×

ইষ্টিকুটুম

জারিফ আলম

মঙ্গলভ্রমণ

Icon

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 মঙ্গলভ্রমণ

আজকের সকালটা দারুণ ঝলমলে। জানালার ফাঁক গলে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে ঘরে। এমন সকাল দেখে যে কারো মন ভালো হয়ে যাবে। আর এমন দিনে অন্তুর মনও বেশ ফুরফুরে। তার চোখেমুখেও আনন্দের ছাপ।

এই সকালবেলা অন্তুকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, অন্তু, আজ স্কুলে যাবে না?

অন্তু মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ বাবা, যাব।

তারপর বাবা আবার বললেন, তোমার খাতা-কলম কিছু লাগবে কি আজ?

অন্তু মাথা নেড়ে না বলল শুধু।

বাবা এবার হেসে বললেন, ঠিক আছে, আমি অফিসে যাচ্ছি।

মা অন্তুকে সকালের নাশতা করিয়ে স্কুলে পাঠালেন। ওর ছোট্ট বোন বিন্তির বয়স চার বছর। অন্তুর সঙ্গে খুব ভাব। দুজন মিলে নানারকম গল্প করে। অন্তু ক্লাস এইটে পড়ে। সামনে পরীক্ষা।

স্কুল থেকে ফিরে অন্তু আজ আর মাঠে খেলতে গেল না। বিকেলে বসে হ্যারিপটার পড়ল। একসময় ঠাকুমার ঝুলি পড়ত। যার কারণে তার অধিকাংশ গল্পই প্রায় মুখস্থ। আর এখন বিজ্ঞানবিষয়ক বইয়ের প্রতি তার কৌতূহলের শেষ নেই। আজ তার টিভি দেখতে ইচ্ছে করল না। সন্ধ্যায় বাবা একটা খেলনা কিনে আনলেন বিন্তির জন্য। বাবার আগমনে অন্তু মনে মনে আনন্দিত হলেও হঠাৎ কী ভেবে যেন মন খারাপ হয়ে গেল! অন্তু বাবার হাত থেকে নিয়ে খেলনাটি বিন্তিকে দিয়ে বলল, আজ থেকে খেলনাটি তোর।

অন্তু খেয়াল করল খেলনাটি তার কথাটি নকল করে বলছে, আজ থেকে খেলনাটি তোর।

অন্তু অবাক হলো। এটা কীভাবে সম্ভব! সে ভেবেছিল অতি সাধারণ খেলনা হবে হয়তো। তাই তেমন গুরুত্ব দেয়নি প্রথম দিকে। এই সন্ধ্যাবেলা চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এমন সময়ে একটু-আধটু ভয় পাওয়া অনেক সাধারণ ঘটনার মতোই। সে প্রথমে ভাবল হয়তো খেলনাটির ভেতরে কোনো ব্যাটারি আছে আর এজন্য এটি তার কথার পুনরাবৃত্তি করছে। এটা আসলে খেলনা নাকি অন্যকিছু বোঝার তেমন উপায় নেই। সে বেশ ভালোভাবে উল্টে পাল্টে দেখল। না তেমন কিছু দেখতে পেল না। খেলনাটির এমন অদ্ভুত আচরণে অন্তু ভয় না পেয়ে বিন্তিকে বলল, আজকের মতো খেলনাটি আমার ঘরে থাকবে। কাল থেকে তোর হবে।

বিন্তি কিছু না বলে ওর পড়ার ঘরে চলে গেল।

অন্তু রাতে খেয়ে খেলনাটির সঙ্গে কথা বলল কিছুক্ষণ। কারণ এটা একটা এলিয়েনের বাচ্চা। সে শুধু মানুষের কথা নকল করতে জানে। তারপর ১০টার দিকে ঘুমোতে গেল।

গভীর রাতে অন্তুর ঘরের দরোজায় কে যেন টোকা দিল। অন্তু ধীর পায়ে দরোজা খুলে দিল। যদিও অনেক রাত। কিন্তু সাহস নিয়ে এগিয়ে গেল। তারপর সে যা দেখল তা ভীষণ অবাক হবার মতো ব্যাপার! অন্তু দেখল সে বিশাল এক ফাঁকা জায়গায় এসে পড়েছে। যেখানে মানুষের কোনো বসবাস নেই। অন্তু ভাবল এটা হয়তো কোনো মরুভূমি হবে অথবা কোনো গ্রহ এরকম কিছু। ডিসকভারি চ্যানেলে অন্তু এসব অনেক দেখেছে। কিন্তু বাস্তবে এসব দেখতে পাবে সে কখনো ভাবতেই পারেনি।

এমন সময় অন্তুর সমবয়সি অনেক ছেলেমেয়েকে দেখতে পায় সে। ওরা অন্তুর সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই। সবাই এসে হ্যান্ডশেক করে।

অন্তু প্রথমে প্রশ্ন করল, এটা কোন জায়গা?

