলাকে কেন্দ্র করে আয়োজক, ক্রেতা ও বিক্রেতারা যেন হয়রানি বা চাঁদাবাজির শিকার না হন সেদিকে পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি সংক্রান্তে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া এবং মেলা প্রাঙ্গণে পুলিশের টহল বাড়ানো ইত্যাদি। নগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (অপরাধ) মো. আশরাফুল করিম, কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) অতনু চক্রবর্ত্তীসহ ফাঁড়ির ইনচার্জরা। মেলার আয়োজক কমিটির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি জহরলাল হাজারী, সহসভাপতি চৌধুরী ফরিদ, সাধারণ সম্পাদক শওকত আনোয়ার, সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ জামাল হোসেন, তাপস দে প্রমুখ। আব্দুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখী মেলা কমিটির সভাপতি এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী ভোরের কাগজকে বলেন, জব্বারের বলীখেলা এবং এ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের শত বছরের ঐতিহ্য। এ মেলা চট্টগ্রাম নগরবাসীর প্রাণের সঙ্গে মিশে আছে। এই মেলায় পাওয়া যায় ঘরের নিত্য ব্যবহার্য সব জিনিসপত্র। গৃহিণীরা সারা বছর এ মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। চট্টগ্রাম ছাড়াও সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকা, ফেনী, নোয়াখালী, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এ মেলায় নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, অন্যান্য বারের মতো এবারো দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের টেকনাফ, উখিয়া, সাতকানিয়া, মিরসরাই, পটিয়া, ফটিকছড়ি, কক্সবাজার, হাটহাজারী, বাঁশখালী, আনোয়ারা, মহেশখালি, স›দ্বীপের শতাধিক বলী অংশ নেবেন। এদের মধ্যে ৫০ জনকে মনোনীত করে মূল পর্বে খেলার সুযোগ দেয়া হবে। সেখান থেকে চ্যা¤িপয়ন ও রানার্স আপকে যাথাক্রমে মেডেলসহ নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। এছাড়া মূল পর্বে অংশ নেয়া প্রতিযোগীদের সম্মান সূচক অর্থ প্রদান করা হবে। প্রয়াত আব্দুল জব্বারের নাতি ও মেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শওকত আনোয়ার বাদল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এমন আয়োজনকে বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান দেয়া জরুরি। এটি যদিও আমার নানার নামে হয়, কিন্তু এটি সবার প্রাণের উৎসব। বিট্রিশবিরোধী আন্দোলনের সময় এমন একটি আয়োজন তরুণদের মধ্যে সাহসের উদ্দীপনা নিয়ে এসেছিল।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App