×

ইষ্টিকুটুম

জসীম আল ফাহিম

মাইক্রো ড্রোন

Icon

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মাইক্রো ড্রোন

ড. ভূমিপাল একজন পদার্থবিজ্ঞানী। পদার্থের ভৌত অবস্থা নিয়ে তার নানা ধরনের গবেষণা রয়েছে। কোন পদার্থ কী ধরনের কাজ করে, পদার্থের বৈশিষ্ট্য কী, আচার-আচরণ কেমন- এসব নির্ণয় করতে করতেই তার দিন ফুরায়। আর তার শৈশবের বন্ধু ড. মহিপাল একজন সেনা কর্মকর্তা। একজন চৌকস সামরিক অফিসার হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সেনাবাহিনীতে তিনি একজন অস্ত্রবিদ হিসেবে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে তিনি যে-সব অস্ত্রশস্ত্র জোগান দিয়েছেন, তার তুলনা বিরল। অতি সম্প্রতি তিনি সেনাবাহিনীতে একটি অত্যাধুনিক ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংযুক্ত করেছেন। যা রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে শত্রæর লক্ষ্যবস্তুতে অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম। এরপর থেকে তাকে ‘মিসাইল ম্যান’ আখ্যা দেয়া হয়।

মিসাইল ম্যান ড. মহিপাল সেদিন বিজ্ঞানী ড. ভূমিপালের বাসায় বেড়াতে গেলেন। দুজনই ভালো বন্ধু। শৈশবে একসঙ্গে পড়ালেখা করেছেন। তাই শৈশবের অনেক স্মৃতি এখনো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। অনেক দিন পর বন্ধুকে কাছে পেয়ে ড. ভূমিপাল আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। বন্ধুকে কী খাওয়াবেন না খাওয়াবেন- ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। দুজনই ব্যাচেলর মানুষ। যাকে বলে চিরকুমার। বিজ্ঞানের কথা, দেশের কথা, দেশের মানুষের নিরাপত্তার কথা ভাবতে ভাবতে বিয়ে-সাদি করার চিন্তা কখনো তাদের মাথায় আসেনি। তাই বলা যায় নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন তাদের।

ড. ভূমিপাল নিজ হাতে কয়েক রকম খাবার তৈরি করলেন। সেমাই, পায়েশ, চাউমিন আর কফি। নিজ হাতেই বন্ধুর সামনে ট্রে ভরে ওসব পরিবেশন করলেন। ড. মহিপাল কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলেন, ফার্স্ট ক্লাস কফি! তা নতুন কী কাজ নিয়ে এখন ব্যস্ত সময় পার করছ?

জবাবে ড. ভূমিপাল বললেন, তেমন কিছু না। একটা মাইক্রো ড্রোনের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

‘মাইক্রো ড্রোন’ নামটা শোনামাত্র ড. মহিপাল অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মাইক্রো ডোন! সেটা আবার কী জিনিস?

ড. ভূমিপাল বললেন, তেমন কিছু না। মাছি সদৃশ একটা যন্ত্র। এটুকুতেই একটা অত্যাধুনিক ক্যামেরা বসানো থাকবে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটা মাইক্রোফ্যান এটাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কোনো কিছু বহন করার জন্য এতে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। কোনো রাডার সিস্টেম এটার উপস্থিতি ধরবে তো দূরের কথা, এর অস্তিত্ব পর্যন্ত কল্পনা করতে পারবে না। সম্পূর্ণ ডিভাইসটি রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

যন্ত্রের বিবরণ শুনে ড. মহিপাল বসা থেকে লাফিয়ে উঠলেন। খুশিতে বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, দারুণ একটা আইডিয়া! দুর্দান্ত একটা প্রজেক্ট! আমার এটা চাই-ই চাই। এই যন্ত্রটা আমাদের সেনাবাহিনীতে যুক্ত করতে পারলে কী যে একটা ব্যাপার হবে- একবার ভেবে দেখেছ বন্ধু?