একজন ছেলে এসে বলল, এটা মঙ্গলগ্রহ।

অন্তু বলল, কিন্তু আমি তো পৃথিবীতে ছিলাম। কীভাবে এখানে এলাম বুঝতে পারছি না! তোমরাই বা কারা?

আরেকজন ছেলে এসে বলল, আমরা এলিয়েন। আমরা তোমার বন্ধু হতে চাই। শুনেছি পৃথিবীর মানুষ অনেক বুদ্ধিমান। তাই তোমাদের সঙ্গে মিশে আমরাও বুদ্ধিমান হতে চাই।

অন্তু বলল, ও আচ্ছা। ঠিক আছে। কিন্তু আমি তো তেমন বুদ্ধিমান নই।

সিকিহো নামে এক এলিয়েন বলল, কে বলেছে তোমার বুদ্ধি নেই। তোমার অনেক বুদ্ধি। তুমি বুদ্ধিমান প্রাণী।

অন্তু বলল, আমার ক্লাসের স্যার তো তাই বলেন।

অন্তুর এসব কথায় এলিয়েনরা তেমন সাড়া না দিয়ে বলল, চলো আমরা তোমার সঙ্গে পরিচয়পর্ব সেরে নিই।

অন্তু কয়েকজনের নাম মুখস্থ করে নিল সিকিহো, রিপিহো আর তাকিহো। সিকিহো অনেক আন্তরিক। অন্তুর বলা ভাষাটা খুব সহজে আয়ত্ত করে ফেলল। অন্তু বলল, তোমরা বাংলা বুঝতে পার কীভাবে?

সিকিহো বলল, আমাদের ব্রেনে একটা যন্ত্র আছে যেটা ইন্টারপ্রিটারের কাজ করে। মানে তোমার মাতৃভাষা আমার মাতৃভাষায় অনুবাদ হয়ে যায়।

অন্তু ইন্টারপ্রিটার সম্পর্কে আগেই জানে। সে এর বাংলা পড়েছিল দোভাষী।

অন্তু অবাক হয়ে বলল, তাই! তাহলে তো পৃথিবীতে তোমাদের অনেক বন্ধু।

রিপিহো বলল, হ্যাঁ, তবে আমরা আরো বন্ধু বাড়াতে চাই।

এতক্ষণ চুপ করে ছিল তাকিহো।

সে বলল, তোরা কি শুধু কথাই বলবি? নাকি অন্তুকে আমাদের গ্রহ ঘুরে দেখাবি!

অন্তু আর এলিয়েনরা এক অবাক করা গাড়িতে চেপে বসল। যা ঘণ্টায় হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। একটা বিশেষ জায়গায় এসে গাড়িটি থামল।

সিকিহো বলল, এই জায়গাটা মঙ্গলগ্রহের সবচেয়ে সুন্দর আর গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মঙ্গলগ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধিমানদের এনে রাখা হয়। যারা মঙ্গলগ্রহের কল্যাণের জন্য কাজ করে।

অন্তু বলল, ও আচ্ছা।

মিকিহো বলল, কয়েক লাখ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ এলিয়েনদের সঙ্গে মানুষের সুসম্পর্ক ছিল। তারা পৃথিবী আর মঙ্গলগ্রহের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু একসময় মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে মানুষ আর এলিয়েন আলাদা হয়ে যায়। সেই দ্ব›দ্ব আর কোনোদিন ঘোচেনি।

অন্তু বলল, আমি পৃথিবীর মানুষের পক্ষ থেকে সরি বলছি।

রিপিহো বলল, আমরাও সরি বলছি মঙ্গলগ্রহের এলিয়েনদের পক্ষ থেকে। আমরা চাই মানুষ আর এলিয়েনে আবার বন্ধুত্ব গড়ে উঠুক।

ওরা কথা বলতে বলতে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াল। মঙ্গলগ্রহের জাদুঘর, এলিয়েনদের রাজপ্রাসাদ এসবের কোনোটা বাদ যায়নি।

অন্তুকে রিপিহো বলল, আমাদের এখানে থেকে যাও। আমরা তোমরা ভালো বন্ধু হবো।

অন্তু বলল, থাকব না। আরেকদিন এসে আরো ঘুরব তোমাদের সঙ্গে। আজকে চলে যাচ্ছি।

সিকিহো বলল, ঠিক আছে বন্ধু, বিদায়।

বিন্তি অন্তুকে ডাকছে, ভাইয়া সকাল হয়ে গেছে। ওঠো।

অন্তু এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। সে স্বপ্নে মঙ্গলগ্রহ ভ্রমণ করে আপন মনেই হেসে উঠল।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App