ড. ভূমিপাল স্বাভাবিকভাবেই বললেন, কী আর হবে? মানবজাতির উপকার করতে গিয়ে আমার আগের আবিষ্কারগুলো নিয়ে বরাবর যা হয়েছে, তাই হবে।

ড. মহিপাল বললেন, তোমার মাইক্রো ড্রোনকে কাজে লাগিয়ে আমরা অতি সহজেই শত্রæ সেনাদের ঘাঁটি চিহ্নিত করতে পারব। শুধু তাই নয়, শত্রæদের গতিবিধি, তাদের শক্তি-সামর্থ্য-রণপ্রস্তুতি আমরা অতি সহজে আয়ত্ত করতে পারব। তখন শত্রæসেনাদের নাস্তানাবুদ করতে আমাদের বেগ পেতে হবে না। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তিতে যারা সমৃদ্ধ তারাই সর্বময় কর্তৃত্ববান। তারাই সুপার পাওয়ার। প্রিয় বন্ধুটি আমার, শিগগির তুমি মাইক্রো ড্রোন প্রজেক্টে হাত দাও। এটা পেলে আমি নিশ্চিত আমাদের সেনাবাহিনী সুপার পাওয়ারের কর্তৃত্ব লাভ করবে।

তার অনুনয় বিনয় শুনে ড. ভূমিপাল একটু গম্ভীর ভাব ধরে রইলেন। কেন যে তার এমন গাম্ভীর্য, ড. মহিপাল আঁচ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, কেন তার এমন মৌনতা। তিনি তাকে কোনো কিছু বলতে যাবেন, সে সময় ড. ভূমিপাল নিজ থেকেই বলে উঠলেন, এই কাজটা করার তেমন উৎসাহ আমি পাচ্ছি না। মানুষের অভিশাপ নিতে আমার মন আর সায় দিচ্ছে না।

ড. ভূমিপালের কথা শুনে ড. মহিপাল কিছুটা ক্ষীপ্র হয়ে ওঠেন। বলেন, এসব বলছ কি তুমি! তোমার মুখপানে চেয়ে আছে আমাদের সেনাবাহিনী। আমাদের পুরো দেশ। এখন তুমি যদি উৎসাহ হারিয়ে ফেল, তাহলে আমাদের কী হবে শুনি? প্লিজ বন্ধু, হতাশ হয়ো না। কাজটা তুমি সম্পন্ন করে দাও।

ড. ভূমিপাল বললেন, আমার তৈরি যন্ত্রপাতিগুলো মানবকল্যাণে কাজে লাগুক- আমি সব সময় এটাই চেয়েছি। এখনো এটাই চাই। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার আবিষ্কারগুলো নিয়ে তোমরা যা করেছ, সবই জীবনবিনাশী কাজ-কারবার। এটা আমার জন্য অনেক কষ্টের। অনেক বেদনার। কতটা বেদনার আমি তোমাকে ঠিক বলে বোঝাতে পারব না বন্ধু। বিষয়টা মানবিক দিক দিয়ে বোঝার চেষ্টা করো।

ড. মহিপাল বললেন, যুদ্ধক্ষেত্রে জীবনের বিনাশ ঘটে- এ কথা সত্যি। কিন্তু আমরা তো আর সাধারণ জনগণকে মারি না। আমরা সৈনিক। সৈনিকরা সৈনিকদের মারবে। হতাহত করবে। এটাই তো স্বাভাবিক। এটাই তো চিরাচরিত নিয়ম। হতাহত না করাটাই বরং অস্বাভাবিক। এখন তুমি যদি চাও যে- সৈনিকরা হাত পা গুটিয়ে বসে থাকুক, এ ধরনের সৈনিক দেশ ও জাতির জন্য কী কল্যাণ করতে পারবে শুনি? কিছুই না। তাহলে দেশ ও জাতির নিরাপত্তাটা দেবে কে? দেশের মানুষের স্বাধীনতাই বা অক্ষুণ্ন রাখবে কে?

ড. মহিপালের যুক্তিপূর্ণ কথামালা শুনে ড. ভূমিপাল মৃদু হাসলেন। মনে হলো তিনি তাকে যুক্তিযন্ত্রের সাহায্যে কাবু করে ফেলেছেন। তার আভাস পেলেন তিনি ড. ভূমিপালের মৃদু হাসিতে।

ড. ভূমিপাল হাসি থামিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বললেন, সে যাই বলো না কেন তুমি। আমাকে অবশ্যই তোমার কথা দিতে হবে। অন্যায়ভাবে শুধু মানুষ কেন কোনো সৈন্যকেও তোমরা হত্যা করতে পারবে না।

ড. মহিপাল কণ্ঠে দৃঢ়তা এনে বললেন, অন্যায়ভাবে কোনো সৈন্যই অন্য কাউকে মারে না। মারতে যায়ও না। এটা প্রকৃত সৈন্যের কাজ নয়। তুমি নিশ্চিত থাকো বন্ধু। তোমার যন্ত্রটা আমরা সঠিক এবং কল্যাণমূলক কাজেই লাগাব।

তার সপ্তাহখানেক পরই ড. ভূমিপাল মাইক্রো ড্রোনের একটা মডেল ড্রয়িং করে ফেললেন। ড্রয়িং মতো এটাকে এখন বাস্তবে রূপ দেয়ার পালা। মোটামুটি মাসখানেকের মধ্যেই তার মডেলটা বাস্তব রূপ লাভ করল। ‘মাইক্রো ড্রোন’ নামক একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র পেল জগৎবাসী।

যন্ত্রটা দেখতে অনেকটা বড়োসড়ো মাছির মতো। এর কর্মক্ষমতা পুরোপুরি রিমোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রিমোট চেপে এটাকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পাঠিয়ে দেয়া যায়। এর অত্যাধুনিক ক্যামেরাটি একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি তোলে এবং ভিডিও ধারণ করে অন্য একটা গ্রাহক যন্ত্রে পাঠিয়ে দেয়। গ্রাহক যন্ত্র থেকে ইচ্ছেমতো ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা যায়। মাইক্রো ড্রোনটি প্রতি সেকেন্ডে এক মিলিয়ন ছবি তুলতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, এটা মটরদানার মতো কোনো পরমাণু বোমা বা একই ধরনের শক্তিশালী গ্রেনেড বহনেও সক্ষম। যা অনায়াসে জগতের অশেষ ধ্বংস সাধন করতে পারে।

মাইক্রো ড্রোন আবিষ্কারের পর ড. ভূমিপালকে নিয়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। কয়েকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেল তার সাক্ষাৎকারও প্রচার করেছে। এতে তার রীতিমতো আনন্দিত হওয়ার কথা। গর্বে বুক ফুলে ওঠার কথা। কিন্তু যন্ত্রটি আবিষ্কারের পর থেকে তিনি আজকাল রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। কী যেন এক অপরাধ বোধ সারাক্ষণ তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। তার শুধু মনে হতে থাকে- মাইক্রো ড্রোন আবিষ্কার করাটা তার অনেক সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এটি মানবজাতির কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই করবে বেশি।

সে যাই হোক। ড. ভূমিপাল অপরাধ বোধে ভুগলেও জগৎবাসী কিন্তু তার আবিষ্কারের সাফল্যে উল্লাসে মেতে উঠেছে। দেশে দেশে শোনা যেতে থাকে তার আবিষ্কারের বহুমুখী প্রশংসা। তার আবিষ্কারের খবরটা নাকি ইতোমধ্যে নরওয়ের নোবেল কমিটির কানেও পৌঁছে গেছে। বলা যায় না, মৌলিক আবিষ্কারের জন্য এ বছর তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেও পেতে পারেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App